বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৪ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

‘এই দিন দিন না, আরো দিন আছে’

আপডেট : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৪:২০

জগতে আইনকানুন আছে এই কারণে যে, যাহাতে অনিয়ম-বিশৃঙ্খলায় কোনো জনপদ বসবাস অনুপযুক্ত হইয়া না পড়ে; কিন্তু সমস্যা হইল, উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলির স্থানীয় পর্যায়ের চেয়ারম্যান-মেম্বাররাও এমন শরীরী ভাষায় চলাফেলা করেন যে, তাহারা যেন কোনো ট্রাইবাল জনপদের এক ও অদ্বিতীয় রাজা। উন্নয়নশীল বিশ্বে শিক্ষাদীক্ষা হইতে শুরু করিয়া সকল কিছুই সীমিত। ফলে অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত মানুষও মনে করেন, তাহাদের এলাকার চেয়ারম্যান-মেম্বাররা করিতে পারেন না এমন কোনো কাজ নাই। জনগণের এই মনের কথা চেয়ারম্যান-মেম্বাররাও ভালো করিয়াই জানেন। আর এই সুযোগটাই তাহারা লইয়া থাকেন। 

অথচ চেয়ারম্যান-মেম্বাররাও কী পারেন আর কী পারেন না—তাহার সুস্পষ্ট বিধিবিধান রহিয়াছে। সরকার এবং স্থানীয় সরকার পর্যায়ের প্রতিটি পদের দায়িত্ব-কর্তব্য স্পষ্ট করিয়া লিখিত রহিয়াছে। হয়তো ঐ বিধানের পুস্তিকা সকলে নাও পড়িয়া দেখিতে পারেন এবং কেহ কেহ উহা পড়িবার প্রয়োজন নাও মনে করিতে পারেন। কারণ, তাহারা জানেন, মফস্বল-গ্রাম পর্যায়ের মানুষ মনে করেন, তাহারা প্রায় সর্বময় ক্ষমতা রাখেন। গ্রামের মানুষ তাহাদের এই রকম ট্রাইবাল রাজার মতো মনে করুক—ইহাই অধিকাংশ চেয়ারম্যান-মেম্বার চাহেন। সুতরাং তাহাদের নিকট যেন নিয়মকানুনের পুস্তিকা পাঠের কোনো মূল্য নাই! এই দিকে, আধুনিক সময়ে গ্রাম পর্যায়েরও অনেক তরুণ উন্নত বিশ্বে যাতায়াত করিয়া দেখিয়াছেন, সেই সকল দেশ কেমন করিয়া নিয়মের মধ্যে চলে আর দেশে আসিয়া তাহারা বুঝিতে পারেন— উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলি কী করিয়া চলিতেছে। ইহা উন্নয়নশীল বিশ্বের বড় ধরনের সমস্যা। 

বলিবার অপেক্ষা রাখে না, মানবসভ্যতা টিকিয়া আছে গুরুত্বপূর্ণ কিছু নিয়মতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের খুঁটির উপর ভর করিয়া। একেকটি প্রতিষ্ঠান গড়িয়া উঠে উহার অন্তর্নিহিত শক্তির দ্বারা। এই কারণে প্রতিষ্ঠান গড়িয়া তোলা খুব সহজ কাজ নহে; কিন্তু উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলিতে এখনো আধা সামন্তবাদী মানসিকতা দূর হয় নাই। এই সকল বিষয় লইয়া যাহারা গবেষণা করেন, তাহারা মনে করেন, বহু যুগ ধরিয়া উন্নয়নশীল বিশ্বের সমাজ গড়িয়া উঠিয়াছে একধরনের নৈরাজ্যের ভিতর দিয়া। এই জন্য তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে একটি জাতির নিয়মতান্ত্রিক সুষ্ঠু বিকাশধারার জন্য তৈরিকৃত প্রতিষ্ঠানের জন্য যতই বলা হউক—উহা নিয়মের মধ্যে চলিবে—তাহা আসলে বাস্তবে দেখা যায় না। দিনের শেষে এইখানে নিজের খেয়ালখুশি মতো সকল কিছু পরিচালনা করিবার প্রবণতাই প্রকট আকারে দেখা যায়। দেখা যায়, দম্ভ-হুমকিধমকির প্রকাশও। এমনকি ন্যূনতম কাহারো নিরাপত্তাজনিত প্রয়োজনে নিয়মমতো একটি ‘সাধারণ ডায়ারি’ করিবার পথেও অনেক ক্ষেত্রে বাধা দেওয়া হয়।
 
উন্নয়নশীল দেশসমূহের ভিতরে এই ধরনের আধা সামন্তবাদের গন্ধ কবে দূর হইবে, কেহ জানে না। অবস্থা এমন যে, ইহাদের নিকট নিয়মমতো সকল কিছু আশা করাটাই বড় দুরাশা। ইহা নিশ্চয়ই রাষ্ট্রের নির্বাহী চাহেন না। এইখানে তাহার যে কোনো অসহায়ত্ব অত্যন্ত দুঃখজনক; কিন্তু কাউকে না কাউকে তো ইহার সমাধান করিতেই হইবে। ইহা অত্যন্ত সিরিয়াস বিষয়। মনে রাখিতে হইবে, যখন কোথাও অনিয়মকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়, নিয়মকে পাশ কাটাইয়া চলা হয়—তখন সেইখানে অনিয়মই নিয়ম হইয়া উঠে। সাধারণ মানুষও তখন মনে করে, ‘কই, নিয়ম ভঙ্গের জন্য তো কোনো অ্যাকশন লওয়া হইল না!’ সাধারণ জনগণের নিকট এই ধরনের বার্তা অত্যন্ত বিপজ্জনক ও ভুল বার্তা প্রদান করে। তবে আশাহীন হওয়া যাইবে না। সাময়িকভাবে অ্যাকশন নেওয়া হইতেছে না মানে এই নহে যে, কখনোই অ্যাকশন নেওয়া হইবে না। ঘুড়িতে-ঘুড়িতে প্যাঁচ লাগিবার সময় দুঁদে খেলোয়াড় তাহার লাটাইভরা সুতা ছাড়িতেই থাকেন। অপর ঘুড়ি কতদূর যাইতে পারে, সেই সক্ষমতাও তাহার জানা আছে। সুতরাং যাহারা নিয়মকানুনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাইতেছেন, তাহাদের মনে রাখিতে হইবে—এই দিন দিন না, আরো দিন আছে।

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন