বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৪ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

‘সেই ধন্য নরকুলে, লোকে যারে নাহি ভুলে’

আপডেট : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৬:৪০

এই নশ্বর দুনিয়ায় যাহারা আসিয়াছেন, তিনি যতই মহাজ্ঞানী কিংবা মহাপ্রতাপশালী হউন না কেন, প্রত্যেককেই একটা সময় আসিয়া চলিয়া যাইতে হয়। এই ব্যাপারে সুরা আম্বিয়া ৩৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহতায়ালা বলিয়াছেন যে, ‘প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করিতে হইবে। আর আমি ভালো ও মন্দ অবস্থার মধ্যে ফেলিয়া তোমাদের সকলকে পরীক্ষা করিতেছি, শেষ পর্যন্ত তোমাদের আমার দিকেই ফিরিয়া আসিতে হইবে।’ রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথকেও মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করিতে হইল। গত বত্সরের এপ্রিলে তাহার স্বামী প্রিন্স ফিলিপের মৃত্যু হইলে রানি নিঃসঙ্গ হইয়া পড়িয়াছিলেন। অতঃপর গত বৃহস্পতিবার দুপুরে বালমোরাল ক্যাসেলে মহাপ্রয়াণ ঘটে রানির।

যেই ব্রিটিশরাজের সূর্য কখনো ডোবে না বলিয়া এককালে বলা হইত—তাহা টেমস নদীর কূলে অনেক আগেই ডুবিয়া গিয়াছে বটে। তবে সম্ভ্রমে বা সম্মানে কিংবা প্রতীকীভাবে হউক, ব্রিটিশ কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলিতে এখনো অসংখ্য খুঁটিনাটি কাজে ব্রিটিশ সিংহাসনে আসীন মহারানির নাম এবং তাহার স্মারক ব্যবহূত হইয়া আসিতেছে। বিশ্বের ৫৬টি স্বাধীন রাষ্ট্রের ২৪০ কোটি মানুষের সংগঠন কমনওয়েলথের প্রধান ছিলেন তিনি। একই সঙ্গে যুক্তরাজ্যসহ ১৪টি দেশের প্রধান হিসাবেও গৌরবময় ৭০টি বত্সর পার করিয়াছেন। তিনি একই সঙ্গে ছিলেন করুণা, মর্যাদা, প্রজ্ঞা, সেবা, সম্ভ্রম, নিয়মানুবর্তিতা ও শান্তির প্রতীক। তাহার এই ৭০ বত্সরের জামানায় দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে যখন ব্রিটেনের প্রভাব ক্রমশ কমিয়াছে, সমাজে আমূল পরিবর্তন আসিয়াছে, বিভিন্ন জনপদে রাজতন্ত্র প্রশ্নবিদ্ধ হইয়াছে, তখনো অনেকের নিকট রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ ছিলেন একজন ধ্রুবতারা। আকাশের সবচাইতে উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক লুব্ধকের ন্যায় জাজ্বল্যমান ছিলেন তিনি।

১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাহার পিতা রাজা জর্জ অকস্মাৎ মৃত্যুবরণ করিলে জ্যেষ্ঠ সন্তান হিসাবে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ সিংহাসনে বসেন এবং কমনওয়েলথের প্রধান হন। রানিও অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সহিত পরিবর্তিত যুগের সহিত তাল মিলাইতে থাকেন, যাহার ফলে ‘রাজতন্ত্র’ ক্রমশ ‘রাজপরিবার’ হইয়া উঠে। হ্যারল্ড ম্যাকমিলান ১৯৬৩ সালে পদত্যাগ করিবার পর একটা সাংবিধানিক জটিলতা তৈরি হইলে একটা রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে চলিয়া আসিয়াছিলেন রানি এলিজাবেথ। সেই সময় রানি ও রাজতন্ত্রকে সরকারের দৈনন্দিন কার্যকলাপ হইতে বিচ্ছিন্ন করিয়া ফেলিবার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। রানির দায়িত্ব সীমিত থাকে আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পালন, দেশের ঘটনা সম্পর্কে অবহিত থাকা আর সরকারকে পরামর্শ দেওয়ার মধ্যে। আশি ও নব্বইয়ের দশকে রানির জ্যেষ্ঠ পুত্র প্রিন্স চার্লস এবং পুত্রবধূ ডায়ানা লইয়া এক অস্বস্তিকর সময় পার করে রাজপরিবার।

১৯৯৭ সালে ডায়ানা গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা গেলে একটি কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়া যাইতে হয় রানিকে। কিন্তু রানি বুদ্ধিমত্তার সহিত পরবর্তী সময়ে ডায়ানার প্রশংসা করিয়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেন। একবিংশ শতকের শুরুতে রানির জনপ্রিয়তা পুনরায় বৃদ্ধি পাইতে থাকে। চার্চ অব ইংল্যান্ডের প্রধান হিসেবে ভূমিকায় থাকিলেও তিনি সকল ধর্মের অধিকার রক্ষা করিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন। সকল কিছু মিলিয়া বিশ্ববাসীর নিকট রানি ছিলেন বিপুল সম্মানের অধিকারিণী। ব্রিটিশ জনগণের হূদয়ে রাজপরিবারের প্রতি ভালবাসা যাহাতে চিরস্থায়ী হয়, তাহা নিশ্চিত করিতে সারা জীবন অভূতপূর্ব বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়া গিয়াছেন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ। তাহার সিংহাসন আরোহণের রজতজয়ন্তীর সময় বলিয়াছেন, ‘আমার বয়স যখন ২১ বত্সর, আমি অঙ্গীকার করিয়াছিলাম আমার জীবন আমি উত্সর্গ করিব আমার জনগণের সেবায়। আমি এই প্রতিজ্ঞা রক্ষায় ঈশ্বরের সাহায্য কামনা করিয়াছিলাম।...আমি সেই প্রতিশ্রুতি হইতে কখনো এক চুলও সরিয়া আসি নাই।’

এই সুন্দর পৃথিবীর হইতে কেহই বিদায় লইতে চাহে না। কবি যেমন বলিয়াছেন—‘মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে,/ মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।’ এই ক্ষেত্রে আমরা বলিতে পারি, মানুষ মরিয়াও বাঁচিয়া থাকেন নিশ্চয়ই, তাহার কর্মের মধ্যে বাঁচিয়া থাকেন। কবির ভাষায়—‘সেই ধন্য নরকুলে, লোকে যারে নাহি ভুলে।’ একজন সত্যিকারের মানবদরদি বুদ্ধিমতী রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের নাম বিশ্ব ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকিবে নিশ্চয়ই। তাহার মহাপ্রয়াণে আমরা ব্যথিত ও শোকাভিভূত। গুড বাই রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ। রেস্ট ইন পিস।

ইত্তেফাক/এএইচপি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন