ব্রিটিশ কলামিস্টদের চোখে বরিস জনসনের বিদায়

আপডেট : ০৯ জুলাই ২০২২, ০৬:৪৫

১. জনসনের প্রত্যেক শিষ্য তার মতোই দোষী 
বরিস জনসনের বিদায় ঘণ্টা বেজে গেছে। এই বদমাশের জন্য কনজারভেটিভ পার্টিতে রাজনৈতিক শোকগাথা নেমে এসেছে। তবে তার মন্ত্রিসভার বহু অনুচর রয়ে গেছেন এখনো। তাকে অযোগ্য, বেপরোয়া ইত্যাদি বিশেষণে আখ্যায়িত করা হলেও এখনো তাকে একজন উপযুক্ত তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে থাকার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে। জনসনের বন্দনায় তাদের ব্যবহূত শব্দগুলো অনেকটা এরকম—‘সততা’, ‘মর্যাদা’, ‘শালীনতা’, ‘দেশের মঙ্গল’ ইত্যাদি। কিন্তু কে বিশ্বাস করবে—এই বরিস জনসন অলৌকিক সততার ঘোষণা দিয়ে বারবার নিজেদেরকেই হেয় করেছে! এখন তার অনুচরেরা কর্মজীবনের স্বার্থের হিসাব করতে বসেছে। তাদের প্রত্যেককেই প্রধানমন্ত্রী হওয়ার অযোগ্য ঘোষণা করা উচিত। মিথ্যা, কেলেঙ্কারি এবং জালিয়াতিতে যুক্ত নারী-পুরুষ (মন্ত্রী-অনুসারী-অনুচর) সকলেই বয়কট করা উচিত। তারা সকলেই দোষী।

 

২. তিনি তত্ত্বাবধায়ক হিসাবে অযোগ্য, তাকে আজই সরে যেতে হবে 
এটা ভালো খবর যে, জনসনকে শেষ পর্যন্ত ছেঁটে ফেলা হয়েছে গত কয়েক দিন ধরে তিনি যেভাবে ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে থাকার চেষ্টা করে গেছেন, তা চরম স্বার্থপরতার পরিচায়ক। শুধু কনজারভেটিভ পার্টিই নয়, দেশকেও হাসির পাত্রে পরিণত করেছেন তিনি। অনেক দেরিতে হলেও তাকে বিদায় করা গেছে—এটাই স্বস্তির বিষয়। সে এবং তার কিছু সহযোগী ‘ব্যক্তিগত ম্যান্ডেট’ নিয়ে জাল বিস্তারের প্রচেষ্টা করেছেন, যা সাংবিধানিকভাবে ক্ষতিকর ও বিপজ্জনক। 
দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠী এবং রক্ষণশীল সংসদ সদস্যদের উল্লেখযোগ্য অংশ স্পষ্টতই তার প্রতি আস্থা হারিয়েছেন। এর ফলে সরকার কার্যত পঙ্গু হয়ে গেছে। এমতাবস্থায়, একজন তত্ত্বাবধায়ক হিসাবেও তিনি যোগ্য নন। কাজেই, তিনি কীভাবে বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারেন তা একটি প্রশ্নসাপেক্ষ বিষয়। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তিনি যেভাবে নিজের ঢাকঢোল পিটিয়েছেন তার পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্ন উঠছে—একটি শান্ত এবং সুশৃঙ্খল পরিবর্তনের তত্ত্বাবধান করার ক্ষেত্রে তিনি কতটা যোগ্য ও বিশ্বস্ত? আরেকটি প্রশ্ন হলো, সহকর্মীরা তার অধীনে সম্মানজনকভাবে সেবা করতে আদৌ কি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবেন? এই পরিপ্রেক্ষিতে বলতেই হয়, জনসনকে এক্ষণই সরিয়ে দিতে হবে। আর এ বিষয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সময়ের জন্য বর্তমান উপ-প্রধানমন্ত্রী বা অন্য কোনো সিনিয়র সেক্রেটারি অফ স্টেটের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।


৩. কয়েক দশক ধরে থাকবে জনসনবাদের ক্ষত 
জনসন ইতিহাসে এমন এক ব্যক্তি হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন যিনি তার বহু উদ্ধৃতির পাশাপাশি ‘১৪ মিলিয়ন ম্যান্ডেট’ আউড়ে গেছেন। আধুনিক ব্রিটিশ রাজনীতিতে সম্ভবত সবচেয়ে কর্তৃত্ববাদী এজেন্ডা বাস্তবায়নের রূপকার তিনি। তার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ফলে দেশে মৌলিক মানবাধিকার হুমকির মুখে পড়ে। তিনি প্রতিবাদ ও ভোটের অধিকার হরণ, পুলিশিং কৌশলের অযাচিত সম্প্রসারণ এবং জনসাধারণের ব্যক্তিত্ব কিংবা প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহি করতে চায় এমন সব নেতিবাচকতাকে সমর্থন করে গেছেন। তার নেতৃত্ব রাজনৈতিক দুর্নীতি ও কুসংস্কারকে উসকে দিয়েছে। এখন জনসন যখন বেরোচ্ছেন, এই নীতিগুলোর পুনরোদ্ধারের বিষয়ে ভাবতে হবে। কেননা, তিনি যে কুমিরগুলোকে (অনুসারী) লালনপালন করেছিলেন সেগুলো এখনো দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। জনসন রাজনৈতিকভাবে ব্যাকবেঞ্চে নির্বাসিত হয়েছেন বটে, তবে তার রাজনৈতিক অনুচররা তার রেখে যাওয়া ভয়ঙ্কর কাজগুলো চালিয়ে যাবে, সম্ভবত আরো দক্ষতার সঙ্গে। অর্থাৎ, জনসন যুগ শেষ হতে পারে কিন্তু জনসনবাদের ক্ষত আগামী কয়েক দশক ধরে থাকবে।


