বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৪ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

ভুল হইবে, তাহা শুধরাইতেও হইবে

আপডেট : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৪:২২

আজিকার সমাজ লইয়া আমাদের গর্ব করিবার মতো কিছু নাই—এই কথা শতভাগ সঠিক নহে। বরং চারিপাশে এমন বহু ঘটনা ঘটিতেছে অহরহ, যাহা লইয়া আশান্বিত হইবারও যথেষ্ট অবকাশ রহিয়াছে। জীবনে বহুবার বিনা টিকিটে রেলভ্রমণ করিবার পর শেষ পর্যন্ত আত্মোপলব্ধির তাড়না হইতে সমুদয় বকেয়া রেলকর্তৃপক্ষকে পরিশোধ করিয়া সততার এক অনন্য নজির গড়িয়াছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রবীণ এমদাদুল হক। মন্দকার্য করিবার পর আত্মসমালোচনার বোধ জাগ্রত হইয়া এই যে পাপমোচনের স্ব-উদ্যোগ গ্রহণের সাহস তিনি দেখাইয়াছেন, আজিকার দিনে ইহা বিরল। নীতিহীন, দুষ্কর্ম করিবার পর আত্মতাড়িত হইয়া নিজেকে সংশোধন করিবার পথে অগ্রসর হইবার এইরূপ সংকল্প নেহাত ক্ষুদ্র বিষয় নহে। মনে রাখিতে হইবে, যেহেতু মানুষ ‘আশরাফুল মাখলুকাত’, কোনো অন্যায়, অপরাধ, অনিয়ম করিবার পর আত্মোপলব্ধি জাগ্রত হওয়াটা স্বাভাবিক। ভিতরে ভিতরে স্বগতোক্তির দীর্ঘ লাইন বহিয়া যাওয়াও অস্বাভাবিক নহে। এই রূপ পরিপ্রেক্ষিতে নিজের সহিত নিজেই কথা বলিয়া, নিজেই নিজের দুষ্কর্ম, অপরাধের বিচার করিবার সাহস যাহাদের রহিয়াছে এই সমাজের উচ্চতম আসন তাহাদেরই প্রাপ্য। আমরা জীবনভর বুঝিয়া-না বুঝিয়া বহু পাপকর্মই করিয়া থাকি। সুতরাং পাপ হইতে পুরাপুরি নিবৃত্ত হওয়া সম্ভব নয়, কিন্তু সেই পাপকর্মের প্রতি যদি অনুশোচনা না আসে, যদি সংশোধনের মনোভাব না জাগে তবে তো বলিতে হয় আমরা চোখ থাকিতেও অন্ধ। অন্ধজীবনে করুণাই প্রাপ্য আমাদের।

গর্বভরে বলিতে হয়, সততা ও অগণিত উত্তমকর্মের সাক্ষী আমরা। দেশ-বিদেশে শত-সহস্র দৃষ্টান্ত স্থাপন করিয়াছেন বহু সৎ-সাহসী সন্তান। টাকা কুড়াইয়া পাওয়ার পর তাহা আসল মালিককে ফেরত দেওয়ার একাধিক ঘটনা যেমন রহিয়াছে, প্রকল্প শেষে উদ্বৃত্ত অর্থ রাজকোষে ফেরত দেওয়ার ঘটনাও কেবল একটাই নহে। ঘটনাগুলি আমাদের যাহার-পর-নাই আশাবাদী করিয়া তুলে। আজিকে এমন এক সমাজে আমরা বাস করিতেছি, যেইখানে বাস্তব পরিস্থিতির মুখামুখি হইতে ভয় পাই আমরা। কিন্তু প্রকৃতির অমোঘ নিয়মকে তো মানিতেই হইবে। সত্যকে চাপা দিতে প্রতিনিয়ত আমরা যেই অসত্যকে আঁকড়াইয়া ধরিয়া বাঁচিতে চাহিতেছি তাহা-ই একদিন ঘিরিয়া ধরিবে আমাদের। যেই সকল অনিয়ম-অসত্যকে আমরা তুচ্ছজ্ঞান করিতেছি, তাহাই একদিন ‘চরম সত্য’ হইয়া পথ আগলাইয়া দাঁড়াইবে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বালুকণার মহাদেশ গড়িয়া তুলিবার মতোই ক্ষুদ্রকায় পাপ সম্মুখে দাঁড়াইবে দুর্ভেদ্য দেওয়াল তুলিয়া। এই সত্যকে অস্বীকার করিবার কোনো উপায় নাই যে, দৈনন্দিন চলার পথে আমাদের ‘দায়’ কেবল বাড়িতেছেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যেহেতু আমরা আমাদের কৃতকর্মের গুণবিচার করিতে পারি, বুঝিতে পারি ঠিক-বেঠিক; কাজেই কুপথ হইতে ফিরিয়া আসাই জ্ঞানীর কাজ হইবে। কিন্তু এই ক্ষেত্রে পরিতাপের বিষয় হইল, আমরা সঠিক পথে হাঁটিতে চাহি না। আমরা ভুলিয়া যাই, ক্ষণিকের জন্য রেহাই পাওয়া গেলেও একটা না একটা সময় আটকাইয়া পড়িতে হইবেই। এই ক্ষেত্রে কবি নজরুলের মর্মকথা স্মর্তব্য—‘দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা শুধিতে হইবে ঋণ’।

বোধোদয় জাগ্রত হইয়া আত্মস্পৃহা দেখাইবার স্পর্ধা আজকের সমাজে বিরল। অথচ অপরাধ করিয়া, অন্যায় কর্ম করিয়া আপনাকেই বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাইবার ‘মহৎ সাহস’ সকল কালের সকল সমাজেই উচ্চ স্বরে প্রশংসিত। এ কথা সত্য যে, আমরা এমন এক সমাজে বাস করিতেছি যেখানে ত্রুটিবিচ্যুতি হওয়া অস্বাভাবিক নহে। আবার এ সত্যও আনন্দের যে, কোনো সমাজেই ভুলত্রুটি অমার্জনীয় নহে। এই পটভূমিকায় আসল কথা হইল, নিজের ভুল বুঝিতে পারা মাত্র তাহা শুধরাইয়া লইবার ইচ্ছা। অতীতের ভুল, অন্যায়, অপরাধের ক্ষেত্রে আত্মদর্শনের জায়গাটি অবারিত করিতে পারাটিই মুখ্য। বাস্তবতা হইল, মিথ্যাকে আঁকড়াইয়া থাকিবার মধ্যে কেবলই ‘আত্মদংশন’ নিহিত; অন্যদিকে সত্য-শপথের হাত ধরিয়া আসে ‘নবউত্থান’। কাজেই, বোধোদয়ের জায়গা হইতে আমাদের পাথেয় হোক—‘ট্রুথ ইজ বিটটি, বিউটি ইজ ট্রুথ’।

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন