বুধবার, ০৫ অক্টোবর ২০২২, ১৯ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

বার্ধক্যে অসুস্থতা : মনের বাঘে খায়!

আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৪:০৩

আমরা জেনে এসেছি, ‘স্বাস্থ্যই সকল সুখের ?মূল’। কারণ, সুস্থতাই জীবনের অন্যসব প্রাপ্তিকে অর্থবহ করে তোলে। আসলেও তা-ই। স্বাস্থ্য ভালো না থাকলে অর্থবিত্ত, যশখ্যাতি, এমনকি সোনার পালঙ্কে শুয়েও শান্তি-স্বস্তি কোনোটাই পাওয়া যায় না। আর বার্ধক্য? বার্ধক্যে তো সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত রাখাটা আরো বেশি জরুরি। এমনিতেই বার্ধক্যে যৌবন ক্ষয়ের রিক্ততা এবং শারীরিক অক্ষমতায় হাপিত্যেশে কাটে সময়। তাই ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় হোক, বার্ধক্যে মানুষের আবেগীয় একটা বিরূপ প্রতিক্রিয়া ঘটে। উপরন্তু অসুস্থ হলে, এই প্রতিক্রিয়া আরো তীব্র হয়ে ওঠে। তখন কারো সহানুভূতিও করুণা ভেবে আরো বিষাদাচ্ছন্ন হয়ে ওঠে মন। এমনকি পরিবারের কারো ভালো কথাও যেন বিষের মতো মনে হয়। মনের এই বিষ যেন কিছুতেই ঝেড়ে ফেলা যায় না। তখনি রোগশয্যায় পড়ে থাকার মধ্যে একটা অসাড়তা বোধ কাজ করে। এতে প্রিয়জনদের অতি সামান্য রূঢ় আচরণেও ব্যথিত হই। কখনো-বা তা অবহেলা ভেবে কষ্ট পাই। ফলে বার্ধক্যের অসুস্থতাকে আরো নৈরাশ্যের সুরে বেদনাবিদ্ধ করে তোলে।

আসলে বাস্তবতা এই যে, যে মানুষটি সব সময় সবাইকে ভালো থাকার পরামর্শ দিতেন, কঠোর বাস্তববাদী ছিলেন, সেই মানুষটিই বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় নিজেকে ভালো রাখার পথ খুঁজে পান না। কেন বলছি এই কথা, কারণ, মৃত্যু যেমন অবধারিত, তেমনি বার্ধক্যে রোগব্যাধিও জীবনেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটা জানা সত্ত্বেও আমরা অনেকেই বার্ধক্যে পদার্পণ করেই মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ি। অসুস্থজনিত স্বাভাবিক খারাপ দিকগুলোকে বড় ধরনের বিপদের অশনিসংকেত ভাবি। এমনি অশুভ চিন্তায় ডিপ্রেশনে ভুগি। ডিপ্রেশনে কষ্টের তীব্রতা যেমন তার ক্ষতিকারক প্রভাবও মারাত্মক। অথচ যা এখনো খারাপ পর্যায়ে যায়নি তা নিয়ে মুষড়ে পড়ি। এতে নেতিবাচক ধারণা, কথা ও চিন্তা মনে একধরনের ধ্বংসাত্মক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। ফলে ভীতিকাতরতায় রোগের সেই উপসর্গগুলো দ্বারা যেন এখনই আক্রান্ত হচ্ছি বলে মনে হতে পারে। আর সেই রোগের লক্ষণই যেন শরীরে প্রকাশ পাচ্ছে, তা-ও মনে হওয়া অবান্তর কিছু নয়।

প্রবাদ আছে, ‘বনের বাঘে না খেলেও কখনো-সখনো মনের বাঘে খায়।’  কারণ, বারবার খারাপ কিছু ভাবলে, ভাবনার চিন্তা, কথা ও শব্দতরঙ্গ আমাদের দেহের নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে গুঁড়িয়ে দিতে পারে। ধ্বংস হয়ে যেতে পারে আমাদের সহজাত আত্মবিশ্বাস। এতে বেঁচে থাকার স্বপ্নও হারিয়ে যেতে পারে। এমনকি বয়সের অভিজ্ঞতাও যেন লোপ পেয়ে যায় তথাকথিত অলীক ভয়ের আক্রমণে। অথচ আমরা ভেবে দেখি না অসুস্থ হলেই মানুষ মরে যায় না। অলীক ভাবনাই সব বাস্তবে ঘটে না। আজ পর্যন্ত জীবনে আমরা যত দুঃস্বপ্নে বিপর্যস্ত হয়েছি, কয়টা দুঃস্বপ্ন বাস্তবে ঘটেছ? তা-ই ?যদি হতো, কত রকমের রোগেই তো আমরা আক্রান্ত হয়েছি। কই মরে তো যাইনি? এখনো তো বেঁচে আছি। আর বার্ধক্য হলেই মানুষ মরে না। ভ্রূণ অবস্থায়ও নির্বাপিত হচ্ছে কত শত জীবনপ্রদীপ। অথচ বার্ধক্য পাওয়ার মতো কত বড় সৌভাগ্যবান আমরা। আমরা কী এক অলীক ভাবনায় বার্ধক্যের মতো শ্রেষ্ঠ মধুরতম মুহূর্তগুলোকে বিমর্ষ করে তুলেছি।

সুতরাং বার্ধক্য নিয়ে ভাবনা আর না, আর না। আসুন, বার্ধক্যকে স্রষ্টার আশীর্বাদ মনে করি। বার্ধক্য  জীবনের মধুরতম মুহূর্তগুলোকে উপভোগ্য করে তুলি। প্রকৃতির সান্নিধ্যে যাই। স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞচিত্তে প্রার্থনা করি। একে অর্থবহ করে তুলতে নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করি। জাতীয় অধ্যাপক প্রয়াত এম আর খান বলেছেন, মানুষ প্রথম ২৫ বছর অর্থোপার্জনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে, অর্থাত্ শিক্ষাগ্রহণ করে। পরবর্তী ২৫ বছর অর্থোপর্জনের জন্য স্বাস্থ্য নষ্ট করে এবং পরের ২৫ বছর সেই উপার্জিত অর্থ ব্যয় করে স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের জন্য। সেই পুরোনো প্রবাদ বাক্য, ‘আমরা দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা বুঝি না।’ তবে অতি স্বাস্থ্যসচেতন যারা, একেবারেই যে যত্ন নেন না, তা কিন্তু নয়। তবে আমরা অনেকেই এমন সময় শরীরের যত্ন শুরু করি, যখন শরীর আর যত্ন চায় না, অর্থাত্ যত্ন করলেও হারানো অবস্থা আর ফিরে পাওয়ার কোনো উপায় থাকে না। ব্যস্ততার দোহাই দিয়ে আমরা স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সাধারণ নিয়মনীতি পালনেও অবহেলা করি। ফলে শরীর অসুস্থ হয়ে পড়ে। আর শরীর অসুস্থ হলে মনের ওপরও প্রভাব পড়ে। যেহেতু শরীরের সঙ্গে মনও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আমাদের জেনে রাখা ভালো, শরীরের চেয়ে মন অনেক বেশি শক্তিশালী। প্রবাদ আছে, ‘মানুষের জীবনে শক্তির উত্স দুই জায়গায়। কারো শরীরে, কারো মনে। তবে আসল হলো মন। মনটা শক্ত হলে শরীরে এমনিতেই শক্তি বাড়ে।

প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক ডা. নুরুল ইসলাম বলেছেন, ‘রোগী নিজে নিজেই সুস্থ হয়, চিকিত্সক শুধু পথটা দেখিয়ে দেন।’ তাই এত ভাবনা কীসের? জীবন কখনো একমাত্রিক নয়। জীবনে চলার পথে উত্থানপতন, মৃত্যু-ক্ষয় আর বিচিত্র সব কারণে স্ট্রেস আসতেই পারে। এটাকে স্বাভাবিক ভেবে মেনে নিতে হবে। প্রয়োজনে নেতিবাচক অনুভূতির দুঃসহ বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সুস্থ ও সঠিক জীবনদৃষ্টি গ্রহণপূর্বক মনোদৈহিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ বেশি ফলপ্রসূ। তাই বার্ধক্যে সুস্থতার জন্য প্রয়োজন অতি সচেতনতাবোধ।

আমরা যদি শতবর্ষী মানুষের জীবনাচার লক্ষ্য করি, তাহলে দেখব যে, জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তারা ছিলেন বেশ আশাবাদী। ফলে স্ব-উদ্যোগেই তারা স্বাস্থ্যকর জীবনাচারে অভ্যস্ত হতে আগ্রহী হতেন। এতে তাদের প্রতিটি পদক্ষেপে বিশ্বাস আর আশাকে সঙ্গী করে রাখতেন। ফলে সুস্থতাবোধ-ভাবনায় তাদের সুস্থ করে তুলত। তাই নিজে আশাবাদী থাকুন আর নৈরাশ্যবাদীর সাহচর্য এড়িয়ে চলুন। অযথা অসুস্থতায়, বিষণ্নতায় ভেঙে পড়ে বার্ধক্যের মধুময় মুহূর্তগুলোকে নষ্ট করবেন না। সবশেষে ‘দ্য টুথ অ্যাবাউট এজিং’ বইয়ের লেখক ডা. জর্জ এস রথের ভাষায় বলছি, বয়েসজনিত অসুস্থগুলোকে পাশ কাটিয়ে আমরা অনায়াসেই উপভোগ করতে পারি একটি আনন্দময় দীর্ঘজীবন।

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন