শুক্রবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৫ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

সীমান্তবাসীদের আতঙ্ক ঘুমহীন ঘরবন্দি জীবন

ঝুঁকিতে থাকা পরিবারদের সরানোর প্রস্তুতি

আপডেট : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৮:৪৯

মিয়ানমারের অভ্যন্তরে চলমান গোলাগুলির কারণে বান্দরবানের ঘুমধুমের তুমব্রু সীমান্তে বসবাসকারীদের মধ্যে আতঙ্ক কাটছে না। রাত-দিন অব্যাহত গোলাগুলির কারণে সীমান্তবর্তী এলাকার ৩০০ পরিবারকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে প্রশাসন। 

সীমান্ত এলাকার সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে সোমবার (১৯ সেপ্টেম্বর) সকালে তুমব্রু এলাকা পরিদর্শন করেছেন বান্দরবানের জেলা প্রশাসক ইয়াছমিন পারভীন তিবরীজি। এদিন বেলা ১১টার দিকে ঘুমধুম সীমান্ত এলাকা পরিদর্শনে এসে জিরো পয়েন্টসহ বিভিন্ন স্কুল ঘুরে দেখেন তিনি।

ঘুমধুম ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য শফিকুল ইসলাম জানান, উপজেলা প্রশাসনের বৈঠকে ঝুঁকিতে থাকা সীমান্তের নিকটবর্তী ৩০০ পরিবারকে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রশাসন বিষয়টি বিবেচনা করবে বলে জানিয়েছে।

ঘুমধুম বাজার এলাকার বাসিন্দা মোস্তাকিম আজিজ (২৬) জানান, সীমান্তের ওপারে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও আরকান আর্মি মাঝে চলমান সংঘাতে আমরা খুবই আতঙ্কে রয়েছি। দিন-রাত সমানে গুলিবর্ষণ চলছে। দেড় মাস ধরে চলা এ সংঘাতে সীমান্ত এলাকার বাসিন্দারা স্বজনদের কাছে নিরাপদ স্থানে সরে গেছে। তুমব্রু বাজারের প্রায় সব দোকানপাট বন্ধ।

তুমব্রু বাজারের প্রায় সব দোকানপাট বন্ধ

ঘুমধুম ইউপির ৩নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার মোহাম্মদ আলম বলেন, রোববার রাতেও মিয়ানমারের মংডুর তুমব্রু, পানিরছড়া ও রাইম্মাখালি গ্রাম গুলোতে প্রচণ্ড গোলাগুলি চলেছে। গুলির শব্দে রাত জেগে সময় কেটেছে সীমান্তে বসবাসকারীদের। আতংকে ধান চাষ, ক্ষেত খামার ও শাকসবজির ক্ষেতেও যাওয়া যাচ্ছে না।  

গৃহিনী স্বপ্না বালা (৫০) বলেন, চাষাবাদ দেখতে যাওয়া দূরে থাক, ঘর থেকে বের হওয়াও কঠিন। গোলাগুলির বিকট শব্দে শিশুরাও কেঁপে উঠছে। এলাকার বাইরে আত্মীয়-স্বজন না থাকায় এলাকাও ত্যাগ করা যাচ্ছে না।

বান্দরবান জেলা পুলিশ সুপার মো. তারিকুল ইসলাম তারিক বলেন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ সীমান্তে বসবাসরত লোকজনদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। সীমান্ত এলাকায় বসবাসরত লোকজনের নিরাপত্তায় কাজ করছি আমরা। সার্বিক গোয়েন্দা নজরদারি রাখা হচ্ছে।

অপরদিকে, কক্সবাজারের উখিয়ার পালংখালীর সীমান্তবর্তী এলাকার অর্ধশতাধিক পরিবারকেও নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেয়া পরামর্শ দিয়েছেন পালংখালী ইউপি চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী। ওপারে ব্যাপক গোলাগুলিতে সীমান্তের এসব পরিবার আঘাতপ্রাপ্ত হবার আশংকায় উপজেলা প্রশাসনের কাছে এ আবেদন করেন চেয়ারম্যান।  

এ বিষয়ে বান্দরবানের জেলা প্রশাসক ইয়াছমিন পারভীন তিবরীজি বলেন, মিয়ানমারের অভ্যন্তরে গোলাগুলি অব্যাহত থাকায়  সীমান্তে বাংলাদেশি যেসব পরিবার ঝুঁকির মুখে রয়েছে, তাদের সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে, সেখানে বসবাসকারীদের মতামতেই তাদের সরানো হবে। প্রাথমিকভাবে প্রস্তুতি নেওয়া আছে, পরিস্থিতি খারাপ হলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন জেলা প্রশাসক

জেলা প্রশাসক বলেন, দেশের নাগরিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে সরকার। সীমান্ত বিষয়ে জেলা প্রশাসন সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখছে। ঝুঁকির মুখে স্থানীয়দের সরিয়ে নিতে উচ্চ পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। মূলত তুমব্রু, ঘুমধুম, ফাত্রাঝিরি সীমান্তের খুব কাছে বসবাসকারী পরিবারগুলোকে সরানো হবে। সরানো পরিকল্পনায় থাকা ৩০০ পরিবারের আশ্রয়ের জন্য জায়গা খোঁজা হচ্ছে। মূল কথা, সরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে সব কিছু গুছিয়ে রাখা হচ্ছে।

নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম সীমান্ত এলাকা পরিদর্শনের আগে ঘুমধুম ইউপি কার্যালয়ে স্থানীয়দের ঝুঁকির বিষয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন জেলা প্রশাসক। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন বান্দরবানের পুলিশ সুপার মো. তারিকুল ইসলাম, নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সালমা ফেরদৌস, ঘুমধুম ইউপি চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আজিজসহ আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

সীমান্তে আতংকের কারণে নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা চিন্তা করে উখিয়ার কুতুপালংয়ে সরিয়ে নেওয়া ঘুমধুম উচ্চ বিদ্যালয় এসএসসির পরীক্ষাকেন্দ্র পরিদর্শন করেন বান্দরবানের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার।

উল্লেখ্য, গত ২৮ আগস্ট মিয়ানমার থেকে নিক্ষেপ করা ২টি মর্টার শেল অবিস্ফোরিত অবস্থায় ঘুমধুমের তুমব্রু'র উত্তর মসজিদের কাছে পড়ে। এ ঘটনার পাঁচ দিন পর গত ৩ সেপ্টেম্বর ঘুমধুম এলাকায় দুটি গোলা পড়ে এবং ৯ সেপ্টেম্বর একে ৪৭ এর গুলি এসে পড়ে। তবে গত শুক্রবার (১৬ সেপ্টেম্বর) মাইন বিস্ফোরণ ও গুলি-মর্টার শেল নিক্ষেপে হতাহতের ঘটনা ঘটে। এতে নো ম্যান্স ল্যান্ডে বসবাসরত রোহিঙ্গা ও স্থানীয়দের মধ্যে চরম ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে। তুমব্রু বাজার ও উত্তরপাড়া, বাইশারি সীমান্তে বিজিবির কঠোর অবস্থান রয়েছে। সহজে কাউকে সীমান্ত এলাকাসহ বাজার, গ্রামে ঢুকতে দিচ্ছে না।

ইত্তেফাক/জেডএইচডি