শুক্রবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২২, ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

ভুয়া দলিলে জমি দখলে মরিয়া প্রভাবশালীরা

আপডেট : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০১:৩৩

পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর থেকে কেরানীগঞ্জে জমির দাম দুই থেকে তিনগুণ বেড়েছে। এ সুযোগে স্থানীয় প্রভাবশালী বিভিন্ন মহল জালিয়াত চক্রের সহযোগিতায় আমমোক্তার দলিল ও নোটারি পাবলিক চুক্তিনামা দলিল দস্তাবেজ তৈরি করে নিরীহ কৃষক ও অসহায় ব্যক্তিদের জমি দখলে মরিয়া হয়ে উঠেছে। 

গত ৪ সেপ্টেম্বর মডেল থানার সিরাজ নগর এলাকায় জমিসংক্রান্ত বিরোধের জেরে জাহাঙ্গীর ও তার দলবল মোখলেস মিয়া নামে এক ব্যক্তিকে কুপিয়ে জখম করে। পরে তাকে কলাতিয়ার একটি ক্লিনিকে ভর্তি করলে রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। রাতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল নিলে চিকিত্সকরা মোখলেসকে মৃত ঘোষণা করেন। 

কেরানীগঞ্জ মডেল থানার ওসি মামুন অর রশিদ জানান, এ ঘটনায় থানায় হত্যা মামলা হয়েছে। ঘটনায় জড়িত তিন জনকে আটক করা হয়েছে। আটককৃতরা হলো, রায়হান, জিহাদ ও হিমেল। মূল আসামি জাহাঙ্গীর পলাতক। গত এক মাসে জমিসংক্রান্ত এমন তিনটি ঘটনায় কেরানীগঞ্জে এক জনের মৃত্যু ও আইনজীবীসহ ১০ জন আহত হয়েছেন। গত  আগস্ট মাসে কেরানীগঞ্জ মডেল থানার বন্দডাকপাড়া এলাকায় আইনজীবী মুক্তা বেগম তার পৈত্রিক বাড়িতে ভাড়া তুলতে গিয়ে দেখেন হাফিজ ভুঁইয়া নামে এক ব্যক্তি নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে একটি আমমোক্তারনামা দলিল তৈরি করে একটি সাইনবোর্ড লাগাচ্ছেন। তখন মুক্তা বেগম প্রতিবাদ জানালে হাফিজ ভুঁইয়া ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। চাঁদা দিতে অস্বীকার করলে হাফিজ, ফরিদ হোসেন, কুলসুম বেগম, কামাল হোসেন, শফিকুর রহমান ও সন্ত্রাসী আনিস ওরফে ছোট আনিস ধারালো অস্ত্র দিয়ে মুক্তা ও তার স্বামী আবু জাফরসহ ছয় জনকে কুপিয়ে জখম করে। গুরুতর জখম অবস্থায় আবু জাফরকে মিটফোর্ড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ ব্যাপারে ছয় জনকে আসামি করে মুক্তা বেগম বাদী হয়ে কেরানীগঞ্জ মডেল থানায় দুটি মামলা দায়ের করেন।

কেরানীগঞ্জ মডেল থানার ওসি জানান, কাউকে অন্যায়ভাবে কারো জমি দখল করতে দেওয়া হবে না। সংশ্লিষ্টরা যত শক্তিশালীই হোক না কেন তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার মিরেরবাগ মৌজার সাড়ে ১৩ শতাংশ জমি এস এ ও আর এস পর্চার পৈত্রিক সূত্রে মালিক মোহাম্মদ তোতা মিয়া ১৯৯৪ সালে ২৮ ফেব্রুয়ারি নিবন্ধিত দলিল মূলে পুরান ঢাকার জনৈক রেজিয়া বেগমের কাছে বিক্রি করেন। এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবে মোস্তফা কামাল ও অ্যাডভোকেট সুলতান নাসেরসহ তিন দফা ঐ জমির মালিকানা হাত বদল হয়। 

সর্বশেষ ক্রয় সূত্রে মালিক মুসলিম, কাঞ্চন ও রিয়াজুল গং অভিযোগ করেন, তারা কেনার পর জমিতে পাকা দেওয়াল নির্মাণ করে বাড়ি তৈরির কাজ শুরু করেন। তখন তোতা মিয়ার পুত্রবধূ শুভাঢ্যা ইউনিয়নের সংরক্ষিত আসনের নারী কাউন্সিলর জান্নাতুল ফেরদৌস পুতুল ও একাধিক মামলার পলাতক আসামি লেটা নাসির পরিকল্পিতভাবে মুন্সীগঞ্জ জেলার জনৈক দুলাল শেখের নামে হালনাগাদ মালিকানা তথ্য গোপন করে আমমোক্তার দলিল তৈরি করে উল্লেখিত জমিতে সাইনবোর্ড লাগিয়ে ২০ লাখ টাকা চাঁদার জন্য চাপসৃষ্টি করতে থাকেন। ভুক্তভোগীরা চাঁদাদাবির ন্যায়বিচার পেতে পুতুলের বিরুদ্ধে শুভাঢ্যা ইউনিয়ন পরিষদে গ্রাম্য আদালতে জমির মালিকানাসংক্রান্ত দলিল দস্তাবেজ জমা দিয়ে বিচার দাবি করেন। পক্ষান্তরে পুতুল ও লেটা নাসির আমমোক্তারনামা ছাড়া আর কোনো দলিল দস্তাবেজ দেখাতে পারেননি। সম্প্রতি গ্রাম্য আদালত দুই পক্ষের উপস্থিতে মুসলিম, কাঞ্চন ও রিয়াজুল গংয়ের অনুকূলে রায় দেয়। বিচারে সুবিধা করতে না পেরে ২০ লাখ টাকা চাঁদা আদায়ের জন্য লেটা নাসিরকে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেন জান্নাতুল ফেরদৌস পুতুল। ভুক্তভোগীরা জানান, তারা হামলার ভয়ে বৈধ জমিতে যেতে পারছেন না।

ইত্তেফাক/ইআ