বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৪ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

এইভাবে চলিতে পারে না

আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৩:৩৫

পৃথিবীতে বহু দেশেই রক্তক্ষয়ের ভিতর দিয়া পরিবর্তন হয়। পরিবর্তনের কিছু দিন পর দেখা যায়—‘যেই লাউ সেই কদু’। কিন্তু কেন? দেখা যাইতেছে, যিনি এখন বিচারের জন্য ছুটিতেছেন তিনি বিচারের বারান্দার ধারেকাছেও ঘেঁষিতে পারিতেছেন না। অথচ যাহার বিরুদ্ধে অভিযোগ, সেই দুর্নীতিবাজ, অর্থশালী ব্যক্তিই তাহার বিরুদ্ধে পালটা বিচারের ব্যবস্থা করিয়া বসিয়া আছে! প্রশ্ন হইল, লুটপাটকারী, মাদক কারবারিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের দুর্নীতিবাজরা কী করিয়া বুক ফুলাইয়া দাপটের সহিত চলিতে পারিতেছে? 

দুর্নীতি প্রতিহত করিতে এবং দুর্নীতিবাজদের শায়েস্তা করিতে রাষ্ট্রের অনেক মেশিনারিজ রহিয়াছে, স্বয়ং দুদক রহিয়াছে। এই সকল মেশিনারিজ কেন কাজ করিতেছে না? বেশির ভাগ উন্নয়ন ও সেবামূলক অফিসে কেন গড়িয়া উঠিয়াছে ‘খাম’ কালচার? খামের মধ্যে নির্দিষ্ট হারে টাকাপয়সা না দেওয়া ছাড়া যদি কোনো কাজই না হয়, তাহা হইলে কোথায় থাকে রাষ্ট্রের নিয়মনিষ্ঠা? দুদকের কাজটাই-বা কী? রাস্তাঘাট যদি বর্ষার সময় ভাঙিয়া গিয়া খালের মধ্যে ডুবিয়া যায়, তবে কতখানি ফাঁকি দিয়া এই সকল কাজ করা হইয়াছে? অনিয়ম ও কাজের ফাঁকির লক্ষ লক্ষ ঘটনার ফিরিস্তি লিখিতে গেলে পুকুরসমান কালি ফুরাইয়া যাইবে, সহস্র-অযুত রিম কাগজ শেষ হইয়া যাইবে। এই যে বিকেন্দ্রীকরণের এত ইতিবাচক পরিকল্পনায় চেয়ারম্যান-মেম্বারদের পদায়ন করা হইয়াছে, তাহারা যদি লুটপাটের জন্যই ঐ চেয়ারে বসিতে মরিয়া থাকে, তাহা হইলে রাষ্ট্রের সুফল কোথায়? সরিষা যদি ভূত তাড়াইতে কাজ না করে, কী মূল্য আছে ঐ সরিষার?

কাহারা এই লুটপাটকারী? সরকারের নির্বাহী প্রধান দৃঢ়তার সহিত প্রায়শই বলিয়া থাকেন, তাহার দলের মধ্যে লুটপাটকারী রাজাকারদের স্থান নাই। অথচ বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলে। বর্তমান ক্ষমতাসীন দল একসময় যাহাদের বিরুদ্ধে দিনের পর দিন আন্দোলন ও আত্মত্যাগ করিয়াছে, সেই রাজাকার-আলবদর-আলশামসরাই আজ তাহাদের দলের অন্দরে সুচ হইয়া অনুপ্রবেশ করিয়াছে। ইহাদের পরিচয় সকলেই জানেন, তাহার পরও বিভিন্ন কৌশলে ইহারা সরকারি দলের অভ্যন্তরে শিকড় হইতে মগডাল পর্যন্ত—সর্বত্রই মহাপ্রতাপের সহিত বিরাজ করিতেছে এবং ছড়ি ঘুরাইতেছে। ইহারাই এখন ক্ষমতাসীন দলকে নিজেদের অভয়ারণ্যে পরিণত করিয়াছে। ক্ষমতাসীন দলও নিশ্চয়ই জানে, তাহাদের ভিতরে বাসা বাঁধিয়াছে লক্ষ লক্ষ সংখ্যক গিরগিটি। তাহারা যেন বুঝিয়াও না বুঝিবার ভান করিয়া আছে। অথচ, ইহা বুঝিতে রকেটবিজ্ঞানী হইবার প্রয়োজন নাই যে, ইহারা কখনই আওয়ামী লীগের ছিল না। কিন্তু ইহারাই রং বদলাইয়া বটবৃক্ষের ছায়ায় আশ্রয় লইয়া গিরগিটির মতো বড় করিয়া জিভ বাহির করিয়া বসিয়া রহিয়াছে বড় শিকার ধরিবার জন্য। ইহারা কখনই আওয়ামী মনোভাবাপন্ন ছিল না বিধায় নির্দ্বিধায় করিয়া চলিতেছে বিভিন্ন ধরনের অপকর্ম। ক্ষমতার মদমত্তে ইহারা জেলা-উপজেলা কিংবা থানা পর্যায়েও নিজেদের ইচ্ছানুযায়ী প্রশাসনকে পরিচালিত করিতেছে।

এই ব্যাপারে মৃত্যুর পূর্বে প্রথিতযশা সাংবাদিক কলামিস্ট আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী তাহার উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার কথা বলিয়া গিয়াছেন। তিনি ছিলেন ক্ষমতাসীন দলের অন্যতম প্রবীণ একনিষ্ঠ হিতাকাঙ্ক্ষী। তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলিয়াছেন, রাজাকারদের তালিকা করিলে দেখা যাইবে, রাজাকাররাই সেই তালিকা তৈরি করিতেছে। ঐ তালিকায় মুক্তিযোদ্ধারা রাজাকার, রাজাকাররা মুক্তিযোদ্ধা হইয়া যাইবে। তিনি আরও বলিয়াছেন, আওয়ামী লীগে কত রাজাকার আছে। বিপদের সময় ইহারা ভয়ানকভাবে আসে। তাহারা এখন বঙ্গবন্ধুর নাম বেশি বলে। তিনি অতীত রোমন্থন করিয়া বলিয়াছেন যে, এই চিত্র বঙ্গবন্ধুর সময়েও দেখা গিয়াছিল। বঙ্গবন্ধুর সময়ে তিনি লন্ডনে ছিলেন, ফিরিয়া আসিয়া দেখেন বঙ্গবন্ধুর যিনি মুখ্য সচিব হইয়াছেন, তিনি পাকিস্তান রাজাকার বাহিনীর স্কোয়াড লিডার ছিলেন। আরেকবার দেখেন কর্নেল ফারুককে বঙ্গবন্ধু তাহার পারসোনাল গার্ডদের প্রধান হিসাবে নির্বাচিত করিয়াছেন। সরদার আলীকে তিনি গোয়েন্দা দপ্তরের প্রধানের দায়িত্ব দিয়াছেন—যিনি কিনা পাকিস্তান গোয়েন্দা বাহিনীর পূর্ব পাকিস্তান অংশের প্রধান ছিলেন।

সুতরাং বর্তমান সময়ে যাহা চলিতেছে, তাহা এইভাবে চলিতে পারে না। যেহেতু এইভাবে চলিতে পারে না, সুতরাং অবশ্যই এইভাবে চলিবে না। কিন্তু ইহার মাঝখানে জনগণের আরও কত দুর্ভোগ পোহাইতে হইবে এবং আরও কত রক্ত ঝরিবে—আমরা তাহা জানি না।

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন