বিগত কয়েক দিনের সংবাদপত্র আর টেলিভিশনসহ সব ধরনের ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার প্রকাশিত খবরের মধ্যে সর্বাধিক পঠিত এবং ভাইরাল হয়েছে সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়জনিত খবরগুলো। আজকের লেখাটি তাই সংবাদপত্রে প্রকাশিত একটি খবর দিয়েই শুরু করতে চাই। গত ২৮ আগস্ট ২০২২, একটি পত্রিকা স্কুলছাত্রদের আচরণের উদ্বেগসংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন ছাপায়, যেখানে রাজশাহীর একটি স্কুলে কর্তৃপক্ষ বিচ্যুত আচরণের কারণে ছয় ছাত্রকে বহিষ্কার করতে বাধ্য হয়। ঘটনার আকস্মিকতায় শিক্ষকদের বক্তব্য ছিল স্কুলে ছাত্রদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও নেতিবাচক আচরণের পরিপ্রেক্ষিতে এমন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। এমন ঘটনা এখন আর বিরল নয়। বরং তা দিনদিন বেড়েই চলেছে। এর সঙ্গে রাজধানীতে কিশোর গ্যাং আর তাদের দৌরাত্ম্যের কথা তো এখন সবাই অবগত। সমস্যা শুধু এখন আর বিচ্যুত আচরণে সীমাবদ্ধ নয়, সমস্যা এখন ডালপালা মেলে সামাজিক অপরাধ বৃদ্ধি করে অজগরের মতো পুরো সমাজকে গিলে খাচ্ছে।
একটি গবেষণায় উঠে এসেছে করোনা পরিস্থিতিতে সন্তানের সঙ্গে পিতামাতার মানসিক দূরত্ব, ঘরের দরজা বন্ধ করে থাকার প্রবণতা, অনলাইন ক্লাসের নামে মোবাইল ফোনসহ সব ধরনের ইলেকট্রনিক গেজেটের যথেচ্ছ ব্যবহার কিশোর-কিশোরীদের সামাজিক জীবনকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এর ফলে বর্তমানে তথাকথিত সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়জনিত অপরাধের মাত্রা ও পরিধিগত বিস্তৃততা যেমন বেড়েছে তেমনি তা সমাজকে অস্থিরতার নতুন দিকে মোড় নিতে বাধ্য করেছে। করোনা পরিস্থিতির পর মনস্তাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞরা বহুবার করোনা-পরবর্তী এসব সমস্যার আশঙ্কার কথা প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে যে দেশের মানুষ মৌলিক মানবিক চাহিদা পূরণ করতেই হিমশিম খায়, সে দেশে আলাদা করে মানসিক স্বাস্থ্যসচেতনতা নিয়ে সাধারণ মানুষ ব্যতিব্যস্ত হবে, এমনটা আশা করার মতো ভরসার জায়গা এখনো তৈরি হয়নি। তাই আজকে শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধিতার পাশাপাশি তৈরি হয়েছে আর একটি নতুন ব্যাধি, যার নাম সামাজিক প্রতিবন্ধিতা।
ম্যাকাইভার ও পেজ সমাজকে সামাজিক সম্পর্কের জটিল জাল বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। আজকে সামাজিক সম্পর্কের জটিলতা সমাজের প্রচলিত সংস্কৃতি, রীতিনীতি, বিশ্বাস বা মূল্যবোধকে যেভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করছে তা শুধু উদ্বেগজনকই নয়, আশঙ্কাযুক্ত এক বিভীষিকাময় সময়ের হাতছানি দিচ্ছে। এর প্রথম সংকেত হচ্ছে ডিভোর্সের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়া। সমাজ এখন একক পরিবার থেকে এক জনের পরিবারে রূপান্তরিত হচ্ছে। সম্পর্কের বিকৃত পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে কতিপয় ওয়েব সিরিজের নামে প্রচলিত ইন্টারনেট প্ল্যাটফরমে, যেখানে পরকীয়ার পাশাপাশি দেখানো হচ্ছে সম্পর্কের জটিল ও কুিসত সমীকরণ। ধূমপান ও মদ্যপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর—লেখাটির আকার যতটা ছোট হয়েছে, ততটাই বেড়েছে এসব দেখানোর সংস্কৃতি। এতটাই ছোট হয়েছে লেখার পরিধি যে, টিভি স্ক্রিনে লেখাটি কষ্ট করে খুঁজে নিতে হয়। আদালতকে আজ মেয়েদের পোশাক নিয়েও রায় দিতে হচ্ছে।
সামাজিক প্রতিবন্ধিতাকে এখন আর রোগ বললে অত্যুক্তি করা হবে না। শরীর বা মনের মতো সমাজের এমন জটিল রোগের চিকিত্সা হওয়া প্রয়োজন। সমাজের ব্যাধি সারানোর অনেক চিকিত্সক আছেন, কিন্তু মূল ওষুধ এখনো পরিবারের হাতে। আজও পরিবার একমাত্র আদি ও মৌলিক প্রতিষ্ঠান। পরিবারের পারিবারিক বন্ধন এবং ইতিবাচক মূল্যবোধচর্চা ছাড়া আর কোনো চিকিত্সাই স্থায়ী হবে না। পরিবারের সদস্যদের আমিত্ব মনোভাব বিচ্ছিন্ন করতে হবে। আমি কী পেলাম, কেন এ সম্পর্কে থাকব, আমার জীবন একটাই তাই নিজের মতো বাঁচতে চাই ইত্যাদি ধারণাগুলো ক্ষেত্রবিশেষে ঠিক থাকলেও সব ক্ষেত্রে এমন মনোভাব বিসর্জন দিয়ে ত্যাগের দৃষ্টান্ত উপস্থাপনও প্রয়োজন। পরিবারে বয়োজ্যেষ্ঠ, থাকতে আসা আত্মীয় বা অপেক্ষাকৃত অসচ্ছল আত্মীয়কে আপন করে স্বীকার করে নেওয়ার মনুষ্যত্ব থাকতে হবে। ভুলে গেলে চলবে না যে, আমরা তাই ফেরত পাব যা আমরা বিনিয়োগ করব। তাই দেশকে বা সমাজকে আলাদা করে না দেখে নিজের ভাবনাকে আলাদা করি। তাহলে আমাদের সমাজ বাঁচবে, নতুবা আজকের পত্রিকার পড়া খবরের আগামী দিনের শিরোনাম হবেন আপনি নতুবা আমি। সেদিনের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি তো?
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, সমাজকর্ম, বিসিএস সাধারণ শিক্ষা।
