বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৪ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

তরুণদের বইমুখী করতে কাজ করছে যেসব সংগঠন

শূন্য দশকের শুরুতে যাদের শৈশব কেটেছে, তাদের অধিকাংশের অবসর যাপন হতো বইয়ের সঙ্গে সখ্যতায়। দুপুরের ভাতঘুম ফেলে বইয়ের পাতায় কত মধুর সময় কাটিয়েছে তারা! সেসব আজ এখন ধূসর অতীত। আজকাল আর মানুষ বই পড়ছে কই! পৃথিবী আবারও বইয়ের হবে, এমন স্বপ্ন নিয়ে মানুষকে বইমুখী করতে কাজ করছে অনেকে। গড়ে তুলছে বইকেন্দ্রিক সংগঠন। এমন চারটি সংগঠনের গল্প তুলে ধরেছেন জহিরুল কাইউম ফিরোজ

আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২২, ২০:৩৮

বইপোকাদের আড্ডাখানা
ফেসবুক বাংলাদেশে পুরনো এক কমিউনিটি। ২০১৩ সালের ২৪ আগস্ট ওয়াহিদ অনঘের হাত ধরে যাত্রা শুরু করা বইপোকাদের আড্ডাখানা; যা অনেক প্রথমের সাথে পরিচয় করিয়েছে বইপ্রেমীদের। বই নিয়েও ফেসবুক গ্রুপ হয়—এমন ভাবনাই ছিল না তখন। ধীরে ধীরে পরিসর বাড়তে থাকে। মূল উদ্দেশ্য, সব বয়সের মানুষকে বই পড়ায় আগ্রহী করে তোলা।

২০১৬-২০১৭ সালের দিকে বুক রিভিউ নেওয়া শুরু করে গ্রুপটি। পাশাপাশি বই, ছবি, কুইজ, গল্পপূরণসহ নিয়মিত নানা প্রতিযোগিতা আয়োজনের মাধ্যমে পাঠকের আগ্রহ তৈরি করে। সদস্য সংখ্যা তিন লাখে পৌঁছালে হঠাত্ একদিন ফেসবুক ব্লক করে দেয় গ্রুপটি। পরে নতুন করে শুরু করা হয় বইপোকাদের আড্ডাখানা। এখন সদস্য সংখ্যা প্রায় ষাট হাজার।

গ্রুপের অ্যাডমিন তাসফিয়া প্রমি বলেন, ‘নতুন অনেক পাঠক তৈরি হচ্ছে, বই পড়তে আগ্রহী হচ্ছে। সবাই বই নিয়ে নিজস্ব মতামত প্রকাশ করতে পারছে। আমরা প্রতিনিয়ত চেষ্টা করছি পাঠকের জন্য অভিনব কিছু করার। ইতিবাচক দিক হলো পাঠক, লেখক ও  প্রকাশকের পারস্পরিক সংযোগে সবসময় উত্সবের আবহ ধরে রাখা।’



বাংলাদেশ বুকওয়ার্ম অ্যাসোসিয়েশন
ভিন্নধর্মী চিন্তাধারা থেকে উদ্ভব ঘটে বাংলাদেশ বুকওয়ার্ম অ্যাসোসিয়েশনের। বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় তরুণদের সাহিত্যের সংস্পর্শে নিয়ে আসার লক্ষ্যে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে আত্মপ্রকাশ করে সংগঠনটি। শুরু থেকেই তারা হেঁটেছে ভিজ্যুয়ালের দিকে। করোনায় ‘উন্মুক্ত সাহিত্য আলোচনা’ অনুষ্ঠানে শতাধিক লেখকের সাক্ষাত্কার নেয় তারা। নতুন লেখকদের ওঠিয়ে আনা, তাদের বই সম্পর্কে সকলকে জানানো এবং বই নিয়ে নিত্যনতুন কনটেন্ট নির্মাণে মনোযোগ দিচ্ছে বুকওয়ার্ম। সেই  ধারাবাহিকতায় তুলে আনছে লেখকের গল্প ও বইয়ের কথা। পাঠককে পরিচয় করাচ্ছে শুদ্ধ সাহিত্যের সাথে। বাংলাদেশে বই নিয়ে এমন উদ্যোগ এর আগে অন্য কোনো সংগঠন নেয়নি।

বুকওয়ার্মের প্রধান নির্বাহী নাহিদ বাদশা বলেন, ‘লেখকদের কথা সরাসরি তুলে ধরায় তরুণ প্রজন্ম সাহিত্য ও বই পড়ার বিষয়টি অনুধাবন করতে পারছে। আগামীতে দেশের সকল জেলার কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে বই পড়াকে সহজ করে তুলতে কাজ করব আমরা। বুকওয়ার্ম হবে বইপ্রেমীদের নিরপেক্ষ বার্তার গুরুত্বপূর্ণ এক মাধ্যম।’



বই বৃক্ষ
জ্ঞানের ছায়ায় বসে মুক্তবুদ্ধির চর্চা হয় বই পাঠের মাধ্যমে। বই বৃক্ষ ঠিক তেমনই একটি সংগঠন। পাঠকদের বিনামূল্যে বই পড়ানোর তাগিদে ইতোমধ্যে দেশের ৯টি জেলায় ১৩টি সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজে ১৫টি দল কাজ করছে। যেসব জায়গায় তাদের শাখা রয়েছে  সেখান থেকে পাঠকদের বাসায় বই পৌঁছে দেওয়া এবং পড়া শেষ হলে ফেরত নিয়ে আসা হয়। সংগঠনের বয়স তিন বছর। এই সময়ে পাঠক সংখ্যা ছয় হাজার ছাড়িয়েছে। বই বৃক্ষ থেকে প্রতি মাসে বই পড়েন প্রায় ৯৮৬ জন। নতুনভাবে তৈরি হয়েছে ৪৭১ জন পাঠক; যাদের বই পাঠের হাতেখড়ি বই বৃক্ষের হাত ধরে। এছাড়া আটটি শহরে রয়েছে শিশু কর্ণার, যেখান থেকে শিশুরা বই পড়তে পারে। অভিভাবকদের জন্য আছে তিনটি শহরে অভিভাবক কর্ণার।

সংগঠনটির অন্যতম সমন্বয়ক মুহাম্মদ বিন এমরান বলেন, ‘তরুণদের মাঝে বইয়ের চাহিদা প্রচুর। সেটির যোগান দিচ্ছে বই বৃক্ষ। পুরো দেশকে এভাবে বইয়ের আলোয় উজ্জ্বল করে একটা ইতিবাচক পরিবর্তন আনার প্রচেষ্টায় কাজ করছি। আমরা চাই, জ্ঞানের ছায়ায় শুদ্ধ হোক মানবজীবন।’



কুমিল্লার বইপোকা
বইকে কেন্দ্র করে বেড়ে ওঠা সংগঠনের অধিকাংশ যেখানে দেশব্যাপী পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখে, কুমিল্লার বইপোকা সেখানে ব্যতিক্রম। শুরুটা হোক ঘর থেকে— এমন ভাবনার প্রেক্ষিতে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে একদল তরুণ ভাবুক গড়ে তোলেন ‘কুমিল্লার বইপোকা’ সংগঠন। প্রতিমাসে বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়, যেখানে পুরস্কার হিসেবে থাকে বই। অনলাইনে সীমাবদ্ধ না রেখে অফলাইনে বইয়ের প্রতি ভালোবাসা ছড়িয়ে দিতে কাজ করছে তারা। হুমায়ূন আহমেদের জন্মবার্ষিকীতে ঘটে লেখক-পাঠক সমাবেশ। সংগঠনটির প্রধান লক্ষ্য কুমিল্লা জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে আঞ্চলিক পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করা। সবচেয়ে ভালো লাগার বিষয় হলো, সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের বই পাঠে উদ্বুদ্ধ করতে নানা সময়ে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত করা হয়।

প্রতিষ্ঠাতা সদস্য তুহিন মাজহার বলেন, ‘স্মার্টফোনের দাপটে আজ তরুণরা বইবিমুখ হচ্ছে। তাদেরও দোষ দেওয়া যাবে না; কারণ সমাজে পর্যাপ্ত পাঠাগার নেই। আমরা চাই কুমিল্লার সবগুলো অঞ্চলে উন্মুক্ত পাঠাগার তৈরি করতে। সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের ভাত-কাপড়ের কথা ভাবলেও সমাজ বই পড়াটায়  গুরুত্ব দেয় না। এ দিকটায় বিশেষ নজর রাখছে কুমিল্লার বইপোকা।’

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন