ব্রিটেনের সাধারণ নাগরিকদের কাছে ফুটবল যতটুকু আলোচনা ও আগ্রহের বিষয়, সেই তুলনায় রাজনীতি তাদের কাছে একেবারেই তুচ্ছ। কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে ব্রিটেনে ফুটবলে বড় দলগুলোর পারফরম্যান্সের সঙ্গে এখানকার রাজনীতি, অর্থনীতি নিয়ে তাদের মধ্যেই সমানতালে আলোচনা হতে দেখা যাচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজনীতি এবং কূটনীতিতে যে দেশকে অনেক প্রেসক্রিপশন দিতে দেখা যায়, তাদেরই আট সপ্তাহের ব্যবধানে তিন জন প্রধানমন্ত্রীকে দেখতে হয়েছে। টালমাটাল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ব্রিটেনের ইতিহাসে সবচেয়ে কম সময়ে ক্ষমতা থেকে বিদায় নিয়েছেন লিজ ট্রাস। তার মেয়াদকাল ছিল মাত্র ৪৪ দিন। তার মেয়াদকালটা ব্রিটিশদের একটা বার্তা দিয়ে গেছে। আর তা হলো, দেশের পরিস্থিতি খারাপ হতে বেশি সময় লাগে না। সুতরাং এখন আবেগতাড়িত হওয়া যাবে না। আর এটারই বোধ হয় সুবিধাভোগী ঋষি সুনাক। আবেগের বিষয় আসার মূল কারণ হলো লিজ ট্রাসের প্রধানমন্ত্রী পদে নির্বাচন।
সাধারণ নির্বাচন ছাড়া ব্রিটেনের কনজারভেটিভ পার্টির নেতা এবং প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পদ্ধতিটা গণতান্ত্রিক হলেও কিছুটা ‘ডিকটেটেড’। কারণ হলো, প্রার্থী হতে হলে একটা নির্দিষ্টসংখ্যক এমপির সমর্থন লাগে। তবে কত জন এমপির সমর্থন লাগবে তা ঠিক করে পার্টির ‘কমিটি ১৯২২’। লিজ ট্রাস যখন প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন তখন এমপিদের প্রথম পছন্দ ছিলেন ঋষি সুনাক। ‘কমিটি ১৯২২’-এর দেওয়া শর্ত পালন করে দলের সাধারণ সমর্থকদের ভোটে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল লিজ ট্রাস এবং ঋষি সুনাকের। ফলাফল যা হওয়ার তা-ই হয়েছে। সাধারণ সমর্থকদের কাছে ‘ব্রিটিশনেস’ একটা বড় বিবেচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এমপিরা লিজ ট্রাসের নির্বাচনের বিপদটা বোধ হয় টের পেয়েছিলেন। তাই লিজ ট্রাস ক্ষমতায় বসার আগেই সিনিয়র নেতারা একে একে ব্যাক বেঞ্চার হয়ে গেলেন। লিজ ট্রাসের বিপদটা তখনই আঁচ করা গেছে। পেছন থেকে সিনিয়র নেতারা কলকাঠি নাড়লে সেটি প্রতিহত করার যে শক্তি দরকার তা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে লিজ ট্রাসের ছিল না। তার ওপর ট্রাসের অর্থনৈতিক নীতির কারণে একে একে ধস নেমেছে শেয়ারবাজারে, পাউন্ডে, সর্বক্ষেত্রে।
সংগত কারণেই ট্রাসের বিদায় নিশ্চিত ছিল। অর্থনীতির এই খারাপ সময়ে পরীক্ষিত নেতা ছাড়া উত্তরণ সম্ভব নয়। এ সত্যটা কনজারভেটিভ পার্টির নেতারা অনুধাবন করেছেন প্রকটভাবে। ঋষি সুনাক কোভিড পরিস্থিতিতে অর্থমন্ত্রী থাকাকালীন ভালোভাবেই সামাল দিয়েছেন। সুতরাং এমপিদের সামনে প্রতিযোগিতায় আসার মতো দ্বিতীয় কেউ ছিল না। কিন্তু নিয়মমাফিক যদি দলের সাধারণ সদস্যদের ভোটে যেতে হয়, তখন হয়তো লিজ ট্রাসের মতো অপরীক্ষিত কেউ চলে আসার সম্ভাবনা ছিল। সিনিয়র নেতাদের সমন্বয়ে গঠিত ‘কমিটি ১৯২২’-এ বিষয়টিকে মাথায় রেখেছিলেন। কমিটির কাছে একটা অজুহাতও ছিল। সেটা হলো স্বল্পতম সময়ে একজন নেতা নির্বাচন করা। এ কারণেই হয়তো তারা প্রার্থীদের প্রাথমিক যোগ্যতা হিসাবে ন্যূনতম ১০০ জন এমপির শর্ত বেঁধে দিয়েছিলেন। এই শর্তটাই মূলত ঋষি সুনাককে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পেতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। এমপিরা ভালো করেই জানেন শুধু ‘ব্রিটিশনেস’ আবেগ দিয়ে তাদের চাকরি টিকিয়ে রাখতে পারবেন না। অর্থনীতির গুণগত উন্নতি না হলে সামনের নির্বাচনে তাদের গণহারে বিদায় নিতে হবে। সাধারণ সদস্যদের ভোটে যাওয়ার রাস্তাটাকে তারা আরো কঠিন করে দিলেন। যার ফলে বিপুলসংখ্যক এমপি ঋষি সুনাকের পক্ষে অবস্থান পরিষ্কার করে দিয়েছিলেন। সুতরাং ফলাফল যা হওয়ার তা-ই হয়েছে।
বরিস জনসনের মতো প্রভাবশালী নেতাও প্রয়োজনীয় ১০০ এমপির সমর্থন পেলেন না। সুতরাং ব্রিটেন প্রথমবার এমন একজন প্রধানমন্ত্রী পেল যাকে কোনো ভোটাভুটির সম্মুখীন হতে হয়নি। কোনো প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটারদের মনোযোগ আকর্ষণের দরকার হয়নি। তাই স্বাভাবিকভাবেই এখন প্রশ্ন উঠবে, সাধারণ সদস্যদের বিপুল সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসা লিজ ট্রাস টিকলেন মাত্র ৪৪ দিন। তাহলে ভোটবিহীন ক্ষমতায় আসা ঋষি সুনাক কত দিন?
