বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৪ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

সমৃদ্ধ দেশ গঠনে তারুণ্য শক্তির সদ্ব্যবহার

আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৩:০২

অর্থনীতি বিশ্লেষক ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক প্যাট্রিক বুকানোন একটি চমত্কার মন্তব্য করিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন যে, ভবিষ্যতে যেই সকল দেশ বিশ্বকে শাসন করিবে, তাহারা তিনটি বিষয়ে সমৃদ্ধ হইবে। যথা: খনিজ সম্পদ, সুপেয় পানি ও জনসংখ্যা। আশার কথা হইল-বাংলাদেশ তৃতীয় শক্তিতে বলীয়ান। জনসংখ্যাকে যাহারা এতদিন বোঝা মনে করিতেন, তাহারাই এখন ইহাকে জনশক্তি হিসাবে বিবেচনা করিতেছেন। তাহার উপর যদি ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড সুবিধা থাকে, তাহা হইলে যে কোনো দেশের জন্য উহা আশীর্বাদস্বরূপ। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড হইল কোনো একটি দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের অধিক যখন শ্রমশক্তিতে পরিণত হয়। অর্থাত্ পরনির্ভরশীল জনসংখ্যার চাইতে কর্মক্ষম জনসংখ্যার হার অধিক হয়। বর্তমানে বাংলাদেশ এই ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থার মধ্য দিয়া যাইতেছে। এখানে ১৫ হইতে ৫৯ বত্সর বয়সি মানুষ তথা কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর হার ৬৮ শতাংশ। আরো আশাব্যঞ্জক খবর হইল, এখানকার জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশই এখন তরুণ। এই বত্সরের আদমশুমারি অনুযায়ী তাহাদের সংখ্যা ৪ কোটি ৫৯ লক্ষ। এই তরুণরা হইল আমাদের দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির চালিকাশক্তি। শিক্ষাদীক্ষা, প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে আমরা এই তারুণ্য শক্তির কতটা সদ্ব্যবহার করিতে পারিতেছি তাহারই উপর নির্ভর করিতেছে ভবিষ্যত্ উন্নয়ন, সুখ ও সমৃদ্ধি।

গত রবিবার যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় আয়োজিত দ্বিতীয় বারের মতো ‘শেখ হাসিনা ইয়ুথ ভলান্টিয়ার অ্যাওয়ার্ড-২০২২’ প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলিয়াছেন যে, ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশে রূপান্তরের জন্য জাতির সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ স্টেকহোল্ডার হইল তরুণ প্রজন্ম। তাহারা উচ্চ ও আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষায় প্রস্তুত হউক, ইহাই তিনি কামনা করিয়াছেন একান্তভাবে। বাংলাদেশ যে সম্ভাবনাময় একটি দেশ তাহা অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে ইতিমধ্যে কিছুটা তাহার স্বাক্ষর রাখিয়াছে। আইএমএফের হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশ এখন বিশ্বের ৪১তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। তরুণদের অসীম শক্তিকে কাজে লাগাইতে পারিলে এই সম্ভাবনাকে আরো আগাইয়া নেওয়া মোটেও কঠিন কাজ নহে। এই জন্য শিক্ষাব্যবস্থার বিদ্যমান ত্রুটিবিচ্যুতি ও দৈন্য দূর করিতে হইবে। তাহাদের জন্য সরকারি-বেসরকারি খাতে নিশ্চিত করিতে হইবে ব্যাপক কর্মসংস্থান।

আমরা জানি, চীনে ১৯৮০ সালের দিকে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড ঘটে এবং তাহারা এই সুযোগকে কাজে লাগাইয়া উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছাইয়াছে। পরিণত হইয়াছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্ অর্থনীতির দেশে; কিন্তু আমরা কি এই ব্যাপারে সচেতন? সচেতন হইলে তরুণরা এত সমস্যায় নিমজ্জিত থাকে কীভাবে? মনে রাখিতে হইবে, আমাদের হাতে এখন সময় খুবই কম। ২০৪০-৫০ সালের দিকে এই গোল্ডেন টাইম শেষ হইয়া যাইবে। তখন কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমিয়া গিয়া পরনির্ভরশীল জনসংখ্যা বাড়িয়া যাইবে এবং জনসম্পদ পরিণত হইবে জনদুর্ভোগে। যেহেতু আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদের পরিমাণ কম, তাই এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলাকে অগ্রাধিকার দিতে হইবে। সার্বিকভাবে জনসংখ্যাকে রূপান্তরিত করিতে হইবে জনসম্পদে। এই জন্য আমাদের তরুণ জনশক্তি লইয়া আরো গবেষণা প্রয়োজন। আমাদের বড় সমস্যা হইল এইখানে শিক্ষিত বেকারের হার সবচাইতে অধিক। প্রতি ১০০ জন স্নাতক ডিগ্রিধারীর মধ্যে ৪৭ জনই বেকার। সকলেই এখন চাকুরি চাহেন; কিন্তু আমরা চাকুরি দিতে পারিতেছি না। তারুণ্যের হাতকে কর্মমুখর ও শক্তিশালী করিতে হইলে এই পরিস্থিতির উত্তরণে সর্বশক্তি নিয়োগ করিতে হইবে। এই জন্য সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থায় কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে প্রাধান্য দেওয়া প্রয়োজন। প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধিসহ তরুণ উদ্যোক্তাদের প্রতি হইতে হইবে যত্নশীল। তরুণরা যেন পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যথাযোগ্য মর্যাদা, কাজ ও মেধার যথার্থ সম্মান পান, সেইদিকে নজর দিতে হইবে। তাহাদের জন্য বাড়াইতে হইবে বাজেট বরাদ্দ। তাহাদের স্বাস্থ্যরক্ষায়ও নিতে হইবে কার্যকর পদক্ষেপ।

ইত্তেফাক/এইচএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন