রোববার, ০২ অক্টোবর ২০২২, ১৭ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

ডাক্তার শাকিরের নির্দেশে ঘর ছাড়ে কুমিল্লার সাত শিক্ষার্থী

আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৬:০৩

কুমিল্লার নিখোঁজ সাত শিক্ষার্থী ঘর ছেড়েছিল রাজধানীর রামপুরা থেকে গত মঙ্গলবার গ্রেফতার হওয়া চিকিত্সক শাকির বিন ওয়ালীর নির্দেশে। জানা গেছে, ডা. শাকির দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলামের জন্য সদস্য সংগ্রহ, তাদের সামরিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ও কথিত জিহাদে যেতে তাদের সহায়তা করতেন। কুমিল্লা থেকে ঘর ছাড়া সেই সাত শিক্ষার্থীর সঙ্গে একাধিক বৈঠক করে ‘জিহাদে’ যেতে তাদের উদ্বুদ্ধ করেন এই ডা. শাকিরই। শাকিরের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে সদস্য সংগ্রহে কাজ করতেন আরো এক চিকিত্সক। তাকে নজরদারিতে রেখেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। 

রাজধানীর রামপুরা থানায় পুলিশের দায়ের করা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় ডা. শাকির বিন ওয়ালী ও তার সহযোগী আবরারুল হক ভিলার পাঁচ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত। গতকাল বুধবার ঢাকা মহানগর হাকিম আহমেদ হুমায়ুন কবিরের আদালত এ রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

গত বুধবার রামপুরা থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে তাদের বিরুদ্ধে পুলিশ পরিদর্শক কাজী মিজানুর রহমান মামলা করেন। ঐ মামলায় গ্রেফতার দুই আসামিকে আদালতে হাজির করে সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে তাদের ১০ দিন করে রিমান্ডের আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিটিটিসি (কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইম)-এর পুলিশ পরিদর্শক এস এম মিজানুর রহমান। পরে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত তাদের পাঁচ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন। তবে আসামিপক্ষে কোনো আইনজীবী ছিলেন না।

গত ২৩ আগস্ট থেকে কুমিল্লায় সাত শিক্ষার্থী এক যোগে নিখোঁজ হয়। এরা হলো, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী ইমরান বিন রহমান (১৭) ও সামি (১৮), একই কলেজের অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ইমতিয়াজ আহমেদ রিফাত (১৯), অনার্স তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আমিনুল ইসলাম আলামিন (২৩), কুমিল্লা সরকারি কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী হাসিবুল ইসলাম (১৮) ও নিহাল আবদুল্লাহ (১৭) এবং ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে অনার্স সম্পন্ন করা সরতাজ ইসলাম নিলয় (২৩)।

মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর মগবাজার এলাকা থেকে কুমিল্লা ইস্পাহানি স্কুল অ্যান্ড কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র আবরারুল হককে গ্রেফতারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশকে সে জানায়, ঐ সাত শিক্ষার্থীর সঙ্গে তারও ‘জিহাদে’ যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এর আগেই তার পরীক্ষা শুরু হয়ে যায়। এজন্য সে যেতে পারেনি। নিখোঁজ সাত শিক্ষার্থীর মধ্যে থাকা কুমিল্লা সরকারি কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী হাসিবুল ইসলাম ও একই কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী নিহাল আবদুল্লাহর মাধ্যমে পরিচয় হয় তার। এরপর একাধিক মিটিংয়ে অংশ নিয়ে জঙ্গি সংগঠনটিতে নাম লেখায় আবরারুল।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কুমিল্লার সাত শিক্ষার্থী হিজরতে যাওয়ার পর থেকেই নেপথ্যের হোতাদের খোঁজে নামে সিটিটিসি। একপর্যায়ে বড় মগবাজার থেকে আবরারুলকে গ্রেফতারের পরে জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে চিকিত্সক শাকিরের নাম। পরে তাকে পূর্ব হাজীপাড়ার একটি বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয়। তাকে জিজ্ঞাসাবাদে নতুনভাবে সক্রিয় জঙ্গি নেটওয়ার্ক সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। আনসার আল ইসলামের শীর্ষ কয়েক জনের সঙ্গে শাকিরের যোগাযোগ থাকার প্রমাণও মিলেছে। সিটিটিসির একাধিক সূত্র জানায়, কুমিল্লা থেকে যে তরুণরা  ঘর ছাড়ে, তাদের ২০২১ সালের শেষ সময়ে টার্গেট করা হয়। ধর্মীয় জ্ঞান ও ফতোয়ার ব্যাপারে বিশদ ব্যাখ্যার প্রয়োজন হলে কুমিল্লার একজন মুফতির কাছে তাদের নেওয়া হতো। প্রতি দফায় দুই-তিন জনকে নিত। ‘জিহাদের’ জন্য মানসিক প্রস্তুতি নেওয়ার পর সপ্তাহ তিনেক আগে একে একে ঘর ছাড়ে সাত তরুণ।

সিটিটিসি সূত্র জানায়, ঘর ছাড়ার পর শিক্ষার্থীরা বেশ কয়েকটি জেলায় যায়। এর মধ্যে রয়েছে চাঁদপুর ও বরিশাল। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, শাকির ও তার সহযোগীরা এসব ঠিকঠাক করে দিয়েছে। কারণ, শাকিরের এক আত্মীয়ের বাড়ি চাঁদপুরে। আর স্ত্রীর সুবাদে বরিশালে কিছুদিন বাস করে তারা। দুই জায়গায় নিখোঁজ তরুণদের আস্তানা খুঁজে দেওয়ার ঘটনায় তার ভূমিকা থাকতে পারে।

এদিকে, ডা. শাকিরের স্ত্রী আয়েশা বিনতে মুস্তাফিজকেও রাখা হয়েছে নজরদারিতে। তিনি বরিশাল মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থী। স্বামীর সঙ্গে জঙ্গি নেটওয়ার্কে তার যোগসূত্র পাওয়ার পর আয়েশার ব্যবহূত মোবাইল ফোনসেট পুলিশ জব্দ করেছে। ঐ ফোনে জঙ্গি মতবাদবিষয়ক বিভিন্ন লেখা পাওয়া গেছে। আয়েশা ছাড়াও তার স্বামীর দুটি ও আবরারুলের একটি ফোনসেট জব্দ করে প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। এতে তাদের সঙ্গে আনসার আল ইসলামের যোগসূত্র পাওয়া গেছে। এসব ফোনের ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য সিআইডির ল্যাবে পাঠানো হবে।

সিটিটিসি সূত্র আরো জানায়, দেশের প্রচলিত চিকিত্সা পদ্ধতিতে ডা. শাকিরের কোনো বিশ্বাস ছিল না। শরিয়াভিত্তিক চিকিত্সা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করেন তিনি। র্যামফিট নামে একটি পদ্ধতিতে তিনি বিশ্বাস করেন। ২০১৮ সালে কুমিল্লা সরকারি মেডিক্যাল কলেজে অধ্যয়নরত অবস্থায় তিনি একবার গ্রেফতার হলেও পরে ছাড়া পান। বর্তমানে মা-বাবা ও স্ত্রীর সঙ্গে পূর্ব হাজীপাড়ার বাসায় থাকলেও নতুন রিক্রুট করা জঙ্গিদের উদ্দেশ্যে বয়ান দিতে মাঝেমধ্যে কুমিল্লা যেতেন তিনি।

এছাড়া ডা. শাকির তার এক আত্মীয়ের ছেলেকেও উগ্রপন্থায় নিতে প্রলুব্ধ করে। ঐ ছেলের বাবা সরকারি কর্মকর্তা। বিষয়টি তিনি টের পাওয়ার পর শাকিরকে শাসান। দ্রুত শাকিরকে ঐ পথ থেকে সরে আসার তাগিদ দেন। তবে শাকির তা কানে তোলেননি।

এ ব্যাপারে সিটিটিসির প্রধান ডিআইজি মো. আসাদুজ্জামান বলেন, কুমিল্লা থেকে যারা নিখোঁজ হয়েছিল, তাদের ইমান, তাওহিদ ও জিহাদ সম্পর্কে দীক্ষা দেন শাকিরসহ আরো একজন। তাদের ওপরে অন্য কেউ থাকতে পারে। সর্বশেষ যে সাত তরুণ নিখোঁজ হয়েছে, তাদের খোঁজে বিভিন্ন সংস্থা কাজ করছে। সিটিটিসির অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) শেখ ইমরান হোসেন বলেন, বড় প্রস্তুতি নিয়ে তরুণদের ভুল পথে নিয়েছিল চক্রটি। শাকির মূলত রিক্রুটকারী। এর পেছনে আর কারা রয়েছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

অভিযোগ কাল্পনিক বলছেন শাকিরের বাবা : শাকিরের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে তার সবটাই মিথ্যা, বানোয়াট ও কাল্পনিক বলে দাবি করেছেন তার বাবা চক্ষু বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক এ কে এম ওয়ালিউল্লাহ। গতকাল বিকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির  সাগর-রুনি মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের কাছে এমন দাবি করেন তিনি। এ সময় তিনি চিকিত্সক শাকির বিন ওয়ালীর বিরুদ্ধে আনা ‘মিথ্যা অভিযোগের’ প্রতিকার ও তার ওপর ‘জুলুমের’ বিচার দাবি করেন প্রধানমন্ত্রীর কাছে। পাশাপাশি দেশবাসীকে সিটিটিসির এসব মিথ্যা অভিযোগ বিশ্বাস না করার জন্যও অনুরোধ করেন তিনি। সংবাদ সম্মেলনে ডা. শাকির বিন ওয়ালীর স্ত্রী আয়েশা বিনতে মোস্তাফিজ, তার দুই সন্তান (বয়স দেড় বছর ও দুই মাস) এবং বোন লাবিনা বিনতে ওয়ালী উপস্থিত ছিলেন ।

 

ইত্তেফাক/ইআ