বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৪ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

প্লাস্টিকমুক্ত করিয়াই আত্মতৃপ্তিতে ভুগিলে চলিবে না

আপডেট : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৪:২৭

প্লাস্টিক একটি মহা আবিষ্কার। ভালো এবং খারাপ—উভয় অর্থেই। প্লাস্টিকের সবচাইতে গুরুতর গুণাবলি হইল, ইহা অপচ্য। হয়তো সামান্য মূল্য দিয়া একটি পলিথিনের ব্যাগ কিংবা চিপস, পানির বোতল ক্রয় করা সম্ভব। কিন্তু ঐ ব্যাগ, খালি প্যাকেট, খালি বোতলের সুদূরপ্রসারী ক্ষতির দিক বিবেচনা করিলে উহার প্রকৃত মূল্য অনেক অনেক বেশি। তিন বত্সর পূর্বেই আমরা জানিয়াছিলাম যে, প্লাস্টিক বর্জ্যের কারণে সেই সময় মুখ থুবড়াইয়া পড়িয়াছিল কর্ণফুলী নদীর বহুল প্রত্যাশিত ক্যাপিটাল ড্রেজিং। নদীর তলদেশে ২ হইতে ৭ মিটার অবধি পলিথিনের স্তর জমিয়া যাওয়ায় অত্যাধুনিক ড্রেজার মেশিনও কাজ করিতে পারিতেছিল না। 

এমন পরিস্থিতিতে সেই সময় চীন ও মালয়েশিয়ার দুইটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ৩২ ইঞ্চি ব্যাসের সাকশন ড্রেজার আনিয়া পলিথিন বর্জ্য তুলিয়া আনিবার চেষ্টা করা হইয়াছিল। কিন্তু নদীর তলদেশে জমিয়াছিল প্লাস্টিক বর্জ্যের বুনোট পাহাড়! অতঃপর এই সুকঠিন কাজটি সম্ভবপর করিয়া দেখাইয়াছে দেশীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান—বাংলাদেশ নৌবাহিনী ই-ইঞ্জিনিয়ারিং। এই মুহূর্তে ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ে ‘পলিথিনের নদী’র কুখ্যাতি পাওয়া কর্ণফুলী নদী এখন পলিথিনমুক্ত বলা যায়। আপাতত মরণদশা হইতে রক্ষা পাইয়াছে একসময়ের রূপমাধুরী কর্ণফুলী নদী। তবে ইহা ভুলিয়া গেলে চলিবে না, চট্টগ্রাম মহানগরীতে দিনে ২৪৯ টন প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হয়, যাহার বড় অংশ কর্ণফুলীতে গিয়াই পতিত হয়। বন্দর কর্তৃপক্ষ যদিও বলিতেছে, ড্রেজিংয়ের পর নদীর যেই পরিচ্ছন্ন অবস্থা ফিরিয়াছে, তাহা ধরিয়া রাখিতে তিন বত্সর মেইনটেন্যান্স ড্রেজিং করিবে তাহারা। কিন্তু দূষণের উত্স যদি আটকানো না যায়, তাহা হইলে ‘লক্ষ টাকার খেত ছাগলে খাইবার মতো’ অবস্থা হইবে। ইহাও প্রণিধানযোগ্য যে, ড্রেজিংয়ের সময় নদী হইতে বালু-মাটি ও বর্জ্য তুলিয়া যেইভাবে রাখা হইয়াছে, তাহা ঘুরিয়া-ফিরিয়া ঝড়বৃষ্টি ও বন্যায় পুনরায় নদীতেই পড়িবে বলিয়া অনেকে আশঙ্কা প্রকাশ করিয়াছেন। সুতরাং শুধু প্লাস্টিকমুক্ত করিয়াই আত্মতৃপ্তিতে ভুগিলে চলিবে না—উহা যাহাতে সাসটেইন করে, টিকসই হয়, তাহার সকল ধরনের ব্যবস্থা করিতে হইবে। নচেৎ বৃথা যাইবে এই পরিশ্রম। 

শুধু কর্ণফুলী নদীই নহে, প্লাস্টিকের উপাদান বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বকে কীভাবে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির মুখে ফেলিয়াছে, এই ব্যাপারে এখন আর কাহারো কোনো দ্বিমত নাই। কয়েক বত্সর পূর্বে ইন্দোনেশিয়ার সমুদ্র উপকূলে প্রায় ১০ মিটার লম্বা একটি তিমি ধরা পড়িয়াছিল, যাহার পেটের মধ্যে পাওয়া গিয়াছিল হাজারখানেক প্লাস্টিকের পণ্য। ইতিপূর্বে যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডোয় প্লাস্টিক-বৃষ্টির ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করিয়াছেন পরিবেশবিজ্ঞানীরা। দক্ষিণ ফ্রান্সের পিরেনিজ এলাকাতেও বৃষ্টির পানিতে মিলিয়াছে প্লাস্টিকের কণা। প্লাস্টিক কতখানি অপচ্য, তাহা আমরা কমবেশি সকলেই জানি। ইহার আয়ুষ্কাল কমপক্ষে ৫০০ বত্সর। কেবল তিমি নহে, প্লাস্টিকের ছোট ছোট অংশ প্রতিদিন আমাদের পেটেও ঢুকিতেছে। অথচ তাহা আমরা জানিতেও পারিতেছি না। সম্প্রতি গবেষণায় দেখা গিয়াছে, পৃথিবীর সব ধরনের জলাশয়ে এত বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য মিশিয়াছে যে, তাহার টুকরা টুকরা কণা প্রতিনিয়তই গিলিতেছে সকল প্রজাতির মাছ। আর এই সকল মাছ খাইয়া পরোক্ষভাবে আমরাও প্লাস্টিক খাইয়া ফেলিতেছি। মনে রাখিতে হইবে, পৃথিবীর অস্তিত্ব টিকিয়া আছে সামুদ্রিক সিস্টেমের কারণে। খাদ্য ও অক্সিজেন সরবরাহের মাধ্যমে সমুদ্রগুলি পৃথিবীর প্রাণিকুলের অস্তিত্ব রক্ষা করে। 

বহুদিন ধরিয়াই বিশ্ব জুড়িয়া প্লাস্টিক ও পলিথিনের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা হইতেছে। বাংলাদেশের মানুষ মাথাপিছু গড়ে প্রায় চার কেজি প্লাস্টিক ব্যবহার করিয়া থাকে। বিশ্বের তুলনায় এই ব্যবহার কম হইলেও ক্ষতি কিন্তু কম হইতেছে না। বাংলাদেশে ২০০২ সালে পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধ করা হইয়াছিল। কিন্তু পলিথিন ও প্লাস্টিকের ব্যবহার দিনকে দিন বাড়িয়াই চলিতেছে। সুতরাং সময় থাকিতে সচেতন না হইলে ইহার সুদূরপ্রসারী ক্ষতি হইতে আমাদের কেহ রক্ষা করিতে পারিবে না।

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন