কনজারভেটিভ পার্টির সদস্যরা তাদের নেতা হিসাবে বেছে নিয়েছেন লিজ ট্রাসকে। বরিস জনসনের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন ট্রাস। ২০১৬ সালের জুনে ভোটাররা ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর যুক্তরাজ্যের তৃতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করলেন তিনি। ট্রাস যখন মসনদে বসলেন তখন খুব বেশি দেরি নেই সাধারণ নির্বাচনের। নির্বাচনের আগে ট্রাসের হাতে আছে মাত্র দুই বছর কয়েক মাস। এই সময়কালে নিজের যোগ্যতা, যথার্থতা প্রমাণে ট্রাসকে হাঁটতে হবে লম্বা পথ। দীর্ঘ নীতিগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে তাকে। বিভক্ত হয়ে পড়া দলকে একত্রিত করতে হবে এবং সব থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, জনসাধারণের মনকে জিততে হবে। তার পূর্বসূরি ৮০ সিটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে বিজয় ছিনিয়ে এনেছিল বটে; তবে আড়াই বছরের ব্যবধানে শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাচ্যুতও হতে হয়েছে। এসব বিষয়কে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে বলতে হয়, খুব একটা মসৃণ হবে না ট্রাসের রাস্তা। সহজ হবে না তার কাজ।
কনজারভেটিভ পার্টির ১ লাখ ৮০ হাজার সদস্যের সামনে ট্রাস নিজেকে উপস্থাপন করেছেন আধুনিক সময়ের মার্গারেট থ্যাচার হিসাবে। ক্ষমতায় বসার আগে ব্যক্তি ও ব্যাবসায়িক পর্যায়ে করের বোঝা হালকা করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন তিনি। এমনকি কর নিয়ন্ত্রণকে সহনীয় করার প্রতিশ্রুতিও এসেছে তার কাছ থেকে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর জন্য তার বিভিন্ন পদক্ষেপ-পরিকল্পনার বিষয়ও কারো অজানা নয়। কিন্তু এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, বহু সমস্যা ঘিরে ধরেছে আজকের যুক্তরাজ্যকে। এই পরিস্থিতিতে ট্রাসের প্রতিশ্রুতিগুলো কতটা আলোর মুখ দেখবে তা সময়সাপেক্ষ। এমন অবস্থায় প্রশ্ন উঠতে পারে, প্রতিশ্রুতি পূরণে ট্রাস কোন পথে হাঁটবেন, কোন কোন নীতি বাস্তবায়নে মনোনিবেশ করবেন? এবং শেষ অবধি দেখতে হবে, কতটা প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারলেন তিনি।
বেশ কয়েক জন রাজনৈতিক ভাষ্যকার পরামর্শ দিয়েছেন, কর্মক্ষমতা ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অত্যন্ত স্বল্পমেয়াদি ভিত্তিতে বিচার করতে হবে ট্রাসকে। ‘প্রথম ১০০ দিন’-এর স্বাভাবিক গণ্ডি ভুলে গিয়ে স্বল্পমেয়াদি সফলতা নিয়ে ভাবতে হবে তাকে। নতুন প্রধানমন্ত্রীকে ভাবতে হবে কীভাবে তিনি প্রথম মাসের মধ্যেই নিজের যোগ্যতা-সফলতার গল্প তৈরি করতে পারেন।
ট্রাস ২০১০ সাল থেকে বিভিন্ন সরকারি ভূমিকা পালন করে আসছিলেন। তার ঝুলিতে থাকা একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল ‘সবকিছুর সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়া’। ব্রেক্সিট প্রচারণার বিষয়কেই যদি ধরা হয় তবে দেখা যায়, তিনি পক্ষ পরিবর্তন করে ব্রেক্সিট-পন্থি দুটি মন্ত্রিসভায়—প্রথমে থেরেসা মে ও তারপর জনসনের অধীনে—নিজের অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হন।
টোরি নেতৃত্ব প্রচারের ক্ষেত্রেও নিজের খাপ খাইয়ে নেওয়ার বৈশিষ্ট্য কাজে লাগিয়েছেন ট্রাস। চলমান কিংবা সামনের দিনগুলোতে জ্বালানি ও জীবনযাত্রার ব্যয়-সংকটের বিষয়গুলোকে মোকাবিলা করার জন্য তিনি কী কী পদক্ষেপ নেবেন সেসব প্রশ্নের প্রতিক্রিয়ায় তাকে যথেষ্ট কৌশলী হতে দেখা গেছে। এসব বিষয় নিয়ে ট্রাসের সোজাসাপ্টা জবাব ছিল ‘প্রচারের’ পক্ষে নন তিনি। ভোটের আগে শেষ সাক্ষাত্কারে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, এক সপ্তাহের মধ্যে তিনি একটি সুনির্দিষ্ট নীতি মেলে ধরবেন। বাজারে গুজব উঠেছে, জ্বালানি খাতের বাজেট ফ্রিজ (আটকে দেওয়া) করার পরিকল্পনা করছেন ট্রাস। এই নীতি কার্যকর করতে পারলে ১০০ বিলিয়ন ইউরো সাশ্রয় করা যাবে। তবে এক্ষেত্রে বলতে হয়, গ্রীষ্ম জুড়ে এই একই কথা বলে আসছে প্রধান বিরোধী দলগুলো। বিরোধীরা যা বলে আসছে তা-ই যদি করা হয়, তবে ট্রাসের নিজের ‘উদ্ভাবনী কৌশল’ ঠিক কোনটা?
মনে রাখতে হবে, জ্বালানি মূল্য ফ্রিজ করা হলে স্পষ্টতই তা বড় আর্থিক ঝুঁকি বয়ে আনবে। বিশেষ করে ট্রাস যদি জাতীয় বীমা কর কমাতে চান, পরিকল্পিত করপোরেট ট্যাক্স বৃদ্ধি বাতিল করতে চান এবং প্রতিরক্ষা ব্যয়কে জিডিপির ৩ শতাংশে উন্নীত করতে চান, তবে সংকট বাড়বে আগামী দিনগুলোতে।
চূড়ান্ত প্রচারাভিযানের সময় এক সাক্ষাত্কারে ট্রাসকে সুদের হার ও ব্যাংক অব ইংল্যান্ড (বিওই) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে ট্রাস নমনীয়তা প্রদর্শন করেছিলেন। প্রচারাভিযান জুড়ে বিওইকে তীব্রভাবে ভর্ত্সনা করে গেলেও বিওইর ম্যান্ডেট পরিবর্তনের জন্য তিনি চাপ দেবেন কি না—এই প্রশ্ন করা হলে শেষ পর্যন্ত তিনি উচ্চারণ করেছিলেন ‘কৌশলী উত্তর’—সুদের হারের সঠিক স্তর সম্পর্কে মন্তব্য করা তার কাজ নয়। তার উত্তর ছিল, এটি স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাজ। গভীরভাবে লক্ষ করা গেছে, দলীয় নেতৃৃত্বের বিজয়ের সময় যত ঘনিয়ে এসেছে, তিনি প্রশ্নের উত্তরে তত কৌশলী হয়ে উঠেছেন।
সে যা-ই হোক, ট্রাস যদি চান বৃহত্তর নির্বাচকমণ্ডলী তথা ভোটাররা ২০২৪ সালের শেষের দিকে (বা তার আগে) একজন যোগ্য নেতা হিসেবে তাকে পুনঃনির্বাচিত করবে, তবে সেক্ষেত্রে ভিন্ন পথ ধরতে হবে তাকে। খাপ খাইয়ে নেওয়ার চেয়ে আরও ‘অনেক কিছু’ করতে হবে ট্রাসকে। যৌক্তিক বিশ্লেষণ দ্বারা সমর্থিত নীতিগত অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। এর জন্য তাকে অবশ্যই তার নিম্ন কর হার কিংবা অন্যান্য সংকীর্ণ প্রচারাভিযান কর্মসূচি ত্যাগ করতে হবে।
অধিকন্তু, মিডল্যান্ডস এবং উত্তর ইংল্যান্ড কিংবা ওয়েলসের তথাকথিত রেড ওয়াল (ঐতিহ্যগতভাবে লেবার পার্টিপন্থি) জেলাগুলোতে কিছু আসন না জিততে পারলে সাধারণ নির্বাচনে তিনি তার দলের জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারবেন না। এসব জেলার ভোটারদের আস্থা অর্জনে তাকে আলাদা নীতি খুঁজে বের করতে হবে। কাজ করতে হবে।
মজার বিষয় হলো, আমি যদি ট্রাস হতাম তবে কী করতাম? এই প্রশ্নের সহজ উত্তর হবে, এ জাতীয় বিষয়গুলোতে খোলা মনে খোলা নীতিতে থাকতাম আমি। ট্রাস কম কর ও সীমিত নিয়ন্ত্রণের যে পথ ধরে হাঁটছেন তা নিয়ে বিতর্ক, আলোচনা-সমালোচনা কম হয়নি। তার এই নীতির ফলে জীবনযাত্রার ব্যয়-সংকটের মতো আরও বহুবিধ তাৎক্ষণিক সমস্যা দেখা দেবে বলে বলা হচ্ছে। তবে এ-ও সত্য যে, এসব বিষয় সমাধানের ক্ষেত্রে ট্রাস যে সকল নীতির আলোকে পদক্ষেপ নিতে চাচ্ছেন তাতে আপাতত সমর্থন দেওয়া উচিত। যদি তিনি তার নীতির প্রতি সৎ হন, তবে টোরি ভোটারদের এটা ধরে নেওয়া উচিত হবে যে, পরিস্থিতি ট্রাসকে এই সকল শক্ত নীতিতে হাত দিতে বাধ্য করেছে।
বাস্তবতা হলো, ভোটারদের সঙ্গে তামাশা করার পরিবর্তে দেশের ওপর চেপে বসা নানা সমস্যা সমাধান করাই যদি ট্রাসের উদ্দেশ্য হয়, তবে আমরা আশা করি উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দেবেন তিনি। বিশেষ করে, সেসব বিষয় তার কার্যতালিকায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে স্থান পাবে যেগুলো ক্রমাগতভাবে দুর্বল হয়ে উঠেছে, উঠছে। চলমান সমস্যাসমূহ মোকাবিলায় তিনি যদি সঠিক নীতির সফল প্রয়োগ করতে পারেন, তবে তিনি থ্যাচার বা টনি ব্লেয়ারের চেয়েও বেশি দিন সেবা দানের সুযোগ পাবেন।
যেহেতু সবেমাত্র শুরু করেছেন ট্রাস, এখনো সম্ভাবনার বহু কিছু আছে। আজকের ক্রমবর্ধমান অনিশ্চিত বিশ্বে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও ভূরাজনৈতিক জটিল ছকের প্রশ্নে ট্রাসের নমনীয়তা প্রদর্শনই হতে পারে সমস্যা সমাধানের মূল নীতি—বাস্তবিক অর্থে দেশের জন্য যা আজ বড় বেশি প্রয়োজন।
লেখক : গোল্ডম্যান স্যাচস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের সাবেক চেয়ারম্যান, যুক্তরাজ্যের সাবেক ট্রেজারি মিনিস্টার ও প্যান-ইউরোপিয়ান কমিশন অন হেলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের সদস্য
ইংরেজি থেকে ভাষান্তর : সুমৃৎ খান সুজন