৪. তিনি রাজনীতিতে জনগণের আস্থা নষ্ট করেছেন 
জনসন আইন ভঙ্গ করেছেন। তিনি বারবার মিথ্যা বলে গেছেন। তিনি আমাদের জীবনযাত্রার ব্যয় বা সংকট মোকাবিলায় বিপর্যয়করভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। এক কথায়, সরকার ও রাজনীতির প্রতি জনগণের আস্থা নষ্ট করেছেন। তবে ভুলে গেলে চলবে না, এই কাজ একা করেননি তিনি। তিন বছর ধরে কনজারভেটিভ বেঞ্চের ব্যানারে সাড়ে ৩০০-র বেশি ষড়যন্ত্রকারী কর্তৃক মদতপুষ্ট ছিলেন তিনি। তারা জনসনের প্রতিটি লজ্জাজনক মিথ্যার সঙ্গে মাথা নেড়ে গেছে। প্রতিটি বিপর্যয়মূলক নীতির সমর্থনে ভোটিং লবির মাধ্যমে দলবদ্ধ হয়ে কাজ করে গেছে তারা। সরকারকে গ্রাস করতে থাকা বিশৃঙ্খলা এবং পক্ষাঘাতকে তারা প্রতিরোধ করতে পারত অনায়াসে, যদিও তারা সে পথে হাঁটেনি। যদি তারা কয়েক মাস আগে জনসনকে ডাউনিং স্ট্রিট থেকে বের করে দিত কিংবা প্রথম হতেই বরিসকে তাদের নেতা হিসেবে সমর্থন না করত, তবে আজকের এ দিনটি দেখতে হতো না। তারা অনাস্থার প্রস্তাবকে সমর্থন করতে পারতেন, যা আমি জানুয়ারিতে পেশ করেছিলাম। যখন প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল যে, জনসন তার নিজস্ব লকডাউন আইন ভেঙেছেন এবং সংসদ ও জনসাধারণের কাছে এটি সম্পর্কে মিথ্যা বলেছেন, তাদের অনেক কিছু করার ছিল। কিন্তু তারা হাত গুটিয়ে বসে রইল, কিছুই করল না! বরিস জনসনকে এত দিন ধরে সমর্থন করার জন্য জনগণ তাদের ক্ষমা করবে না। আগামী সাধারণ নির্বাচনে কনজারভেটিভদের ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিতে হবে।


৫. সরকারের প্রশাসন যন্ত্রকে ধ্বংস করে দিয়েছেন তিনি 
গত তিন বছরে সিভিল সার্ভিসের প্রতি সরকারের কঠোর মনোভাব কঠিন সময়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। এ সময় মূলত বহু বেসামরিক কর্মচারীকে একটি ‘অন্য সমাজের’ অংশ হিসাবে দেখা হয়েছে। ব্রেক্সিটের প্রশ্নে কথা বলার কারণেই এই পরিণতি বরণ করতে হয় তাদের। ফিলিপ রুটনাম এবং জোনাথন স্লেটারের মতো বিচক্ষণ ও অভিজ্ঞ স্থায়ী সচিবরা কেউ পদত্যাগে বাধ্য হয়েছেন কিংবা কাউকে বরখাস্ত করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রসচিব প্রীতি প্যাটেল জুনিয়র স্টাফদের ধমক দিয়ে মন্ত্রীর কোড লঙ্ঘন করেছিলেন, যদিও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্হায় নেওয়া হয়নি! বরং তাকে চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল! এর মূল ভূমিকায় ছিলেন এমন একজন প্রধানমন্ত্রী যিনি কেবল সিভিল সার্ভিসের মূল্যবোধ, সততা, বস্তুনিষ্ঠতা, নিরপেক্ষতাকে অসম্মান করেননি, সেগুলোকে তাচ্ছিল্য করতে পারাকে আনন্দের খোরাক বলে মনে করেছেন। তার এ সমস্ত কর্মকাণ্ডই তাকে আজকের এই পতন দেখাল। এর মধ্য দিয়ে জনসাধারণের স্বস্তি মিলেছে বটে, তবে সিভিল সার্ভিসের যে ক্ষতি করে গেছেন বরিস তা কখনো ভোলার নয়। সামনের দিনগুলোতে প্রতিটি সেক্টরকে মেরামতের প্রয়োজন পড়বে।

লেখকবৃন্দ: পলি টয়নবি—গার্ডিয়ানের কলামিস্ট, বব নিল—কনজারভেটিভ এমপি, মোয়া লোথিয়ান-ম্যাকলিন—নোভারা মিডিয়ার সম্পাদক, এড ডেভি—লিবারেল ডেমোক্র্যাট নেতা, বব কেরস্লেক—সিভিল সার্ভিসের প্রাক্তন প্রধান 
দ্য গার্ডিয়ান থেকে অনুবাদ: সুমৃৎ খান সুজন

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন