বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৪ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

এই বিশ্বকে মানুষের বসবাস-উপযুক্ত করিতে হইবে

আপডেট : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১২:০৯

মানবসভ্যতার ইতিহাস মূলত যুদ্ধের ইতিহাস। আজিকার বিশ্বে যাহা ঘটিতেছে তাহার দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া বলিতে হয়-ভালো যাইতেছে না কোনো কিছুতেই-লক্ষণ ভালো নহে। একবিংশ শতাব্দীর শুরুও হইয়াছিল একটি সুূরপ্রসারী অভিঘাতের ভিতর দিয়া। উহা ছিল টুইন টাওয়ার হামলা। দিনের শুরু দেখিয়া যেমন আন্দাজ করা যায় দিনটি কেমন যাইবে, তেমনি এই শতাব্দীর প্রথম বছরে দাঁড়াইয়াই বিশ্লেষকরা দেখিতে পাইয়াছিলেন-বিশ্বের জন্য অপেক্ষা করিতেছে চরম ‘অশনিসংকেত’। আমরা সামনের দিকে যতই আগাইয়া চলিতেছি ততই সেই ভবিতব্যের বাস্তবতা স্পষ্ট হইয়া উঠিতে দেখিতেছি। যুদ্ধের দামামায় কাঁপিতেছে বিশ্ব। পাওয়ার পলিটিকসের দৌরাত্ব্যে ‘ব্যালেন্স অব পাওয়ার’ হইয়া পড়িয়াছে নড়বড়ে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সূত্র ধরিয়া হিসাব কষিলে দেখিতে পাওয়া যায়, ‘শক্তির ভারসাম্য’ বিঘ্নিত হইয়া পড়িলে বিশ্বব্যবস্থায়ও অস্থিরতা তৈরি হয়।

বাস্তবিক অর্থে, চলমান বিশ্বব্যবস্থায় এই সমস্ত লক্ষণের তীব্র উপস্থিতি লক্ষ করা যাইতেছে। বিশ্বে যুদ্ধ চলিতেছে; হইার মধ্যেই ঘটিয়া চলিয়াছে নূতন নূতন সংহিংসতা। ভূরাজনৈতিক হিসাবনিকাশ কড়ায় গন্ডায় চুকাইয়া লইতে ব্যস্ত হইয়া পড়িয়াছে বিবদমান শক্তিগুলি। আড়াল হইতে কিংবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে সম্মুখে বসিয়াই ইহাতে রসদ জোগাইতেছে বিভিন্ন ‘ইন্টারন্যাশনাল অ্যাক্টর’। ‘নেশন স্টেট’-‘স্টেট নেশন’-এর পাশাপাশি চওড়া হইয়া উঠিতেছে ‘পলিটিক্যাল জিওগ্রাফি’। ইহার ফলে উত্তেজনা বাড়িতেছে, বাড়িতেছে যুদ্ধ ও যুদ্ধাবস্থা। 

গত ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনের মাটিতে বোমা ফেলিয়া রাশিয়া যেই যুদ্ধের অবতারণা ঘটাইয়াছিল-তাহার অভিঘাত কোথায় গিয়া ঠেকিবে, কেহ জানে না। বৎসরের অর্ধেক সময় পার করিবার পরও সংঘাতের যবনিকা পতনের কোনো লক্ষণ দেখা যাইতেছে না। এই সংঘাত বহু প্রাণ তো ঝরাইয়াছেই; উপরন্তু ইহার কঠোর অভিঘাতে পুরো পৃথিবী হইয়া পড়িয়াছে ‘স্থবির’। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করিয়া দিয়া বলিয়াছিলেন-ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্য দিয়া বিশ্ব ‘তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ যুগে’ প্রবেশ করিল। প্রকৃতপক্ষেই বিশ্ব যেন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের রণভূমিতে পরিণত হইয়া উঠিয়াছে! সংঘর্ষে জড়াইয়া পড়িয়াছে আজারবাইজান-আর্মেনিয়া। সহিংসতা ছড়াইয়াছে কিরগিজস্তান-তাজিকিস্তানে। উত্তেজনা বিরাজ করিতেছে আরো অনেক অঞ্চলেই। বৈরী ভাবাপন্ন দেশগুলি পরস্পরের সীমান্তের দিকে তাক করিয়া রাখিয়াছে মারণাস্ত্র। এই অবস্থায় বলিতেই হয়, চলমান উত্তেজনা-সংঘর্ষে কাহিল হইয়া পড়িয়াছে বিশ্ব-অর্থনীতি। বিশ্ব-উৎপাদন-বিশ্ববাণিজ্য শ্লথ হইয়া যাইবার কারণে মন্দার ঝুঁকিতে পড়িয়াছে বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশ।   

ইহা সকলেরই জানা যে, বিশ্বায়নের এই যুগে কোনো একটি রাষ্ট্রের গায়ে আঁচড় লাগিলে তাহার রেশ ধরিয়া উত্তেজনা-সংঘাতের ঢেউ আছড়াইয়া পড়ে সমগ্র বিশ্বে। দ্বিপক্ষীয়-বহুপক্ষীয় নানা সমীকরণের কঠিন ধাঁধায় পড়িয়া ছোটখাটো সংঘাতও বৃহৎ সংঘর্ষের রূপ পরিগ্রহ করে। শুরু হয় আক্রমণ ও পালটা আক্রমণ, নিষেধাজ্ঞা ও পালটা ব্যবস্থা। আর এইসবের জাঁতাকলে পড়িয়া টালমাটাল হইয়া পড়ে পুরো বিশ্ব। ছোট শক্তির দেশগুলি দোদুল্যমান সিদ্ধান্তে ভুগিতে থাকে। দেশগুলির সরকারকে পা ফেলিতে হয় বহু সমীকরণকে মাথায় লইয়া। ঘরে-বাহিরে অস্থিরতার মুখে পড়িতে হয় উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলিকে। দুঃখজনকভাবে, বিশ্বশান্তির পরিবর্তে বিশ্বের অবস্থা এখন-‘যুদ্ধই জীবন, যুদ্ধই সর্বজনীন’। 

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের চূড়ান্ত পরিণতি লইয়া ভাবিতে গেলেও শিহরিত হইতে হয়! কেননা, এ যুদ্ধে জয়-পরাজয়ের প্রশ্নে ‘পারমাণবিক শক্তি’ যুক্ত হইতে পারে বলিয়া আশঙ্কা করা হইতেছে! চরম ধরাশায়ী অবস্থায় উপনীত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ­াদিমির পুতিনের পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করা-না করা লইয়া প্রশ্ন করা হইলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন পুতিনের প্রতি উদ্দেশ্য করিয়া সম্প্রতি বলিয়াছেন, পারমাণবিক হামলার পথে হাঁটিলে তাহা পুতিনের জন্য ডাকিয়া আনিবে ভয়াবহ পরিণতি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা এই বিশ্ব এখনো ভোলে নাই। পারমাণবিক অস্ত্র যতটা ব্যবহারের জন্য, তাহার চাইতে উহা মূলত একটি দেশের আত্মশক্তির বৃদ্ধির জন্য। এই জন্য পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের এই আশঙ্কা বিশ্ববাসীর কপালে ভাঁজ ফেলিতেছে। পারমাণবিক আঘাতের পালটা আঘাত এই বিশ্বকে কোথায় লইয়া যাইবে-তাহা কেহই বলিতে পারিতেছে না। কিন্তু দিন শেষে এই বিশ্বকে তো মানুষের জন্য বসবাস-উপযুক্ত করিতেই হইবে। সুতরাং এই বিশ্বকে রক্ষায় পরাশক্তিদের অবশ্যই দায়িত্বশীল হইতে হইবে।

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন