বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৪ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

মেঘের আড়ালে সূর্যের হাসি

আপডেট : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৩:৫৮

কোভিড-১৯ মহামারি ও ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী অর্থনীতিতে যে মন্দাভাব দেখা দিয়াছে তাহা লইয়া আমরা উদ্বেগ প্রকাশ করিয়া আসিতেছি। এমনকি হালে জ্বালানি ও ডলারসংকটও আমাদের বিপাকে ফেলিয়াছে। কিন্তু কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত বলিয়াছেন, ‘মেঘ দেখে কেউ করিসনে ভয়, আড়ালে তার সূর্য হাসে/ হারা শশীর হারা হাসি অন্ধকারেই ফিরে আসে’। মানুষের দুঃখ-দুর্দশা সকল সময় থাকে না। একসময় না একসময় তাহার অবসান হয়ই। ঘোর অমানিশা কাটাইয়া উঠাইয়া আমরা সকালে ঠিকই সূর্যের রক্তিম ও স্নিগ্ধ আলোর দেখা পাই। এই জন্য সকল সময় আমাদের অপটিমিস্ট বা আশাবাদী হইতে হয়। ইহা ছাড়া বাঁচিয়া থাকা কঠিন। বর্তমানে বাংলাদেশে এই সংকট ও ক্লান্তিকালে একাধিক স্বস্তির খবর পাওয়া গিয়াছে।

প্রথমত, গত আগস্ট মাসে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স বাড়িয়াছে ১২ দশমিক ৬ শতাংশ। এই সময় রেমিট্যান্স আসিয়াছে ২০৩ কোটি ৭৮ লক্ষ মার্কিন ডলার। গত বৎসর একই সময়ে প্রবাসী আয় আসিয়াছিল ১৮১ কোটি ডলার। কারণ গত অর্থবৎসরে সর্বাধিক সংখ্যক বাংলাদেশি প্রবাসে গিয়াছেন। তাহাদের একটি বড় অংশ গিয়াছেন মধ্যপ্রাচ্যে। আর মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে এই অঞ্চলের অর্থনীতির সুবিধা পাইতেছেন প্রবাসীরাও। আবার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বর্তমানে ডলারের ভালো মূল্য পাওয়ায় ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠাইতে উদ্ধুদ্ধ হইতেছেন প্রবাসীরা। সরকারও এই ক্ষেত্রে নানা ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করিয়াছে। দ্বিতীয়ত, গত মাসে রপ্তানিতে আমাদের প্রবৃদ্ধি হইয়াছে ৩৬ শতাংশ। গত রবিবার সদ্য প্রকাশিত রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী চলতি ২০২২-২৩ অর্থবৎসরের প্রথম দুই মাস জুলাই ও আগস্টে আমাদের ৮৫৯ কোটি মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি হইয়াছে। এই আয় লক্ষ্যমাত্রার চাইতে ৪ দশমিক ৫২ শতাংশ বেশি। শুধু আগস্ট মাসের হিসাব নিলে গত বৎসরের আগস্টের তুলনায় তাহা ৩৬ শতাংশ বেশি। এখানে উল্লেখ্য, এই রপ্তানির ৮৩ শতাংশই তৈরি পোশাক খাতের। যেখানে যুদ্ধের কারণে রপ্তানি আদেশ কমিয়া যাইবার আশঙ্কা করা হইয়াছিল, সেখানে রপ্তানি আয় বাড়িতেছে কীভাবে? আসলে যুদ্ধ-বিগ্রহের কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলিতে মূল্যস্ফীতি বাড়িলেও এখন ক্রমেই পরিস্থিতির উন্নতি হইতেছে। তবে ইহাতে আত্মসন্তুষ্টিতে ভুগিবার কোনো কারণ নাই। রপ্তানি খাতের প্রাণ ভোমরা গার্মেন্টের ব্যাপারে আমরা এখনো আশঙ্কামুক্ত হইতে পারি নাই। এখানে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়, শুধু তৈরি পোশাকই নহে, অন্য শীর্ষ রপ্তানি খাত চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য এবং হোম টেক্সাইলের রপ্তানিও বাড়িয়াছে।

ডলারের মূল্য বৃদ্ধির কারণে আমাদের রিজার্ভ নিয়া অনেকেই শঙ্কিত। তবে রিজার্ভ বা বিদেশি মুদ্রা সঞ্চয়নের প্রধান উৎস হইল রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্স। এই দুটি ক্ষেত্রে যখন উল্লম্ফনের ছোঁয়া দেখা দিয়াছে, তখন জাতীয় অর্থনীতিতেও স্বস্তি ফিরিয়া আসিবার কথা। দুই বৎসরের করোনা মহামারি আমাদের অর্থনীতিকে যতটা কাবু করিয়াছে, তাহার চাইতে অধিক দুর্বল করিতেছিল রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অভিঘাত। এই সর্বনাশা যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিকেই ওলটপালট করিয়া দিয়াছে। এখন অর্থনীতির উপর চাপ মোকাবিলায় রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ের ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রাখিতে হইবে। ইহাতে রিজার্ভ বাড়িবার কারণে ডলারের বাজারের অস্থিরতা কাটিয়া যাইবে বলিয়া আশা করা যায়। এই জন্য ইউরোপ ও আমেরিকায় এই সংকটকালে ক্রেতার ক্রয়ক্ষমতার দিকে তাকাইয়া বেশি বেশি কম মূল্যের ও মানসম্মত পোশাক সরবরাহ করিতে হইবে। চীন-আমেরিকা বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে অনেক ক্রেতা চীন ও ভিয়েতনাম হইতে মুখ ফিরাইয়া লইয়া বাংলাদেশে আসিতেছেন। ইহাও আমাদের জন্য মঙ্গলজনক। তবে আমরা প্রার্থনা করি, পৃথিবীতে যুদ্ধপরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হইয়া আসুক। ইহাতে সকলের জন্যই কল্যাণ নিহিত। তাহা ছাড়া লক্ষ করা যাইতেছে, আমাদের রপ্তানির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত হিমায়িত মৎস্য, কৃষিপণ্য ও ঔষধে আয় কমিয়া আসিয়াছে। অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখিতে ইহার কারণ অনুসন্ধান করিয়া আমাদের এই ব্যাপারেও যথাযথ ব্যবস্থা লইতে হইবে।

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন