শুক্রবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৫ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

সানজিদা থেকে উইনি হ্যারলো

আপডেট : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৬:০০

‘মুখে দাগ নিয়ে এত কুিসত ছবি ফেসবুকে দিয়েছেন কেন’ এই শিরোনামে সম্প্রতি মূলধারার একটি গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ফেসবুকে একজন তরুণ নারী উদ্যোক্তা তার তৈরি পণ্যের প্রচারে নিজের চেহারার ছবি যুক্ত করায় এক ব্যক্তি এমন অভব্য মন্তব্য করেছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।  ঐ ভুক্তভোগীর ভাষ্যে, তাকে দেখে অনেক বাচ্চাই ভয় পায়, অনেকে অযাচিতভাবেই কাছে এসে দেখতে চান; কেউ আবার ‘মনে হয় তোমার মা কোনো পাপ করেছিলেন’ বলে মন্তব্য করেন। সানজিদা লিমা নামের ২৪ বছর বয়েসি তরুণ এই উদ্যোক্তার প্রায় দুই বছর আগে বিয়ে সম্পন্ন হলেও শ্বশুরবাড়ির লোকজন বিয়ে তো মেনে নেনইনি, উলটো টাকাপয়সা খরচ করে হলেও তালাকের ব্যবস্থা করতে তার স্বামীকে পরামর্শ দিয়েছেন।

কাকতালীয়ভাবে, যেদিন সানজিদাকে নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হলো, সেদিনই একটি বিদেশি গণমাধ্যমের একটি প্রতিবেদন আমার চোখে পড়ল। প্রতিবেদনের  শিরোনাম অনেকটা এমন—‘উইনি হ্যারলো, যিনি সব প্রতিবন্ধকতা জয় করেছেন।’ উইনি একজন কৃষ্ণাঙ্গ সুপার মডেল, তার সারা শরীরে সাদা ছোপ ছোপ দাগ রয়েছে। কানাডায় জন্ম নেওয়া এই মডেলও ছোটবেলায় অনেক ব্যঙ্গাত্মক এবং বিরূপ আচরণের স্বীকার হয়েছিলেন এবং এসব কিছু জয় করেই তিনি অবশেষে সুপার মডেল হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন।

প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার সুরক্ষাবিষয়ক জাতিসংঘ সনদে অনুস্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩ নামে একটি আইন আমাদের সংসদে পাশ হয়েছে। এই আইনে দুটি জিনিস খুব তাত্পর্যপূর্ণ। প্রথমত,  প্রতিবন্ধিতার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে এই আইনে যা বলা হয়েছে, সহজ কথায় তা হলো—কোনো ব্যক্তির শারীরিক, মানসিক, বুদ্ধিগত, বিকাশগত বা ইন্দ্রিয়গত ‘ক্ষতিগ্রস্ততা বা প্রতিকূলতা’র ফলে সেই ব্যক্তির প্রতি ‘দৃষ্টিভঙ্গিগত ও পরিবেশগত বাধা’র কারণে সমাজে তার ‘সমতাভিত্তিক পূর্ণ ও কার্যকর অংশগ্রহণ’ করতে না পারা। অর্থাত্, শুধু ‘ক্ষতিগ্রস্ততা বা প্রতিকূলতা’ নয় বরং এর সঙ্গে ‘দৃষ্টিভঙ্গিগত ও পরিবেশগত বাধা’র কারণে সমাজে কারো ‘পূর্ণ ও কার্যকর অংশগ্রহণ’ বাধার সম্মুখীন হলে তবেই সেটাকে প্রতিবন্ধিতা বলা যাবে।

