বুধবার, ০৫ অক্টোবর ২০২২, ১৯ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

রাজধানী ছাড়তে চান না শিক্ষকরা

আপডেট : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৮:১৫

দীর্ঘদিন ধরে মফস্সলে চাকরি করছেন, এখন রাজধানীতে বদলি হয়ে আসতে চান এমন শিক্ষকের সংখ্যা কম নয়। কিন্তু ঢাকায় শিক্ষকরা এমনভাবে খুঁটি গেড়ে বসেছেন যে তাদের কোনোভাবেই সরানো যাচ্ছে না। ক্ষুব্ধ শিক্ষকরা বলছেন, তাদের সরানোরও কোনো উদ্যোগ নেয়নি শিক্ষা প্রশাসন। ফলে শিক্ষকদের এই চাকরি অন্যান্য সরকারি চাকরির মতো বদলিযোগ্য হলেও ঢাকায় থাকা স্কুলের শিক্ষকরা এক প্রতিষ্ঠানে থেকেই পুরোটা বয়স পার করছেন, অবসরে যাচ্ছেন।

শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক মাছুম বিল্লাহ বলেন, ‘যুগ যুগ ধরে এভাবেই চলছে। স্বাধীনতার ৫০ বছর তো পার করলাম। কিন্তু আর কতকাল এসব অনিয়ম চলবে শিক্ষা প্রশাসনে, শিক্ষাব্যবস্থায়?’ মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক নেহাল আহমেদ বলেন, ‘যারা দীর্ঘদিন ধরে আছেন, তাদের বদলি শুরু করেছি। পর্যায়ক্রমে সবাই বদলি হবেন। সেটা নিশ্চয়ই দেখতে পারবেন।’

অনেকে সহকারী শিক্ষক হিসেবে ঢাকায় চাকরি শুরু করে প্রধান শিক্ষক বা সিনিয়র শিক্ষক হয়েছেন; কিন্তু ঢাকার বাইরে যেতে হয়নি কখনো। দুই-এক জন কোনো কারণে ঢাকার বাইরে বদলি হলেও অতি অল্প সময়ের মধ্যেই ফিরে এসেছেন। আবার এমন শিক্ষকও আছেন, যারা আজীবন ঢাকার বাইরে চাকরি করেছেন। সেখানেই অবসরে গেছেন। কিন্তু ঢাকা আসার সব চেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছে তাদের। ঢাকার স্কুলে দেড় হাজারের বেশি শিক্ষক রয়েছেন। যার ৯০ শতাংশ আছেন ১০ বছরের বেশি সময় ধরে।

চাকরি শুরু থেকে আছেন এমন সংখ্যাও কম নয়। ১৯৯১ সালের চাকরিতে যোগ দিয়ে এখনো আছেন অনেকে। ৩৯ জন শিক্ষক আছেন, যারা টানা ২৫ বছর বা তারও বেশি আছেন। আর ২০ বছর বা তার বেশি আছেন শতাধিক শিক্ষক। এ সংখ্যা অন্তত ১১০ জন। অথচ সরকারি চাকরিতে তিন বছর পর বদলির বিধান রয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, যারা ঢাকায় আছেন, তারা বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তিদের স্বজন পরিচয়ে আছেন। তাদের বদলির উদ্যোগ নেওয়া হলেও বিভিন্ন মাধ্যমে তদবির করে সেই আদেশ বাতিল পর্যন্ত করেন। এ কারণে তাদের বদলির জন্য খুব একটা উদ্যোগ নেওয়া হয় না। এদের বদলি করলে, বদলি ঠেকানোর জন্য যত তদবির আসে তা সামাল দেওয়াও কঠিন। তাই অতীতে মহাপরিচালকরা এই ঝুঁকি নিতে চাননি।

শুধু ২০১৮ সালে কোচিং বাণিজ্যে সম্পৃক্ত রাজধানীর কয়েকটি স্কুলের ২৫ শিক্ষককে শাস্তিমূলক বদলি করেছিল মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তর। ঐসব শিক্ষক সরাসরি কোচিং বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সুপারিশ করেছিল। কিন্তু তদবির করে তারা আবার ঢাকায় ফিরে এসেছেন। শেরেবাংলা সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে ৫১ জন শিক্ষক রয়েছেন। এর মধ্যে অর্ধেকের বেশি শিক্ষক আছেন ১০ থেকে ২৭ বছর ধরে। ভৌত বিজ্ঞানের সিনিয়র শিক্ষক আশা বালা সরকার আছেন ১৯৯৬ সালের ৪ নভেম্বর থেকে। তার নিজ জেলা সিরাজগঞ্জ হলেও তিনি টানা ২৫ বছর ধরে ঢাকার এ স্কুলেই রয়েছেন। কৃষি শিক্ষার মো. বদর উদ্দিন ১৯৯৫ সাল থেকে আছেন। একই সময় থেকে আছেন মো. আজাহার আলী সিকদার। এই শিক্ষকের নিজ জেলা টাঙ্গাইল। নিজ জেলা রাজবাড়ী হলে মিয়া মো. আব্দুল হাসিব আছেন ২২ বছর ধরে। জাকিয়া খানম আছেন ২০ বছর ধরে। সিনিয়র শিক্ষক (ইংরেজি) সৈয়দা শবনম অরোরা আছেন ১৯৯৮ সাল থেকে। 

মতিঝিল সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে ৫৩ শিক্ষক রয়েছেন। শারীরিক শিক্ষা সিনিয়র শিক্ষক  এ কে এম জাহাঙ্গীর হোসেন মজুমদার আছেন ২৮ বছর ধরে। ইসলাম ধর্মের সিনিয়র শিক্ষক  আবু ছাদেক মো. ইকবাল খন্দকার আছেন ১৯৯৯ সাল থেকে। সামাজিক বিজ্ঞানের ইসরাত জাহান আছেন ১৯৯৭ সাল থেকে।  একই বিষয়ে নিগার সুলতানা আছেন টানা ৩০ বছর ধরে। প্রধান শিক্ষক সৈয়দ হাফিজুল ইসলাম ২০০৭ সাল থেকে। আরমানিটোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এ কে এম মোস্তফা কামাল ১৯৯৯ সাল থেকে ঢাকায়। গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক আবু সাঈদ ভুঁইয়া। তিনি ১৯৯৮ সাল থেকে ২০০৪ মতিঝিল সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক, ২০০১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বর্তমান বিদ্যালয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক এবং ২০১৪ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে প্রধান শিক্ষক ছিলেন। ২০১৯ সালের ৯ এপ্রিল থেকে গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি স্কুলে প্রধান শিক্ষক পদে আছেন। তিনি সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতিরও সভাপতি। এ কারণে অন্যান্য স্কুলেও তার অনেক প্রভাব।

ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে গণিতের শিক্ষক হুমায়ুন কবির আছেন ২০০৮ সাল থেকে। গণিতের অপর শিক্ষক অঞ্জনা রানী ভৌমিক আছেন ৩০ বছর। বাংলার শিক্ষক কবিতা রানী সরকার ২৮ বছর। ধর্মের শিক্ষক নোমান হোসাইনও আছেন ৩০ বছর ধরে। শারীরিক শিক্ষার শিক্ষক আব্দুল কাদেরও আছেন ৩০ বছর।

আরমানিটোলার ইসলাম ধর্মের শিক্ষক আবুল কাশেম আছেন ৩১ বছর ধরে। চাকরি শুরুই করেছেন এই প্রতিষ্ঠান থেকে। তিনি জানান, আরো বেশ কয়েক বছর চাকরির বয়স আছে। এতদিন কীভাবে একই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ধর্মের শিক্ষক। এ পদে বদলি হয়ে আসার কারো আগ্রহ নেই। তাই আছি।

ধানমন্ডি গভ. বয়েজ হাইস্কুলের মোছা. সাহিদা খাতুনও আছেন আছেন ৩১ বছর। গণভবন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক গুল শাকিনা পারভীন আছেন ১৯৯২ সাল থেকে। তেজগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের রেহানা কবির আছেন ২৯ বছর। টিকাটুলি কামরুন্নেসা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সিদ্দিকা বেগম আছেন ১৯৯৪ সাল থেকে। রৌশন আরা বেগম আছেন ১৯৯১ সাল থেকে। একই স্কুলে থেকে কোচিং বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েছেন অনেক শিক্ষক। ফলে বদলি হলে এই কোচিং বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যেতে পারে এমন আশঙ্কাও তাদের।

ইত্তেফাক/এএইচপি