ঋষি সুনাক যে ক্যাবিনেট দিয়েছেন তা থেকে আনুমানিক একটা বিশ্লেষণ দেওয়া যেতেই পারে।
ক্যাবিনেট গঠনের মাধ্যমে তিনি কিন্তু তিনটি বিষয় মানুষকে আশ্বস্ত করতে চাইছেন :প্রথমত অর্থনীতি, দ্বিতীয়ত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং তৃতীয়ত ‘ব্রিটিশনেস’-এর পরীক্ষা।
চলমান মূল্যস্ফীতি সমস্যা, জ্বালানির লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি, শেয়ারবাজার এবং মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা নিয়ে আসতে পরীক্ষিত নেতাকেই তিনি সঙ্গী করেছেন। ট্রেজারিতে কাজ করার সময় জেরেমি হান্ট ছিলেন ঋষি সুনাকের বস। সুতরাং অর্থনীতি ইস্যুতে এ দুজনের পরিকল্পনা নিয়ে মানুষের আস্থা তৈরি হয়েছে বলেই ধারণা করা যায়। ইতিমধ্যে পাউন্ডের অব্যাহত দরপতন বন্ধ হয়েছে। ঋষি সুনাক ভালো করেই জানেন শুধু অর্থনীতি দিয়ে দ্বিধাবিভক্ত পার্টির নেতৃত্বে দীর্ঘদিন থাকা যাবে না। তাই ক্যাবিনেটে এমন সব ব্যক্তিদের নিয়ে এসেছেন, যাদের কারণে পেছন থেকে কলকাঠি নাড়া নেতাদের শক্তি খর্ব হবে। ডমিনিক রাবকে বলা হতো বরিস জনসনের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ জন। বরিসের যখন কোভিড হয় তখন প্রধানমন্ত্রীর নিয়মিত কাজগুলো করার দায়িত্ব পালনে ডমিনিক রাবের ওপর আস্থা রেখেছিলেন। ঋষি সুনাকের কেবিনেটে উপপ্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বটা তাকেই দিয়েছেন। এর মাধ্যমে তিনি পার্টির দ্বিধাবিভক্তি কমানোর ক্ষেত্রে তার আগ্রহের জায়গাটা পরিষ্কার করেছেন। কনজারভেটিভ পার্টির আরেক প্রভাবশালী নেতা মাইকেল গোভকেও নিয়েছেন কেবিনেটে। ডেভিড ক্যামেরন থেকে এ পর্যন্ত যত জন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তাদের মধ্যে লিজ ট্রাস ছাড়া সবার অধীনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন গোভ। দলের ভেতর তার রয়েছে উল্লেখ করার মতো প্রভাব। শুধু তা-ই নয়, জনশ্রুতি আছে, তিনি মিডিয়া মোগল বলে পরিচিত রুপার্ট মারডকের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। এটাও নাকি তার রাজনীতির ক্ষেত্রে একটা যোগ্যতা হিসেবে গণ্য হয়।
তৃতীয়ত, অন্য সব প্রধানমন্ত্রীকে ‘ব্রিটিশনেস’-এর পরীক্ষা দিতে না হলেও ঋষি সুনাককে দিতে হবে। বলা চলে, তাকে টিকে থাকতে হলে ১৫০ ভাগ ব্রিটিশ—এ রকম একটা পরিস্থিতি হয়তো উনাকে দাঁড় করাতে হবে। ঋষি সুনাক তার কেবিনেটে বিতর্কিত সিউলা ব্রেভারমেনকে হোম সেক্রেটারি নিয়োগের মাধ্যমে ‘ব্রিটেশনেস’ পরীক্ষার প্রাথমিক একটা বার্তাও দিয়েছেন। কথাবার্তায় সিউলা ব্রেভারমেন ইমিগ্রেশন ইস্যুতে এযাবত্কালের কট্টর ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছেন। ইতিমধ্যে তিনি বলে দিয়েছেন, সাগর পাড়ি দিয়ে যারা ব্রিটেনে প্রবেশ করবেন, তাদের ফাইনাল গন্তব্য হবে রুয়ান্ডা।
এ তিন ইস্যুর পরীক্ষায় ঋষি সুনাক কেমন পারফরম্যান্স করেন, তার ওপর নির্ভর করবে আগামী নির্বাচন পর্যন্ত তিনি থাকতে পারবেন কি না। তবে, অর্থনীতি এবং দলীয় এমপিদের দ্বিধাবিভক্তি ঠেকাতে পারলে তিনি আগামী নির্বাচন পর্যন্ত থাকবেন, এমনটা ধারণা করা অযৌক্তিক হবে না।
লেখক : লন্ডন প্রবাসী সাংবাদিক