দ্বিতীয়ত, ২০১৩ সালের আইন অনুযায়ী কোনো ব্যক্তিকে প্রতিবন্ধী হিসেবে তখনই অন্তর্ভুক্ত করা যাবে, যখন শারীরিক, মানসিক, বুদ্ধিবৃত্তিক বা অন্যান্য ক্ষতিগ্রস্ততা তার দৈনন্দিন সাধারণ কাজকর্ম বা সাধারণ চলাচল আংশিক বা পুরোপুরিভাবে ব্যাহত করে। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, দৈনন্দিন কাজকর্ম বা সাধারণ চলন ইত্যাদি ব্যাহত হওয়াটা কিন্তু কেবল ঐ ব্যক্তির নিজের ওপর নির্ভর করে না; এটা অনেকাংশেই পারিপার্শ্বিক পরিবেশ এবং আশপাশের মানুষের আচার আচরণের ওপরও ভীষণভাবে নির্ভরশীল। মোট কথা, যদি কোনো ব্যক্তির শারীরিক, মানসিক, বুদ্ধিবৃত্তিক বা অন্যান্য ক্ষতিগ্রস্ততা থেকে থাকে কিন্তু তিনি সামাজিক বা পরিবেশগতভাবে কোনোরকম অসুবিধার সম্মুখীন না হন, তবে সেটা আর প্রতিবন্ধিতার বৃত্তে আটকে থাকছে না। অন্যদিকে, কোনো রকম মারাত্মক শারীরিক, মানসিক, বুদ্ধিবৃত্তিক বা অন্যান্য ক্ষতিগ্রস্ততা না থাকার পরেও যদি কোনো মানুষ সামাজিক বা পরিবেশগতভাবে বাধার সম্মুখীন হন, সেটাও প্রতিবন্ধিতায় রূপ নিতে পারে। এক্ষেত্রে সানজানা এবং উইনি হ্যারলোকে উদাহরণ হিসেবে নেওয়া যেতে পারে। তারা দুজনেই পূর্ণ মানুষ, কারো কোনো মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ততা নেই, কিন্তু তাদের মুখে এবং শরীরে ছোপ কিংবা দাগ থাকার কারণে তাদের আশপাশের মানুষের কাছ থেকে বিরূপ মন্তব্য শুনতে এবং অন্যায্য আচরণ সহ্য করতে হয়েছে, যার কারণে আবশ্যিকভাবেই সমাজে তাদের ‘পূর্ণ এবং কার্যকর অংশগ্রহণ’ বাধাগ্রস্ত হতে পারত। সৌভাগ্যক্রমে উইনি সুপার মডেল হয়ে এখন নিজেই অন্যদের সাহস দিচ্ছেন অন্য দিকে সানজিদা তার পরিবার এবং কাছের মানুষদের ভালোবাসায় নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যাবার প্রেরণা পেয়েছেন বটে, কিন্তু সমাজে তার ‘পূর্ণ এবং কার্যকর অংশগ্রহণ’ কিছুটা হলেও বাধার সম্মুখীন হয়েছে। 

 যারা প্রকৃত অর্থেই শারীরিক, মানসিক, বুদ্ধিবৃত্তিক বা অন্যান্য ক্ষতিগ্রস্ততার কারণে প্রতিবন্ধকতার শিকার, তাদের জন্য সুরক্ষা আইন তো রয়েছেই, কিন্তু সানজিদা বা উইনির মতো যারা আইনের সংজ্ঞার ছাঁচে পড়েন না, কিংবা যারা নিজের প্রতিবন্ধকতাকে জয় করতে পেরেছেন এবং নিজেকে প্রতিবন্ধী ভাবতে চান না, তাদের ক্ষেত্রে কী হবে—ভাবনার জায়গাটা এখানেই। 

কিছুদিন আগে একজন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ব্যক্তির ফেসবুক স্ট্যাটাস ভাইরাল হয়েছিল। তিনি তার স্ট্যাটাসে যা বলেছেন তার সারমর্ম হলো—তার শিশুপুত্র স্কুলে বুলিংয়ের শিকার হয়েছে, কারণ সেই শিশুটির বাংলায় কথা বলতে কিছু শব্দ উচ্চারণে সমস্যা হয়। ঐ ব্যক্তি নিজের ছাত্র থাকার সময়ের কথা উল্লেখ করে বলেছেন যে, তিনি নিজেও একই কারণে বুলিংয়ের শিকার হয়েছিলেন।

মানুষ ভূমিষ্ঠ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে সব বৈশিষ্ট্য সাধারণ নাও হতে পারে এবং জন্মের ঠিক পরপরই বোঝা নাও যেতে পারে। আবার বুলিংয়ের শিকার শিশুটির বা তার বাবার কোনো প্রকার শারীরিক ভিন্নতাই আসলে নেই। সব মানুষই যেমন একই রকম নাক, মুখ, চোখ, চুল, বর্ণ নিয়ে জন্মায় না তেমনি অনেক শিশুই ভিন্ন রকম বৈশিষ্ট্য নিয়ে জন্ম নিতে পারে, বা সেগুলো পরবর্তীকালে প্রকাশ পেতে পারে। সানজিদা ও উইনিরা এটা বেশ ভালোভাবেই প্রমাণ করেছেন যে তাদের শারীরিক ভিন্নতা কোনো ত্রুটি নয়, ভিন্নতা মাত্র। আমরা সবাই আসলে কোনো না কোনো বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।

লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী

ইত্তেফাক/এএইচপি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন