বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৪ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

আধুনিক রক্ষণাবেক্ষণ কৌশলও রপ্ত করিতে হইবে

আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৩:৩৩

কথায় বলে, সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের দশ ফোঁড়। রাস্তাঘাট, কালভার্ট, ব্রিজসহ যে কোনো স্থাপনা ও অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে এই কথা খুবই প্রযোজ্য। কোনো স্থাপনা যথাসময়ে রক্ষণাবেক্ষণ না করা হইলে পরবর্তী সময়ে তাহা বিষফোড়া হইয়া উঠে এবং ইহার সংস্কার বাবদ খরচ বৃদ্ধি পায়। সেই স্থাপনার মান ও স্থায়িত্ব বেশিদিন ধরিয়া রাখা যায় না। ইহা তখন নানা অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ও বিপদের কারণ হইয়া পড়ে। দেশে সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণ করা হইতেছে। অথচ অনেক ক্ষেত্রে রাস্তার পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নাই। ফলে বর্ষাকালে রাস্তায় পানি জমিয়া সেই রাস্তার আয়ুষ্কাল দ্রুত নষ্ট হইয়া যাইতেছে। 

দেখা যায়, অনেক রাস্তায় ফুটপাত ও ড্রেনেজব্যবস্থা আছে ঠিকই; কিন্তু ম্যানহোলের ঢাকনা নাই। ম্যানহোলের ঢাকনা না থাকায় সেই রাস্তা দিয়া চলিবার সময় ম্যানহোলে পড়িয়া পথিকের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটিতেছে এই দেশে। আবার ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হইয়াছে বটে; কিন্তু এখন সেইখানে বাতি নাই। ফলে রাত্রিবেলা চলাচল করা বিপজ্জনক হইয়া পড়ে। এই সকল স্থাপনায় সাইন-সিম্বল নষ্ট থাকিবার কারণেও প্রায়শ দুর্ঘটনা ঘটিতেছে। রাজধানীতে বিভিন্ন সেবামূলক সংস্থা রাস্তা কাটিয়া উন্নয়নমূলক কাজ করিতেছে; কিন্তু তাহা দ্রুত মেরামত করিয়া পূর্বাবস্থায় ফিরাইয়া না দেওয়ায় জনদুর্ভোগ বাড়িয়া চলিয়াছে। এইভাবে যে কোনো অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণে আমাদের এই উদাসীনতা মোটেও কাম্য নহে।

শুধু রাস্তাঘাট কেন গাছগাছালি লাগাইলেও তাহার নিয়মিত যত্ন ও রক্ষণাবেক্ষণের উপর নজর দিতে হইবে। নতুবা কাঙ্ক্ষিত ফল আশা করা বৃথা। সামাজিক বনায়নের ক্ষেত্রে এই খামখেয়ালিপনা আমরা প্রায়শই প্রত্যক্ষ করিয়া থাকি। বিলম্ব বর্ষায় এখন অনেকেই বিভিন্ন প্রকার বৃক্ষ রোপণ করিতেছেন। যাহারা গাছ লাগাইতেছেন, তাহাদের উহা রক্ষণাবেক্ষণে আরো যত্নশীল হইতে হইবে। এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করিয়া না বলিলেই নহে, তাহা হইল—সরকার বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণেই শুধু অর্থ বরাদ্দ দেয় না, ইহার নিয়মিত মেইনটেন্যান্স বা রক্ষণাবেক্ষণের খাতেও অর্থ প্রদান করিয়া থাকে; কিন্তু এই অর্থ ব্যয় করিবার ক্ষেত্রে অনেক সময় নয়ছয়ের আশ্রয় নেওয়া হয়। এই খাতের বরাদ্দ চলিয়া যায় অন্য খাতেও। ইহা চলিতে পারে না। আমরা বরাবরই বলিয়া আসিতেছি যে, অবকাঠামোগত উন্নয়নের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হইল রক্ষণাবেক্ষণ। অনেক সময় নূতন রাস্তাঘাট তৈরি না করিয়া পুরাতন রাস্তাঘাটের সংস্কারের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। এই ব্যাপারে আমাদের গড়িয়া তুলিতে হইবে সঠিক মেইনটেন্যান্স ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম বা রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি। সড়ক সারফেসে পটহোল মেরামত, ফাটল ভরাট, ঘাস-আগাছা অপসারণ, গাড়ি চালকের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী শাখা বা বৃক্ষ অপসারণ, কালভার্ট-সেতু-পার্ক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, সাইন-সিগন্যাল মেরামত, শোল্ডার হইতে বৃষ্টির পানি অপসারণ ইত্যাদি কার্যক্রম নিয়মিতভাবেই পরিচালনা করিতে হইবে।

আমরা মনে করি, রক্ষণাবেক্ষণের স্বার্থে অনেক সময় জমিদারবাড়ির দিকে না তাকাইয়া আমাদের ছোট্ট বাড়ি নির্মাণ করাই শ্রেয়। আরো একটি বিষয় লক্ষণীয়, যে কোনো অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রথমেই ইহার গুণমান নিশ্চিত করিতে হইবে। কোনো অবকাঠামো উদ্বোধনের পরই ভাঙিয়া পড়িলে আমরা যতই রক্ষণাবেক্ষণের কথা বলি না কেন, তাহাতে কোনো লাভ হইবে না। তাহাতে ব্যয় শুধু বাড়িতেই থাকিবে। এই জন্য সাম্প্রতিক কালে দুদক এই সকল দুর্দশাগ্রস্ত অবকাঠমোর ১১টি কারণ চিহ্নিত করিয়া ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি তুলিয়া ধরিয়া গুরুত্বপূর্ণ ১২টি মন্ত্রণালয়ের সচিব ও ১৪টি সংস্থাপ্রধানকে চিঠি প্রদান করিয়াছে। প্রকৃতপক্ষে নির্মাণকাজের প্রাক্কলনে প্রকল্পের লাইফ স্প্যান বা স্থায়িত্বকাল সুস্পষ্ট থাকিতে হইবে। কাজের ধরন অনুযায়ী চেকলিস্ট প্রস্তুতকরণ, কোড অব প্র্যাকটিস, বিএনবিসি, এসিআই কোডসহ কাজসংশ্লিষ্ট অন্যান্য স্ট্যান্ডার্ড প্রতিপালন করিতে হইবে। আমাদের উন্নয়ন কার্যক্রমের ব্যাপকতা বাড়িয়াছে; কিন্তু জনবল ঘাটতিসহ নানা কারণে সেই অনুযায়ী তদারকিতে সক্ষমতা বাড়ে নাই। ইহার সহিত আমাদের আধুনিক নির্মাণকৌশলের পাশাপাশি আধুনিক রক্ষণাবেক্ষণ কৌশলও রপ্ত করিতে হইবে।


 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন