বুধবার, ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১৮ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

যুদ্ধ শুরু করা সহজ, শেষ করা কঠিন

আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৯:৪৭

জাতীয় নেতারা তাদের বিপদে-আপদে ভুলে যান এমন গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পররাষ্ট্রনীতির ওপর আমি বেশ কয়েকটি কলাম লিখেছি। এই নীতিগুলো হলো ক্ষমতার ভারসাম্য, জাতীয়তাবাদ ও নিরাপত্তাগত দ্বিধাদ্বন্দ্ব। চলতি সপ্তাহে আমি আরেকটি প্রস্তাব দিচ্ছি, এটি আমার একটি সাধারণ পর্যবেক্ষণ, যা প্রতিটি বিশ্বনেতা বা পররাষ্ট্রনীতি উপদেষ্টাদের উচিত তাদের ডেস্কে ও অফিসের দেওয়ালে লিখে রেখে বিশেষভাবে প্রদর্শন করা। অথবা সম্ভবত তাদের চোখের পাতার অভ্যন্তরে ট্যাটু করা উচিত, যাতে তারা আর তা না করেন। তাদের কখনোই ভোলা উচতি হবে না- ‘যুদ্ধ শেষ করার চেয়ে শুরু করা অনেক সহজ’।

জিওফ্রে ব্লেইনি তার ক্ল্যাসিক বই ‘দ্য কজস অব ওয়ার’-এ বর্ণনা করেছেন, অতীতের অনেক দ্বন্দ্ব ‘আসন্ন যুদ্ধের স্বপ্ন ও বিভ্রান্তি’ দ্বারা পরিচালিত হয়েছে। বিশেষ করে তাদের এই বিশ্বাস ছিল যে, এটি দ্রুত শেষ হয়ে যাবে, মূল্য কম দিতে হবে এবং চূড়ান্ত বিজয় এনে দেবে। উদাহরণস্বরূপ, ১৭৯২ সালে অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি, প্রুশিয়া ও ফ্রান্সের সেনাবাহিনী সবাই যুদ্ধক্ষেত্রে ছুটে যায় এই বিশ্বাসে যে, যুদ্ধটি একটি বা দুটি সংঘর্ষের পরেই শেষ হবে, এতে সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। ফরাসি র্যাডিক্যালরা ভেবেছিলেন তাদের সাম্প্রতিক বিপ্লব দ্রুত অন্যদের কাছে ছড়িয়ে পড়বে এবং বিরোধী রাজতন্ত্রগুলো বিশ্বাস করেছিল যে বিপ্লবী বাহিনীগুলোর সেনারা অযোগ্য ও নিম্নমানের। তাদের পেশাদার সেনাবাহিনী সহজেই তাদের এক পাশে সরিয়ে দেবে। এর পরিবর্তে তারা পেয়েছিল প্রায় এক-চতুর্থাংশ শতাব্দী তথা ২৫ বছরের পুনরাবৃত্তিমূলক যুদ্ধ। এই যুদ্ধ সমস্ত প্রধান শক্তিকে টেনে এনেছিল এবং ছড়িয়ে পড়েছিল বিশ্ব জুড়ে।

একইভাবে ১৯১৪ সালের আগস্টে ইউরোপের দেশগুলো যুদ্ধযাত্রা শুরু করে। তারা বলেছিল, সেনারা ক্রিসমাস বা বড়দিনের ছুটির মধ্যে বাড়ি ফিরে আসবে। কিন্তু তারা জানত না যে, ১৯১৮ সালের বড়দিনের আগ পর্যন্ত তাদের প্রত্যাশিত স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ঘটবে না। ইরাকি নেতা সাদ্দাম হোসেন ১৯৮০ সালে একই বিভ্রমের শিকার হয়েছিলেন। তার এই বিশ্বাস ছিল যে, একটা ইরাকি আক্রমণই ১৯৭৯ সালের সংঘটিত ইরানের বিপ্লবকে কাবু করে ফেলবে। অথচ এই যুদ্ধ স্থায়ী হয়েছিল আট বছর। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর দেখা গেল দুটি দেশেরই হাজার হাজার লোক মারা গেছে এবং তারা বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।

এমনকি অত্যন্ত সফল সামরিক অভিযানগুলোও অনেক সময় দ্রুত বিজয়ের দিকে নিয়ে যায় না, বরং এগুলো নিয়ে যায় এক অন্তহীন জলাবদ্ধতার দিকে। ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরাইলের মধ্যে সংঘটিত ছয় দিনের যুদ্ধটি এক সপ্তাহেরও কম সময় ধরে চলেছিল বটে। তবে শেষ পর্যন্ত এটি ইসরাইল ও তার প্রতিবেশীদের মধ্যে অন্তর্নিহিত কোনো রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান করতে পারেনি, বরং আরও ব্যয়বহুল যুদ্ধ (১৯৬৯-১৯৭০) ও ১৯৭৩ সালের অক্টোবরের যুদ্ধের জন্য মঞ্চ তৈরি করে মাত্র। ১৯৮২ সালে লেবাননে ইসরাইলের আগ্রাসন সামরিকভাবে সফল হয়েছিল। কিন্তু দক্ষিণ লেবাননের দখলদারিত্ব ১৮ বছর স্থায়ী হয়। এ সময় শত শত মানুষ প্রাণ হারায়। এর ফলে হিজবুল্লাহর সৃষ্টি হয় এবং আরো অনেক ব্যয়বহুল সংঘর্ষের ভিত্তি স্থাপন করে। ১৯৯১ সালের অপারেশন ডেজার্ট স্টর্মের চেয়ে বেশি সফল সামরিক অভিযান খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে। কিন্তু একসময় সাদ্দাম হোসেনের সেনাবাহিনীকে কুয়েত থেকে উত্খাত করা হয়। তিনি কোনো রকমে ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে রাখতে সক্ষম হন। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরাকের নো-ফ্লাই জোনে টহল দেয় এবং এক দশক ধরে মাঝে মাঝে বিমান হামলা চালায়।

২০০১ সালে আফগানিস্তানে এবং ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক সাফল্য সম্পূর্ণরূপে অলীক প্রমাণিত হয়। এ দুই দেশের বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ছিল ব্যয়বহুল এবং শেষ পর্যন্ত তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। সৌদি আরবের মোহাম্মদ বিন সালমানের উচিত ছিল ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে তার নিজের অশোভন যুদ্ধ শুরু করার আগে সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে চিন্তাভাবনা করা।

রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিন হলেন সর্বশেষ বিশ্বনেতা, যিনি যুদ্ধ শুরু করেছেন একই বিশ্বাস নিয়ে। তার বিশ্বাস ছিল যে, খুব দ্রুত ও সহজে বিজয় আসবে। পুতিন বিশ্বাস করেছিলেন, এই যুদ্ধের প্রাথমিক লক্ষ্যগুলো অর্জনে এত বেশি সময় লাগবে না, তাকে খুব বেশি মূল্যও দিতে হবে না। তার এই বিশ্বাসের কারণ তিনি রাশিয়ার শক্তিকে বড় করে দেখেছেন, ইউক্রেনের প্রতিরোধের সংকল্পকে অবমূল্যায়ন করেছেন এবং তৃতীয় পক্ষগুলো কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে তার হিসাব-নিকাশে ভুল করেছেন। তিনি এখন বিশ্বের অন্যান্য নেতার মতো বিশ্ব ইতিহাসের সেই একই বেদনাদায়ক পাঠ থেকে শিক্ষা নিচ্ছেন, তা হলো : যুদ্ধ শেষ করার চেয়ে যুদ্ধ শুরু করা অনেক সহজ।

এটা অনস্বীকার্য যে যুদ্ধ সব সময়ই অনিশ্চিত। যুদ্ধ-পূর্বের অনুমানগুলো প্রায়শই ত্রুটিপূর্ণ থাকে। লড়াই অনেক সময় এক অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতি ও পরিস্থিতি তৈরি করে, যা যুদ্ধপূর্ব হিসাব-নিকাশকে অপ্রাসঙ্গিক করে তোলে। যুদ্ধবাজ নেতাদের এমন কিছু শক্তিশালী প্রবণতা আছে, যার কারণেও যুদ্ধগুলো দীর্ঘায়িত হয়। এতে বেড়ে যায় যুদ্ধের খরচও। প্রথমত, প্রতিপক্ষ কতটা প্রচণ্ডভাবে প্রতিরোধ করবে তা আগে থেকে জানা অসম্ভব এবং আক্রমণের কথা ভাবছেন এমন নেতারা এটিকে অবমূল্যায়ন করতে পারেন। জাতীয়তাবাদের শক্তিকে উপলব্ধি করতে ব্যর্থতা এবং সম্ভাব্য সব শত্রু থেকে নিজের জাতিকে সহজাতভাবে উন্নত হিসাবে দেখার প্রবণতা আক্রমণকারীদের প্রতিপক্ষের প্রতিরোধ করার ক্ষমতাকে ছাড় দিতে উত্সাহিত করে। কেউ যুদ্ধ শুরু করে না, যদি তারা চিনতে পারে যে তাদের প্রতিপক্ষ শক্তিশালী, আরো ঐক্যবদ্ধ এবং ফলাফল সম্পর্কে আরো যত্নশীল।

দ্বিতীয়ত, একবার প্রতিপক্ষ ক্ষতির সম্মুখীন হলে তাদের নেতারা ইতিমধ্যে করা আত্মত্যাগের ন্যায্যতা দেওয়ার জন্য যথেষ্ট লাভ অর্জন করতে চাইবেন। যে পরিবারগুলো প্রিয়জনকে হারিয়েছে, তারা বলতে চাইবে না যে সেই আত্মদান বৃথা যাক। সামরিক কমান্ডাররা হয়তো যুদ্ধের ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করেছেন বা আগে থেকেই প্রাথমিক সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন, কিন্তু তারা পরাজয়ের দায়ভার নিজের কাঁধে নিতে চাইবেন না এবং বিজয় অর্জনে প্রতিটি সুযোগের জন্য চাপ সৃষ্টি করবেন। যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি পুনরুদ্ধার করার ইচ্ছা প্রতিটি পক্ষকে যুদ্ধ আরো সম্প্রসারিত করার কাজেই উত্সাহিত করে। তৃতীয়ত, যুদ্ধ চলতেই থাকে, কারণ লড়াইয়ের সঙ্গে একে অপরের ভাবমূর্তি জড়িত। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ঘৃণা ও সন্দেহের অনুভূতিগুলো কেবল বৃদ্ধি পায়। কারণ প্রত্যেকে একে অপরকে আরো বেশি মৃত্যু, ধ্বংস ও দুর্ভোগ দ্বারা পীড়িত করে। এই পরিস্থিতিতে প্রতিশোধ নেওয়ার আকাঙ্ক্ষাই স্বাভাবিক। ফলে ক্রমবর্ধমান ঘৃণার কারণে শত্রুর বিরুদ্ধে নিষ্পত্তিমূলক বিজয়ের আকাঙ্ক্ষাকে উসকে দেয়।

চতুর্থত, শত্রুর ভাবমূর্তি শক্তিশালী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আলোচনার ক্ষমতা হ্রাস পায়। কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। সরাসরি যোগাযোগকে আরো কঠিন করে তুলতে পারে। কেউ আপসের সম্ভাবনা বাড়াতে সাহসী পদক্ষেপ নিলে তাকে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে নিন্দা করা হতে পারে। এমনকি যদি আলোচনা শুরু হয়, তবে কোনো পক্ষই চুক্তি স্থাপনে অপরকে যথেষ্ট বিশ্বাস করবে না। উদাহরণস্বরূপ, ইউক্রেনের ক্ষেত্রে ভলোদিমির জেলেনস্কি সরকারের পুতিন বা তার সহযোগীদের বিশ্বাস না করার প্রতিটি কারণ রয়েছে। এই মুহূর্তে পুতিন ও তার উপদেষ্টারাও কাউকে বিশ্বাস করেন না। এজন্য গত সপ্তাহে জেনেভায় জাতিসংঘে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত গেনাডি গ্যাটিলভ সম্ভবত সঠিক কথাই বলেছিলেন, ‘সংঘাত যত বাড়বে, কূটনৈতিক সমাধান করা ততই কঠিন হবে।’

পঞ্চমত, যদি এক পক্ষ হেরে যায়, তবে এটি আরো শক্তি প্রয়োগ, নতুন এবং আরো বিপজ্জনক লক্ষ্যগুলোতে আঘাত করতে পারে। ক্রিমিয়ার সাম্প্রতিক বিস্ফোরণ, জাপোরিঝিয়া পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্রের বিপজ্জনক পরিস্থিতি এবং মস্কোতে পুতিনপন্থী ভাষ্যকারের গাড়িবোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় এটিই প্রমাণিত হয়। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধও একটি নিখুঁত উদাহরণ। সিরিয়ার একটি অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহের সূচনা শেষ পর্যন্ত রাশিয়া, তুরস্ক, ইরান, সৌদি আরব, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও অন্যদের দ্বারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সামরিক হস্তক্ষেপের সূত্রপাত করে। দুর্ভাগ্যবশত, যত বেশি অন্যান্য দেশ জড়িত হবে এবং একটি সংঘাতের ফলাফলে অংশীদার হবে, তাদের সবাইকে এটি শেষ করতে রাজি করানোটা তত কঠিন হবে।

ষষ্ঠ সমস্যা হলো, তথ্যের ক্রমবর্ধমান বিভ্রান্তির কারণেও যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয়। সাবেক সিনিয়র মার্কিন কর্মকর্তা হিরাম জনসন যথার্থ বলেছেন, ‘যুদ্ধ শুরু হলে প্রথমেই আঘাত আসে সত্যের ওপর।’ যদিও যুদ্ধরত দেশগুলোর উচিত যতটা সম্ভব শান্তভাবে চিন্তা করা ও কাজ করা, কিন্তু যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি এটিকে কঠিন করে তোলে। কেননা, তারা সেন্সরশিপ আরোপ এবং ভিন্নমত পোষণকারীদের দমন করে। এমনকি ভেতরে যারা আছেন, তাদের পক্ষে যুদ্ধক্ষেত্রে সত্যিই কী ঘটছে তার একটি সঠিক চিত্র পাওয়াই কঠিন হয়ে পড়ে। যুদ্ধরত সব পক্ষের অভিজাত ও জনসাধারণ উভয়েই যদি বিশ্বাস করে যে যুদ্ধটি তাদের পক্ষে ভালো চলছে, তবে এটি বন্ধ করার জন্য তারা খুব বেশি চাপ সৃষ্টি করবে না। যেমন—ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড লয়েড জজ ১৯১৭ সালে মন্তব্য করেছিলেন, ‘মানুষ যদি সত্যিই জানত (সামনের অবস্থা সম্পর্কে), তাহলে যুদ্ধ আগামীকাল বন্ধ হয়ে যেত। তবে অবশ্যই তারা জানে না এবং জানতে পারে না।’

এছাড়া চূড়ান্ত সমস্যা হলো, যেসব লোক যুদ্ধ শুরু করেছিল, তাদের বিজয় হিসেবে চিত্রিত করতে পারে এমন কিছু অর্জন করার আগে এটি শেষ করার জন্য খুব কম উত্সাহ থাকে। প্রয়াত ফ্রেড সি. ইকলে তার ‘এভরি ওয়ার মাস্ট এন্ড’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, যুদ্ধ শেষ করার জন্য প্রায়শই নতুন নেতাদের আনার প্রয়োজন হয়। কারণ যারা যুদ্ধে যাওয়াটাই শ্রেয় মনে করেছেন, তারা যুদ্ধ বন্ধের ব্যাপারে প্রায়শই অনিচ্ছুক থাকেন। অথবা তারা যে ভুল করেছিলেন, তা স্বীকার করতে অক্ষমতার পরিচয় দেন। এটি হতাশাজনক সংবাদ। কারণ দায়ী ব্যক্তিদের অপসারণ করা সব সময়ই কঠিন। কখনো কখনো অসম্ভব এবং আরো অনেক প্রাণ হারানোর আগে তা ঘটতে পারে না।

লেখক: ফরেন পলিসির কলামিস্ট এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক

ফরেন পলিসি থেকে অনুবাদ: ফাইজুল ইসলাম

ইত্তেফাক/এইচএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন