কেউ কেউ জীবনে দিয়েই যায়। যতদিন সে দিতে পারে ততদিন তার দাম থাকে। তারপর একদিন তার দাম ফুরিয়ে যায়। যে মানুষটা সংসারের হাল ধরতে গিয়ে নিজের জীবনকে নিয়ে কখনো ভাবেনি বরং তিল তিল করে নিজেকে নিঃশেষ করতে করতে পরিবারের অন্যদের ভবিষ্যৎ গড়ে দিয়েছে। একদিন পরিবারের কাছে সে বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। কখনো কখনো পরিবারের অলংকার হওয়ার পরিবর্তে কলঙ্ক হয়ে যায়।
প্রশ্ন তো আসতেই পারে, কী কী বিসর্জন দেয় সেই নিঃস্বার্থ মানুষটা? অনেক কিছু, যা হয়তো খোলা চোখে দেখা যায় না, বন্ধ করে ফেলা চোখে দেখা যায়। চোখ যখন খোলা থাকে তখন মানুষ কোনো কিছু বিচার করতে পারে না। তবে দিন যত যাচ্ছে চোখ তত বড় বড় চশমার কৃত্রিম কাচে আরও বন্দি হয়ে পড়ছে। ক্রমশ ঝাপসা হচ্ছে মানুষের দেখার অনুভূতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি। হাবল টেলিস্কোপের উত্তরসূরি জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ বানিয়ে কত কিছুই না খুঁজছে অথচ একজন স্বার্থহীন মানুষের ত্যাগের মূল্য কি খুঁজছে?
কোনটা বড়—মানুষ, না মানুষের অতি উচ্চবিলাসী স্বপ্ন। স্বপ্নের প্রাচুর্য বড় নাকি বাস্তবতার কশাঘাতে নিমজ্জিত মানুষের অসহায় মনটা বড়। এটা নিয়ে তর্কবিতর্কে জড়াব না। সারা পৃথিবী সেই মনোমুগ্ধকর ছবির নানা বিশ্লেষণে মেতেছে, কেউ কাউকে ছাড় দিতে রাজি নয়। যুক্তিতর্কে কে কাকে ছোট করবে, কে কাকে বড় করবে, এমন এক মনস্তাত্ত্বিক লড়াই চলছে। পাণ্ডিত্য জাহিরের এত বড় সুযোগ মুখোশ মানুষেরা কোনোভাবেই ছাড়তে রাজি নয়। সাধারণ একটা মানুষের কাছে এসবের কোনো মূল্য নেই। তার কাছে তার মৌলিক চাহিদা মেটানোর লড়াইটা সবচেয়ে বড়।
এটা বিশ্বরাজনীতির কোনো কৌশল কি না বলতে পারব না, এটা বিজ্ঞানের মানবকল্যাণে নিহিত কোনো গবেষণা কি না তা বলতে পারব না, এটা যেটাই হোক না কেন, কোনোটাই বলতে পারব না। কারণ সময় কথা বলবে, প্রকৃতি কথা বলবে, ইতিহাস কথা বলবে। তবে একটা কথা বলতে দ্বিধা নেই, সারা পৃথিবী অস্ত্র, মারণাস্ত্র, তারকাযুদ্ধের নামে ধ্বংসযজ্ঞের যে অতি উচ্চবিলাসী পরিকল্পনা হাতে নিয়ে শক্তির উন্মাদনায় মেতে ওঠে টাকার পর টাকা ঢালছে, সে টাকা কি দারিদ্র্যপীড়িত মানুষের দারিদ্র্যমোচনের জন্য ব্যয় হতে পারত না? পৃথিবীর ক্ষুধার্ত শিশুদের ক্ষুধার যন্ত্রণা কি মেটাতে পারত না? হয়তো পারত, কিংবা কারো কারো যুক্তিতে পারত না। কারণ বিষয় যা-ই হোক, এর পক্ষে-বিপক্ষে দাঁড়ানো মানুষের সংখ্যাও কম নয়। কারণ সবকিছু যে একটা খেলা, আবার সব খেলা খেলা নয়।
ফেসবুকে একটা লেখা পেলাম, লেখাটা এমন ছিল :বাবার অসুস্থতার কারণে আট বছর বয়সে সংসারের দায়িত্ব নিলাম... ইটভাটায় কাজ করেছি, জেলের কাজ করেছি, ট্রাকে লেবারি করেছি...
হাত দুইটা ঠোসা পড়ে গেছে...পড়ালেখা করিনি...
বিয়ে করেছি ৩৫ বছর বয়সে...শুধু ভাইবোনের কথা চিন্তা করে...
সম্পূর্ণ নিজের টাকায় দুই জন বোনকে বিয়ে দিলাম...
দুই জন ভাইকে শিক্ষা অফিসার বানালাম...
আরেক জন ভাইকে বানালাম ডাক্তার...
আজ ছোট ভাই একটার জন্য মেয়ে দেখতে যাবে...ভাইবোন সবাই যাচ্ছে, আমাকে নেয়নি...কারণ, আমি দেখতে ওদের মতো স্মার্ট না...এবং আমি মুর্খ, ওদের সাথে যায় না...
আহ্ জীবন, আহা রে জীবন...
ভাবছি অসহায় লোকটার কথা, একদিন যার দাম পরিবারের কাছে সবচেয়ে বেশি ছিল। স্বার্থপর আর সুবিধাবাদী পরিবারের মানুষেরা তখন তাকে তাদের ওপরে ওঠার এক-একটা লোভনীয় সিঁড়ি ভেবেছে। হয়তো লোকটা তাদের কাছে কোনোদিন মানুষের মূল্য পায়নি, আপন জনের ভালোবাসা পায়নি, যা পেয়েছে তা হয়তো একধরনের মেকি অভিনয়। সবাই অভিনেতা হলেও সাধারণ লোকটা সমাজের বাস্তবতায় মানুষ হয়েছেন। কিন্তু সেটি হয়েও-বা লাভ কী, সবাই রূপের জৌলুসকে ভালোবাসে, রক্ত-মাংসের মানুষকে ভালোবাসে না।
লোকটা পরিবারকে গড়ে তুলতে শরীরের ঘাম ঝরিয়েছেন, জীবনের অনেক মৌলিক চাহিদার মধ্যে শিক্ষার মতো মৌলিক চাহিদাকেও বিসর্জন দিয়েছেন। তার শ্রমের পানি-করা রক্তে ভাইবোনেরা এখন শিক্ষিত হয়ে সমাজের মাথা হয়েছে, বড় বড় পদপদবি পেয়েছে। ক্ষমতার রক্ত টগবগ করছে তাদের চোখেমুখে। সমাজে তাদের মর্যাদা বেড়েছে, জাতে উঠেছে তারা। সবার দাম বেড়েছে আর সময় যতই গড়িয়েছে নিঃস্বার্থ লোকটার দাম ততই কমেছে। খুব কষ্ট পেয়েছে লোকটা, হয়তো কান্নার পানি চোখে আনেননি, সেটা হিমশীতল বরফ করে জমাট বাঁধিয়েছেন এমন একটা জায়গায়, সেটা হয়তো কেউ কোনোদিন খুঁজেও দেখবে না। লোকটার কথাগুলো পড়ে মনে হলো, মানুষ যতই শিক্ষিত হয় ততই স্বার্থপর ও অকৃতজ্ঞ হয়। কারণ আমাদের শিক্ষায় ভোগবাদিতার সব উপাদান থাকলেও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির কোনো জায়গা নেই। লোকটাকে এতদিন ব্যবহার করে বড় বড় সাহেব সুবেদার হয়ে ওঠা আপনজনরা মনে করছে লোকটা পরিবারের জন্য একটা কলঙ্ক। স্ট্যাটাস বলেও তো একটা অতি দানবীয় কথা আছে, সে স্ট্যাটাসে লোকটার কোনো জায়গা নেই। তার জায়গা ডাস্টবিনে কিংবা গরুর খোয়াড়ে। একদিন সে গাছ ছিল, এখন সে আগাছা হয়েছে।
আমার একজন প্রিয় ছাত্র লিখেছে, ‘পরিবারের বন্ধন ততদিন মজবুত থাকে, যতদিন বন্ধনের মূল কারিগর (মা) থাকে। মূল কারিগর (মা) নেই, বন্ধনও দুমড়েমুচড়ে নড়বড়ে। এটাই কি হবার কথা? সবই শূন্যের কোটায়!’ কথাটা খুব সাধারণ মনে হলেও এর ভেতরের গভীরতা অনেক। যতদিন মা বেঁচে থাকেন, ততদিন সম্পর্কগুলো মাকে আবর্তিত করে চলতে থাকে। মা যখন চলে যান, সম্পর্কগুলো তখন স্বার্থপর হয়ে যায়। চেনামুখগুলো অচেনা মনে হয়। পরিবারের স্বার্থহীন মানুষেরা পরিবারের স্বার্থপর মানুষের দ্বারা আক্রান্ত হয়। কে আপন, কে পর—বোঝা খুব কঠিন হয়ে পড়ে। মায়ের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে সম্পর্কের বন্ধন নড়বড়ে হয়ে পড়ে, সম্পদের লোভ মানুষের সম্পর্কে ফাটল ধরায়। ভেঙে যায় সব স্বপ্ন, সব সুখ।
একটু মিলিয়ে দেখুন তো আমাদের জীবনে কথাগুলোর কতটা মূল্য আছে। সম্পর্কের সাম্প্রতিক প্রবণতা ও জীবনমুখী ভাবনাগুলো যেন নিজের সঙ্গে একধরনের প্রতারণা করে বেঁচে থাকার মতো। নিজের ভাবনাগুলো হয়তো তারই প্রতিধ্বনি, কোনটার সঙ্গে কোনোটার মিল নেই, তার পরও সমীকরণের রেখাটা যেন এক জায়গাতেই। কথাগুলো ঠিক এমন :‘পৃথিবীর সেরা কৌতুক হলো যখন আপনি ভেতরে ভেতরে কাঁদছেন তখন সারা পৃথিবীর সামনে আপনাকে হাসির অভিনয় করতে হচ্ছে।
আপনার পেটে এক মুঠোও ভাতও জোটেনি অথচ নিজের দারিদ্র্যকে দেখাবেন না সারা পৃথিবীর সামনে মহাভোজ খেয়ে আত্মতৃপ্তির অভিনয় করছেন।
আপনি জানেন, ক্যানসারে আপনি যে কোনো সময় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বেন। তার পরও আপনজনদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য আপনি অনেক ভালো আছেন বলে অভিনয় করে যাচ্ছেন।
আপনি জানেন, পৃথিবীতে আপনার আপন বলে কেউ নেই, তার পরও মানুষের মিথ্যে ভালোবাসা পাওয়ার অভিনয় করে যাচ্ছেন। আপনি জানেন, সারা পৃথিবী আপনাকে জোকার বলে জানে, কিন্তু তখনো আপনি জোকারের পেছনের মানুষটাকে দেখানোর অভিনয় করে যাচ্ছেন। আপনি সারা জীবন মানুষের কাছ থেকে আঘাত পেয়েছেন, ক্ষতবিক্ষত হয়েছেন, তার পরও আপনি আঘাতগুলো ঢাকার মিথ্যে অভিনয় করে যাচ্ছেন। আপনি জানেন, আপনার ত্যাগের মূল্য আপনি পাননি, তার পরও আপনি আপনার ত্যাগ মূল্যহীন তা প্রমাণের জন্য অভিনয় করে যাচ্ছেন। আপনি জানেন, মধ্যবিত্ত হয়ে আপনাকে রেশনিংয়ের চাল-ডাল-তেল পাওয়ার জন্য মুখ ঢেকে নিম্নবিত্তের সঙ্গে লাইন ধরে দাঁড়াতে হচ্ছে, অথচ আপনি গলা চড়িয়ে অভিনয় করে বলছেন আপনার কোনো অভাব নেই। আপনাকে প্রতিদিন জীবনের সঙ্গে লড়াই করে বাসে ঝুলতে ঝুলতে অফিসে যেতে হয়, অথচ আপনার ক্লান্তিতে ভেঙে পড়া শরীরটা টানতে টানতে আপনি অভিনয় করে বলছেন, আপনার মতো মহাসুখী পৃথিবীতে আর একটিও নেই।
আপনি জানেন, আপনি বেকার, শত চেষ্টা করেও একটা চাকরি জোটাতে পারছেন না, তার পরও প্রতিদিন হতাশা নিয়ে বাড়ি ফিরে পরিবারের আপনজনদের অভিনয় করে হাসিমুখে বলছেন, এবার চাকরিটা বুঝি হয়ে যাবে।
আপনি জানেন, আপনি প্রতিনিয়ত মানুষের অবহেলা, অপমান ও হাসির পাত্র হচ্ছেন, তার পরও একদিন সবকিছু বদলে যাওয়ার মিথ্যে স্বপ্ন দেখতে দেখতে অভিনয় করে যাচ্ছেন। আপনার সন্তানদের কাছে আপনার কোনো দাম নেই, অথচ মানুষকে মিথ্যা অভিনয় করে বোঝাচ্ছেন আপনার সন্তানদের কাছে আপনি মহামূল্যবান ।
আপনি জানেন, এই পৃথিবী আপনাকে মানুষ হিসেবে গণ্য করে না, তার পরও নিজের মুখে মুখোশ পড়ে আপনি নিজেকে মানুষ হিসেবে প্রমাণ করার অভিনয় করে যাচ্ছেন।’
হয়তো ঘটনাগুলোর সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে নেওয়ার সূচনা আছে, উপসংহার নেই। সম্পর্কের সুতোটা টানছে নিচে, অথচ ক্রমশ মানুষ সুতোকে চিনছে না। ক্রমাগত সুতো ছিঁড়ে ছিঁড়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলছে। মানুষের বাস্তবতা হারিয়ে গেছে, অভিনয়টা বেড়েছে। মানুষের দোষ দিয়ে কী লাভ, সবাই তো আর মানুষ না।
বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছেন জাপানের মানুষেরা দীর্ঘায়ু হওয়ার কারণগুলোর মধ্যে একটি হলো, তাদের খাদ্যাভ্যাস। আর বাকি কারণগুলো মানবিক ধারণা দ্বারা পুষ্ট। যেমন তাদের বয়স যত বাড়ে টেনশন তত কমে, নাতি-নাতনিদের সঙ্গে তাদের আনন্দ করেই সময় কাটে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা এমন এক সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে, যেখানে ছোটরা বড়দের সব সময় সম্মান করে, পরিবারের জন্য বড়রা যে ত্যাগ করেন, সে ত্যাগের প্রতি পরিবারের ছোটরা সব সময় কৃতজ্ঞ থাকে। আমরাও এমন একটা সমাজের স্বপ্ন দেখি। কিন্তু সে স্বপ্ন অধরাই থেকে যায় ।
লেখক : কলামিস্ট ও লেখক, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর
