বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৪ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

দুর্ঘটনার রেকর্ড কি ভাঙিতেই থাকিবে?

আপডেট : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৬:০১

নানা অস্থিরতাকে সঙ্গে লইয়া বাস করিতেছি আমরা। এই সকল অস্থিরতার মধ্যে ‘কালের দুঃখ’ হইয়া উঠিয়াছে সড়ক দুর্ঘটনা। ‘সময়ের চেয়ে জীবনের মূল্য অনেক বেশি’—সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে বহুল উচ্চারিত এই স্লোগান বিস্মৃত হইয়াছে বহু পূর্বেই। সড়ক-মহাসড়কে সতর্কতার বালাই নাই। অসচেতন যাতায়াতের বাড়াবাড়ি দৃশ্য সর্বত্রই। বলা হইয়া থাকে, ‘সাবধানের মার নাই’। কিন্তু এই কথায় কেহ কর্ণপাত করেন বলিয়া মনে হয় না। গভীর উদ্বেগের সহিত লক্ষ করা যাইতেছে, মৃত্যুকূপে পরিণত হইয়া উঠিয়াছে দেশের সড়ক-রাস্তাঘাট। পরিসংখ্যান বলিতেছে, গত আগস্ট মাসে সড়কে ৪৫৮টি দুর্ঘটনায় ঝরিয়াছে ৫১৯ প্রাণ। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি লইয়া গবেষণা-জরিপে যেই সমস্ত চিত্র উঠিয়া আসে তাহা আঁতকাইয়া উঠিবার মতো। 

২০২১ সালে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান প্রায় সাড়ে ৬ হাজার, যাহা ২০২০ সালের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ বেশি। প্রতি বৎসর দুর্ঘটনার সংখ্যা বাড়িতেছে; সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়া বাড়িতেছে লাশের সারি। সম্প্রতি এক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত মায়ের পেট ফেটে বাচ্চা বাহির হইবার ঘটনা ব্যথিত করিয়াছে সকলকে। একই পরিবারের একাধিক কিংবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিবারের প্রায় সকলকেই একসঙ্গে সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হইতে দেখা যায়।

পরিসংখ্যান বলিতেছে, ৯০ শতাংশ দুর্ঘটনার জন্য দায়ী যানবাহনের অতিরিক্ত গতি ও চালকের বেপরোয়া মনোভাব। আমাদের পর্যবেক্ষণ হইল, সড়কে রক্ত ঝরিবার কারণ ‘শৃঙ্খলার অভাব’। সড়ক জুড়ে নানা অব্যবস্থাপনার পাশাপাশি রাস্তায় চলাচলকারীদের অসতর্কতাও সড়ক দুর্ঘটনার জন্য সমানভাবে দায়ী। সময়ের সঙ্গে আমরা যেন এক তুমুল প্রতিযোগিতায় নামিয়াছি। পরিস্থিতি এমন যে, কাহারো যেন অপেক্ষার ফুরসত নাই; না চালকের, না পথচারীর। রাস্তায় নামিলে লাগামহীন হইয়া পড়িতেছেন সবাই। বেসামাল গতি ছুটাইয়া রাস্তায় দাপাইয়া বেড়াইবার সংস্কৃতি গড়িয়া তুলিয়াছি আমরা। বিশেষ করিয়া, নিয়ন্ত্রণহীন হইয়া উঠিয়াছে এই প্রজন্ম। বাইকে চাপিয়া নানা কসরত দেখাইবার এক উদ্দাম খেলায় মাতিয়া উঠিয়াছে উঠতি বয়সি তরুণ সমাজ। তাহারা ভুলিতে বসিয়াছেন—জীবন তো একটাই। তারুণ্যের গরম রুধিরস্রোতে গা ভাসাইয়া নিজের ও পরিবারের মহাসর্বনাশ ডাকিয়া আনিতেছেন তাহারা। যাতায়াতের ক্ষেত্রে দৈনন্দিন জীবনকে সহজ করিয়া তুলিবার ক্ষেত্রে বাইকের রহিয়াছে অত্যন্ত ইতিবাচক ভূমিকা। পাশাপাশি এই বাস্তবতাকেও পাশ কাটাইবার উপায় নাই যে,  মোটরসাইকেল এই সমাজে ‘মরণসাইকেল’ হইয়া উঠিয়াছে। এই প্রেক্ষাপটে বলিতে হয়, বাইক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে দায় রহিয়াছে অভিভাবগণেরও। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, স্নেহ-ভালোবাসা ও আবেগের বশবর্তী হইয়া বাইকের চাবি তুলিয়া দিতেছেন অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের হাতে। আবেগের এই আতিশয্যে অকালে ঝরিতেছে অতি আদরের সন্তানের প্রাণ। আমরা দেখিয়াছি, পদ্মা সেতুর উদ্বোধনের প্রথম দিনেই সেতুতে রক্তের দাগ লাগে। পরপর কয়েকটি দুর্ঘটনা ঘটিলে পদ্মা সেতুতে মোটরবাইক চলাচল বন্ধ ঘোষণা করা হয়। মনে রাখিতে হইবে, গুটিকতক অসচেতন, বেপরোয়া, খেয়ালি মানুষের কারণে স্বপ্নের পদ্মা সেতুতে বাইকে চলাচল করা হইতে বঞ্চিত হইতেছেন সকল বাইকার।

সড়ক দুর্ঘটনা দিনদিন প্রতিকারহীন হইয়া উঠিতেছে। এই যে সড়কে দৈনিক বিপুলসংখ্যক দুর্ঘটনা ঘটিতেছে তাহা কি প্রাণক্ষয় করিতেছে শুধু? কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়িবার মতো বিষয় হইল—সড়ক দুর্ঘটনা এবং এর প্রভাবে বাত্সরিক আর্থিক ক্ষতি ৪০ হাজার কোটি টাকা। ইহার ফলে ২ থেকে ৩ শতাংশ জিডিপি হারাইতেছে দেশ। শুধু অসচেতনতা, অসতর্কতার কারণে কি বিশাল মাশুল গুনিতেছে আমরা ফি বছর—ভাবা যায়! আমরা দেখিয়াছি, উন্নত অনেক দেশের সরকার, নাগরিক যাতায়াতব্যবস্থায় এক প্রকার বিপ্লব ঘটাইয়া ফেলিয়াছেন। অথচ আমরা আজও শৃঙ্খলার সংস্কৃতি গড়িয়া তুলিতে পারিলাম না। সড়ক শৃঙ্খলার প্রশ্নে আমরা রহিয়াছি বহু পশ্চাতে। এই প্রসঙ্গে বলিতে হয়, প্রতি বৎসর ক্রমাগতভাবে সড়ক দুর্ঘটনা কি আগের বছরের তুলনায় বাড়িতেই থাকিবে; নাকি ব্যবস্থাপনা, সচেতনতা-সতর্কতা তথা শৃঙ্খলার সংস্কৃতি লালন করিতে মনোনিবেশ করিব আমরা?

 

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন