বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৪ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

সম্মান করিতে গিয়া অসম্মান কেন করা হইতেছে?

আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৩:৪০

সূর্যের আলো ব্যতীত এই পৃথিবী আঁধারে নিমজ্জিত হইবে। সূর্য এই কারণে মহিমান্বিত, অপরূপ। সূর্যোদয় কিংবা সূর্যাস্তের সময় সূর্যের সৌন্দর্যের দিকে তাকাইয়া থাকিলে আমাদের মনের মধ্যে এক অপূর্ব অনুভূতি তৈরি হয়। আমরা ধারণ করতে পারি মহাবৈশ্বিক বিশালত্বের অপরূপ সৌন্দর্য; কিন্তু সূর্য সকাল পার করিয়া যখন ক্রমশ তপ্ত আলো ঝরাইতে থাকে, তখন কি সূর্যের দিকে তাকানো যায়? চোখের আরাম বলিয়া একটি ব্যাপার তো আছে। মধ্যাহ্নবেলায় মহান সূর্যের আলো আমাদের চোখকে পীড়া দেয়। তবে মধ্যাহ্নের সূর্যের দিকে না তাকাইলে সূর্যের মহিমা নিশ্চয়ই কমিয়া যায় না, বরং নিজেদের বিচক্ষণতা প্রকাশ পায়। সুতরাং জগতের সকল সৌন্দর্যের মধ্যে একটি পরিমিত বোধের ব্যাপার আছে। বিচক্ষণতা ব্যতীত মানুষ তাহার বুদ্ধিমত্তা ও নান্দনিকতাকে কখনো ধারণ করিতে পারে না। সুতরাং সৌন্দর্যবোধ ও বিচক্ষণতা যে কোনো জাতির উন্নতির সহিত পরিপূরক; কিন্তু আমরা কি সেই বিচক্ষণতা, সৌন্দর্য ও পরিমিত বোধের পরিচয় দিতে পারিতেছি? অথচ অতীতের তুলনায় আমাদের নাকি শিক্ষার হার বাড়িয়াছে! নতুন প্রজন্মের অনেকেই দেশের বাহিরে গিয়া দেখিয়া আসেন—উন্নত দেশগুলির রুচি ও সৌন্দর্যের ছাপ প্রতিটি পরতে পরতে ছড়াইয়া রহিয়াছে। তাহা হইলে আমরা কেন এই ক্ষেত্রে দৈন্যের পরিচয় দিতেছি? বিশেষ করিয়া ব্যানার-ফেস্টুন-পোস্টারে! বিজ্ঞাপন তথা ব্যানার-পোস্টার-ফেস্টুন যে কোনো অনুষ্ঠানের অপরিহার্য অনুষঙ্গ, উপাচার। তাহার ব্যবহার আমাদেরও করিতে হয় বটে; কিন্তু আমাদের অবস্থা হইল শঙ্খ ঘোষের কবিতার মতো—‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’।

আমরা সকল কিছুতেই বাড়াবাড়ি করিতে পছন্দ করি। আমরা প্রতিযোগিতা করি, কে কাহার চাইতে অধিক তোষামোদ করিতে পারি, ভক্তি দেখাইতে পারি। এই জন্য দেশের প্রতিটি অংশে এক দৃষ্টিকটু ‘ব্যানার কালচার’ চালু হইয়াছে। কোনো একটা উৎসব বা রাজনৈতিক কর্মসূচি পাইলেই চারিদিকে ব্যানার, পোস্টার ও ফেস্টুনে ভরিয়া যায়। ফুটপাত, আইল্যান্ডসহ বিভিন্ন ভবনের দেওয়াল কিংবা যে কোনো সহজদৃষ্ট জায়গায়, এমনকি গাছে গাছে বড় বড় পেরেক পুঁতিয়াও সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, ব্যানার-ফেস্টুন লাগাইয়া দেওয়া হয়। বহু বৎসর পূর্বে গাছের প্রাণের অস্তিত্বের কথা প্রমাণ করা বাঙালি বিজ্ঞানীর কথা আমরা বাঙালিরাই পাত্তা দিই না। সুতরাং পেরেক পুঁতিয়া ব্যানার টানাইলে গাছেরও কষ্ট হয়, আলো-বাতাস না পাইয়া মুমূর্ষু হয়—তাহা আমরা আমলেই লই না। ইহার সহিত আমরা সৌন্দর্যের ব্যাপারেও অন্ধতুল্য। উন্নত বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে সৌন্দর্যবিষয়ক পড়ালেখা থাকিলেও আমরা উহার ন্যূনতম বিষয়টুকুও জানি না, বুঝি না। এই জন্য আর মর্ম বুঝি না আর্টেরও। ভ্যানগগ, পিকাসো, ভিঞ্চি তো বিশাল ব্যাপার হাল আমলের অনেক চিত্রশিল্পীর শিল্পকর্মও যে লক্ষ/কোটি ডলারে বিক্রয় হইতে পারে, তাহাতে আমরা বিস্মিত হই। অসৌন্দর্য জিনিস দেখিতে দেখিতে আমাদের এখন আর দৃষ্টিপীড়াও হয় না। ইহাতে সৌন্দর্যের বন্ধ্যা অবস্থা তৈরি হইবে।

মনে রাখিতে হইবে, কোনো কোনো ব্যানার-ফেস্টুনে এমন কিছু দেশবরেণ্য ও অত্যন্ত সম্মাননীয় ব্যক্তি-মহোদয়ের ছবি থাকে, যাহাদের ছবি অত্যন্ত সম্মানের সহিত টানানোর পর অনুষ্ঠান শেষে সম্মানের সহিত নামাইতে হয়; কিন্তু আমরা তাহা না করিয়া এই সকল অত্যন্ত সম্মানী ব্যক্তির ছবিসংবলিত ব্যানার-ফেস্টুন দিনের পর দিন অযত্নে অবহেলায় রোদ-বৃষ্টিতে বিবর্ণ, ম্রিয়মাণ ও নষ্ট হইবার জন্য ফেলিয়া রাখি। ইহা অত্যন্ত গর্হিত কাজ। সুতরাং কর্তৃপক্ষের একটি সিদ্ধান্ত থাকা উচিত, যাহারা নির্দিষ্ট অনুষ্ঠানের জন্য ব্যানার-ফেস্টুন-পোস্টার টানাইবেন, তাহারা অবশ্যই অনুষ্ঠান শেষে সম্মানিত ব্যক্তির ছবিসংবলিত ব্যানার-ফেস্টুন পুনরায় সম্মানের সহিত সরাইয়া ফেলিবেন। তাহা না করিয়া টোকাইরা স্ব-ইচ্ছায় পোস্টার-ফেস্টুন-ব্যানার টানিয়া টানিয়া ছিঁড়িয়া তাহার পর সেইগুলি কেজি দরে বিক্রয় করিবে—আর দেওয়ালে লাগিয়া থাকিবে অত্যন্ত সম্মানী ব্যক্তির অর্ধছিঁড়া মুখমণ্ডল—ইহা অত্যন্ত আপত্তিকর। এইভাবে সম্মানীদের শ্রদ্ধা-সম্মান করিতে গিয়া অপরিমিত বোধসম্পন্ন কতিপয় ব্যক্তির কারণে সম্মানীদের উলটা অসম্মান ও অশ্রদ্ধা করিবার ঘটনা দিনের পর দিন চালিতে দেওয়া যাইতে পারে না। ইহার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কঠোর নির্দেশনা থাকা প্রয়োজন।

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন