সোমবার, ০৩ অক্টোবর ২০২২, ১৮ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

এই অপেক্ষার শেষ কোথায়?

আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৪:১৩

স্কুল শেষে আলী হোসেনের আর বাড়ি ফেরা হলো না। চিরদিনের জন্য সে চলে গেল ঘুমের বাড়ি। অথচ স্বজনেরা অপেক্ষায়, সন্তান কখন ফিরবে। এই অপেক্ষা যে আর কখনোই শেষ হবে না, সেটা তাদের কে বলবে? এরকম অপেক্ষায় কত স্বজন-প্রিয়জন থাকেন, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। বরং দিনে দিনে যেন অপেক্ষার সময় আরও বাড়ছে। একের পর এক সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল বাড়ছেই। আর সেটিই এখন মহাদুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে।

রাজধানীতে আবারও ঝরল শিক্ষার্থীর প্রাণ। ঘাতক মাইক্রোবাস কেড়ে নিল আলী হোসেন নামে সরকারি বিজ্ঞান কলেজের দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে। ১২ সেপ্টেম্বর সোমবার রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকার বিজি প্রেসের সামনের রাস্তা পার হওয়ার সময় মাইক্রোবাসের ধাক্কায় নিহত হয় ঐ শিক্ষার্থী। শোকে মুহ্যমান সহপাঠীরা এ ঘটনায় ক্ষোভে ফেটে পড়ে। সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে তারা। কিন্তু এতে কি আর বন্ধুকে ফিরে পাওয়া যাবে? বরং কিছুদিন পর পর ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকবে।

সড়ক দুর্ঘটনায় একটি বড় অংশ মারা যায় শিক্ষার্থীরা। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায় ৬ হাজার ৬৮৬ জন, যার মধ্যে ৭০৬ জন শিক্ষার্থী ও ৫৪১টি শিশু, যা মোট মৃত্যুর প্রায় ১৯ শতাংশ। ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই দুই শিক্ষার্থী নিহত হয়। সেদিন ঢাকার বিমানবন্দর সড়কে দ্রুতগতির দুই বাসের পাল্লাপাল্লিতে রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের ঐ দুই শিক্ষার্থী নিহত হয়েছিলেন। এরপর নিরাপদ সড়কের দাবিতে ছাত্ররা রাস্তায় নেমে আসে। রাজপথে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করে। গাড়ি আটকে কাগজপত্রও দেখে, লাইন মেনে গাড়ি চলাচলে বাধ্য করে। কিন্তু সেই লাইন বেশি দিন টেকসই হয়নি। যদিও ছাত্রদের দাবির পরপ্রেক্ষিতে নিরাপদ সড়ক আইন আরও যুগোপযোগী ও কঠোর করা হয়। কিন্তু বাস্তবে যে এর প্রয়োগ নেই, তা তো নিত্যদিনের দুর্ঘটনার পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে।

অথচ সড়ক নিরাপদ হোক এটি প্রত্যাশার কেন্দ্রে। কেননা, এর সঙ্গে জীবন-মৃত্যুর সম্পর্ক জড়িত। দেখা যাচ্ছে, দুর্ঘটনা মানেই মৃত্যু, প্রাণহানি, অঙ্গহানি, সম্পদহানি, হাহাকার, আর্তনাদ আর আহাজারি। নতুন আইন হয়েছে সড়ক নিরাপত্তায়। তা বাস্তবায়ন শুরু হলেও দুর্ঘটনা প্রতিরোধে তা খুব একটা সুফল বয়ে আনেনি; বরং এই আইন প্রতিহত ও অগ্রাহ্য করার প্রবণতা লক্ষণীয়। আসলে নিরাপদ সড়কের জন্য সবার এগিয়ে আসার কোনো বিকল্প নেই। কারণ সড়ক নিরাপদ না হলে এর মাশুল সব পক্ষকেই দিতে হবে।

সড়ক দুর্ঘটনা নিত্যদিনের ঘটনা। দিনে দিনে তা বেড়েই চলেছে। সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে নানা রকম সুপারিশ এসছে বিভিন্ন সময়ে। এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান প্রচার ও তার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। স্কুলের পাঠ্যক্রমে সড়ক দুর্ঘটনা রোধের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করে তা অবশ্যই বাস্তবায়ন করতে হবে। ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করা, যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং, নির্দিষ্ট স্থান ব্যতিরেকে যেখানে-সেখানে যাত্রী ওঠানো-নামানো, ওভারটেকিং, পাল্টাপাল্টি ও বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, অতিরিক্ত যাত্রী ও মাল বোঝাই করা, গাড়ির ছাদে যাত্রী বহন করা, ওভারব্রিজ কিংবা আন্ডারপাস বা জেব্রাক্রসিং থাকা সত্ত্বেও সেগুলো ব্যবহার না করার প্রবণতা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মাধ্যমে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

এছাড়া পথচারীদের নির্বিঘ্নে চলাচলের জন্য ফুটপাতগুলো দখলমুক্ত করে যেখানে ফুটপাত নেই সেখানে ফুটপাত তৈরির ব্যবস্থা করতে হবে এবং নিয়মিত মনিটরিংয়ের মাধ্যমে আবার যেন ফুটপাত দখল না হয়, এ বিষয়ে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। সড়কের ত্রুটিগুলো অচিরেই দূর করতে হবে। সরকার কর্তৃক গৃহীত ‘সেইফ’ প্রকল্পের মাধ্যমে ১ হাজার ৪১০ জন গাড়িচালক প্রশিক্ষক তৈরি ও ৩ লাখ গাড়িচালককে আপগ্রেডিংয়ের জন্য ১২ ও ২৪ দিনের প্রশিক্ষণ কর্মশালার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে, তা দ্রুত বাস্তবায়ন করা হলে লাইসেন্সবিহীন চালকেরা ২৪ দিনের প্রশিক্ষণ গ্রহণের মাধ্যমে বৈধ লাইসেন্সের আওতায় আসবেন এবং হালকা ও মধ্যম গাড়ির চালকেরা ১২ দিনের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই ভারী গাড়ির লাইসেন্স পাবেন, যা দেশে দক্ষ চালক সমস্যার সমাধানে সহায়ক হবে। যানবাহন চলাচলের জন্য আলাদা সড়ক (সার্ভিস রোড) নির্মাণ করতে হবে। সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে বলে আশা করছি।

সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু শুধু একটি পরিবারে গভীর শোক, ক্ষতই সৃষ্টি করে না, আর্থিকভাবেও পঙ্গু করে দেয় ঐ পরিবারকে। কোনো কোনো দুর্ঘটনায় পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটি প্রাণ হারান। তখন ঐ পরিবারের যে কী অবস্থা হয়, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। যারা পঙ্গুত্ব বরণ করে, তাদের পরিবারের অবস্থা আরও করুণ, আরও শোচনীয়।

এটা খুবই দুঃখজনক যে, অনেক চেষ্টার পরও সড়কে নিরাপত্তা ও পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা আনতে পারছে না সরকার। জোরালো অভিযোগ রয়েছে, পরিবহন আইন ও নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর একচেটিয়া প্রাধান্যের কারণেই এ খাতে শৃঙ্খলা আসছে না। এছাড়া সরকার, পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠন একাকার হয়ে গেছে। ফলে সিদ্ধান্ত হয়, কিন্তু বাস্তবায়ন হয় না। আইন আছে, কিন্তু এর প্রয়োগ করতে গেলেই বাধা আসে। ফলে রক্ষা হচ্ছে না যাত্রীস্বার্থ। অকাতরে প্রাণ যাচ্ছে সড়কে। তাহলে নিরাপদ সড়ক কি অলীক কল্পনার বিষয় হয়েই থাকবে?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতি বছর ২১ হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে। এখনো প্রায় প্রতিদিনই সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষের প্রাণহানি ঘটছে। এক হিসাবে দেখা যায়, গত ১৫ বছরে দেশে প্রায় দেড় লাখেরও বেশি সড়ক দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এতে ৫০ হাজারের বেশি লোক প্রাণ হারায়। আহতের সংখ্যা এর চেয়েও কয়েক গুণ বেশি। সড়ক দুর্ঘটনাজনিত কারণে প্রতি বছর দেশের ক্ষতি হচ্ছে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ২ শতাংশ। যানবাহনের উচ্চগতি, নাজুক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামোগত সমস্যা, পরিকল্পনা ও নীতির দুর্বলতা, অসচেতনতা সড়ক দুর্ঘটনা ত্বরান্বিত করছে। তাই সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কর্তৃপক্ষকে সেই সব সমস্যা দূরীকরণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, এক বছরে প্রায় ২০ হাজার ছোট-বড় সড়ক দুর্ঘটনায় তিন হাজার মানুষ নিহত হয়। আহত হয় ১ লাখ। এদের বেশির ভাগই পঙ্গুত্ব বরণ করে।

দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সবাই কমবেশি জানেন। বহুবার এসব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছো—দেশে সড়ক অবকাঠামো ও স্থলভাগের আয়তন অনুপাতে জনসংখ্যার চাপ বেশি; সড়কের তুলনায় মোটরযানের সংখ্যা অনেক বেড়েছে; একই সড়কে চলছে বাস, ট্রাক, প্রাইভেট কার, রিকশাসহ নানা রকম মিশ্র যানবাহন। উপরন্তু সড়ক ও মহাসড়কগুলো ত্রুটিপূর্ণ। দেশব্যাপী মহাসড়কের অনেক স্থানেই রয়েছে বিপজ্জনক বাঁক। এসব বাঁকের কারণে প্রায়ই সেসব জায়গায় দুর্ঘটনা ঘটছে। এছাড়া অবকাঠামোগত কারণেও দুর্ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতি ও ঝুঁকি খুব বেশি বলে মনে করেন অনেক বিশেষজ্ঞ। সম্প্রতি দুর্ঘটনা মহামারির আকার ধারণ করার জন্য যেসব কারণকে দায়ী করা হচ্ছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে চালকের অসতর্কতা ও বেপরোয়া গাড়ি চালানো। এ সমস্যা বারবার চিহ্নিত হলেও এর কোনো প্রতিকার নেই।

প্রতিবার দুর্ঘটনার পরপরই একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। সেই তদন্ত প্রতিবেদন কোনো দিন আলোর মুখ দেখে না। সংগত কারণেই দোষীদের শাস্তিও হয় না। সমাজের উঁচু স্তর থেকে নিচু শ্রেণির মানুষ যারাই দুর্ঘটনার শিকার হন না কেন, কোনো একটি ঘটনার বিচার হয়েছে এমন দৃষ্টান্ত মেলা ভার। বিচারহীন, প্রতিকারহীন অবস্থায় কোনো কিছু চলতে থাকলে সেটির পুনরাবৃত্তিও তো ঘটবেই।

প্রতি বছর ২২ অক্টোবর জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালন করা হয়। সচেতন করা হয় সংশ্লিষ্ট সবাইকে। কিন্তু সমস্যা থেকে যায় তিমিরেই। সড়ক দুর্ঘটনা হয় না এমন দেশ নেই। কিন্তু দুর্ঘটনার সংখ্যা ও ক্ষয়ক্ষতি যত কমিয়ে আনা যায়, সেটিই লক্ষ্য হওয়া উচিত। ভালো যান, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চালক, সড়কব্যবস্থা উন্নতকরণ, সিগন্যালিং ব্যবস্থা আধুনিক ও যুগোপযোগী করার বিষয়গুলো তো রয়েছেই। এর সঙ্গে দুর্ঘটনায় পতিতদের ত্বরিত চিকিত্সা পাওয়ার বিষয়টিও অত্যন্ত জরুরি। অনেক সময় আইনি জটিলতার কারণে আহতদের চিকিৎসা দিতে সমস্যা হয়। এই সমস্যার সমাধানেও ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রতিটি সড়ক-মহাসড়ক হোক নিরাপদ—এটাই সবার কাম্য।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন