খাদ্যে বাঙালিয়ানা ও আত্মপরিচয়

আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৩:২০

বাঙালি-খাদ্য আমাদের জাতিসত্তার পরিচায়ক। বাঙালির হাজার বছরের পথপরিক্রমায় হাজারো খাদ্যের সৃষ্টি ও বিকাশ হয়েছে। তবে কিছু খাদ্য আছে, যেগুলোর স্বতন্ত্রতা ও অনন্যতা আবহমান। খাবারের যে ঐতিহ্যগত মূল্য, সেটি আমাদের মন ও মননকে প্রভাবিত করে। আমাদের শেকড়ের ঘ্রাণ ও অনুভূতি দেয়। আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় পূর্বজনদের স্মৃতির কাছে। আমরা বাঙালিত্বের বোধ ও শক্তিতে জাগ্রত হই। যেমন : পহেলা বৈশাখ এলেই আমরা ইলিশ ও রকমারি ভর্তাসহকারে পান্তা খেয়ে নিজেদের বাঙালিয়ানাকে প্রকাশ করি। জাতীয়তাবোধের সেই প্রকাশে থাকে উচ্ছ্বাস ও গৌরব। আবার ‘একদিন বাঙালি ছিলাম রে...’ গানের সঙ্গে নিজেদের ভাসিয়ে দিই সীমাহীন উন্মাদনায়। আমরা বাঙালি ছিলাম সত্য। এখনো আছি, তবে বিশুদ্ধতার মাপকাঠিতে সেটা কত ভাগ তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। কথা হতে পারে বাঙালিত্বের সংরক্ষণবিষয়ক আবশ্যকতা নিয়ে।

ইতিহাস বলে, বহুজাতিক ও তাদের বহুকালিক শাসন বাংলার মানুষের জীবন ও সৃজনে স্থায়ী প্রভাব রেখে গেছে। বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে মৌলিকত্বকে রূপান্তরিত করেছে। বাঙালির রসনা-বিলাসে মোগল, তার্কিশ, আফগান ও ইংরেজ খাবার ধীরে ধীরে প্রবেশ করেছে। তবে বিগত ১০০ বছরে এসবের অবস্থান বেশ শক্ত ও স্থায়ী হয়েছে। এই যে বাঙালির খাদ্যের ক্ষেত্রে মৌলিকত্বের পরিবর্তন হওয়া শুরু হলো, আজ এসে তা ভয়াবহ পর্যায়ে ঠেকেছে। আজ চাইনিজ, জাপানিজ, ইতালিয়ান, অ্যারাবিয়ান খাবারের আধিপত্য ও আগ্রাসনে নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলা খাবার আবেদন হারাচ্ছে। ভিনদেশি শব্দ Breakfast, Lunch, Dinner-এর মতো আমাদের খাদ্য ও খাদ্যাভ্যাসও হয়ে যাচ্ছে ভিনদেশি। ভিনদেশি খাবারের প্রতি কোনো বিরাগ নেই। তবে এটাই সত্য যে, খাদ্যের মধ্য দিয়েও সৃজিত হয় দেশপ্রেম। সেই সৃজনের জায়গাটায় শঙ্কা জাগে, হয় স্বপ্নভঙ্গ। দুধ-গুড়-ভাতের মধ্যে কবজি ডুবিয়ে খাওয়ার যে স্মৃতি ও শান্তি সেটি নিতান্তই প্রাকৃতিক। শীতকালে জ্বাল দেওয়া এক বাটি গরম খেজুরের রস যেন অমৃত আস্বাদন! নানারকম ভর্তা, মাছের নানা পদ, বাটা মসলায় মাংস, পিঠাপুলি বাঙালির খাদ্যাভ্যাসে সরলতা ও বিশুদ্ধতাকে প্রতীকায়িত করে। এসব খাবার আমাদের একটি সুস্থ জীবনের নিশ্চয়তা দেয়। গ্রামাঞ্চলে কিংবা শহুরে জীবনেও যখন আমরা এসব খাবার খাই তখন যে তৃপ্তি অনুভব করি; ভিনদেশি বার্গার, স্যান্ডউইচ অথবা চপস্টিক দিয়ে সুশি কিংবা স্প্যাগেটিতে কি সেরূপ অনুভূতি মেলে? তবু আমরা খাচ্ছি একধরনের ফ্যাশন-সেন্স থেকে। আমরা তাল মেলাচ্ছি তথাকথিত আধুনিকতার সঙ্গে। হজম হচ্ছে না, তবু খাচ্ছি। ব্রিটিশ উপনিবেশের মতো ইংরেজ সাহেবদের খাবারগুলো আজ মেগাসিটি থেকে শহর হয়ে পাড়া-মহল্লা পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছে। এখন উঠতি বয়সিদের বিকালের নাশতার সূচিতে জায়গা করে নিয়েছে বার্গার, স্যান্ডউইচ, ফ্রাইড চিকেন, হালিম ইত্যাদি। ভাঁপাপিঠার জায়গা দখল করে নিচ্ছে নেপালি মোমো। এসব জাংকফুড যেমন ব্যয়বহুল তেমন স্বাস্থ্যের জন্যও ক্ষতিকর। শহুরে প্রজন্মদের তো আমরা পুরোপুরি রেস্টুরেন্ট ও বিদেশি খাবার-নির্ভর করে গড়ে তুলছি। আজকের দিনে বাড়ির খাবার, মা বা দাদি-নানির হাতের খাবারের প্রতিও তাদের টান কম, অনুভূতি কম। বাড়ির খাবার বা বাঙালি খাবার দেখলে তারা আপ্লুত হয় না বরং ভুরু কোঁচকায়, নাক সিটকায়। অধিকাংশ দেশি নাটক-সিনেমাতেও গত দুই দশক ধরে সকালের খাবারের টেবিলে দেখা যায় ব্রেড-টোস্ট; সঙ্গে জ্যাম ও জেলি।

বিনোদন মাধ্যমেও বাঙালি খাবারের উপস্থাপনা কম। বিষয়গুলো হয়তো আমরা গুরুত্বসহকারে দেখি না বা গভীরভাবে ভাবি না। কিন্তু এগুলোর মনস্তাত্ত্বিক ক্রিয়া-বিক্রিয়া ও দীর্ঘমেয়াদি পারিবারিক এবং সামাজিক প্রভাব আছে। অথচ আমেরিকান, ব্রিটিশ, চাইনিজ বা জাপানিজদের দিকে তাকালে দেখা যায়, তারা কখনো তাদের চিরকালীন খাদ্যতালিকা ও খাদ্যাভ্যাসে অন্য দেশের খাবারকে স্থায়ী বা নিয়মিত স্থান দেয়নি। তারা তাদের খাবারের মধ্য দিয়ে কালচার, হেরিটেজ ও আইডেনটিটিকে ধারণ ও বহন করে। প্রসঙ্গক্রমে খাদ্য সার্বভৌমত্বের বিষয়টি সামনে চলে আসে। খাদ্য সার্বভৌমত্ব বলতে জনগণের জন্য পরিবেশগতভাবে ভালো এবং টেকসই পদ্ধতির মাধ্যমে উত্পাদিত স্বাস্থ্যকর এবং সাংস্কৃতিকভাবে উপযুক্ত খাদ্যের অধিকারকে বোঝায়। সে বিবেচনায়, বাংলাদেশের মানুষের ক্ষেত্রে নিজস্ব খাদ্য-সংস্কৃতিই মঙ্গলজনক।

নব্বইয়ের দশকের ঘটনা, আইসিডিডিআর,বির একজন আমেরিকান সায়েন্টিস্ট বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টিবিষয়ক গবেষণার জন্য গ্রামগঞ্জ ঘুরে মানুষের জীবনাচরণ ও খাদ্যাভ্যাস পর্যবেক্ষণ করছিলেন। একদিন সকালে দেখলেন, কয়েক জন কৃষক চাষাবাদের এক পর্যায়ে কাজে বিরতি দিয়ে সকালের খাবার খেতে বসছে। তারা এক একজন যখন গামছা দিয়ে আবৃত বড় বড় খাবারের গামলা বের করছে তখন তিনি বিস্ময়ের সঙ্গে প্রশ্ন করলেন, এটা কী খাবার? তাকে বোঝানো হলো এটা ‘পান্তা’ সঙ্গে আছে কাঁচা মরিচ, শুকনো ঝাল আর ডিমভাজা। তিনি পান্তার প্রস্তুতপ্রণালি সম্পর্কে জানতে চাইলেন। তাকে বলা হলো, এটা ভাত, যা কিনা সারা রাত পানিতে ভেজানো হয়। তিনি তার টেস্টিং টিউবে নমুনা হিসেবে পান্তা সংগ্রহ করলেন এবং প্রাথমিকভাবে মন্তব্য করলেন যে, ‘এটি খেলে যে কোনো সুস্থ মানুষের ডায়রিয়াজনিত মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী’। অথচ সুদীর্ঘকাল থেকে এই পান্তা খেয়েই আমাদের দেশের মানুষ প্রবল শক্তি ও সক্ষমতা নিয়ে সারা দিন চাষাবাদ ও কায়িক পরিশ্রম করে আসছে। বস্তুত এটা পরিবেশ ও সংস্কৃতিগত অভিযোজনের বিষয়। আরেক দিন তিনি এক গ্রামীণ পরিবারে গিয়ে মসুরের ডাল খেয়ে বললেন, Oh! It is delicious lentil soup। বাঙালির নিত্যদিনের খাদ্য ‘ডাল’ ভিনদেশির কাছে পেল সুস্বাদু সুপের মর্যাদা।

মোদ্দা কথা, নীরব ক্ষয়িষ্ণু পরিস্থিতিতে বাঙালিত্বের সংরক্ষণ এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি, বাঙালি-খাদ্যেরও। কেননা, এটি বাঙালির অস্তিত্বের অনুষঙ্গ। এই খাদ্যের মধ্য দিয়ে আমাদের স্বতন্ত্রতা ও বিশুদ্ধতাকে জানান দিতে হবে। অবিচ্ছেদ্যভাবে সংযুক্ত হতে হবে নাড়ির সঙ্গে। শেকড় ধরেই উঠতে হবে শিখরে।

লেখক : কর্মকর্তা, বাংলা একাডেমি

ইত্তেফাক/ইআ