বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৪ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

অব্যবস্থাপনা আর কতকাল?

আপডেট : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০২:২০

বিনা টিকিটের যাত্রীরা বাধাহীনভাবে বেরিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে ৩৬৬টি যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল করছে। আরো জানা যায়, প্রতিদিন আন্তঃনগর ট্রেনে আসনসংখ্যার বিপরীতে ৬৯ শতাংশ টিকিট বিক্রি হয়। ৩১ শতাংশ অবিক্রীত থাকে। লোকাল ও মেইল কমিউটার ট্রেনে আসনসংখ্যার মাত্র ১০ শতাংশ টিকিট বিক্রি হয়। বাকি ৯০ শতাংশ অবিক্রীত থাকলেও ট্রেনের একটি আসনও খালি থাকে না। রেলের ওপর মানুষের বীতশ্রদ্ধ ভাব এসেছে। অরক্ষিত রেলক্রসিং, অপরিকল্পিত ও অননুমোদিত সংযোগ সড়ক, দায়িত্বে অবহেলার কারণে রেল দুর্ঘটনা বেড়েই চলেছে। বিগত ১৫-২০ বছর আগেও ট্রেনের গতি ছিল ৯০ কিলোমিটার। সেই গতি কমতে কমতে এখন নেমে এসেছে প্রায় ৫৩ কিলোমিটারে। বর্তমান সরকার বিগত এক যুগে রেলের বরাদ্দ বাড়িয়েছে ১৬ হাজার ৩৭৫ শতাংশ।  

জানা গেছে, বিগত ১৩ বছরে রেলে প্রায় ৮৪ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন হয়েছে। পাশাপাশি উন্নয়ন প্রকল্প চলমান রয়েছে আরো প্রায় পৌনে ২ লাখ কোটি টাকা। রেলের উন্নয়নে ২০১৬ থেকে আগামী ২০৪৫ সাল মেয়াদে ৫ লাখ ৫৩ হাজার ৬৬২ কোটি টাকার মহাপরিকল্পনা নেওয়া হলেও এত বিনিয়োগ ও মহাপরিকল্পনার মধ্যেও রেলের লোকশান আর অব্যবস্থাপনা বেড়েই চলেছে। জানা যায়, গত এক যুগে রেল লোকশান দিয়েছে ১৪ হাজার কোটি টাকা। এত কিছুর পরও সাধারণ মানুষ রেলভ্রমণেই বেশি আগ্রহী। রেলে ভ্রমণের জন্য সারা রাত স্টেশনের প্ল্যাটফরমে টিকিটের জন্য নির্ঘুম রাত কাটিয়েও টিকিট না পেয়ে ট্রেনের হাতল ধরে, ছাদে উঠে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উপচে পড়া ভিড় উপেক্ষা করেও যাত্রীরা ট্রেনেই ভ্রমণ করতে চায়। কাজেই দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের চাহিদা, আশা-আকাঙ্ক্ষা, সাশ্রয়ী ও নিরাপদ ভ্রমণের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। 

বর্তমান সরকার রেলের উন্নয়নে বিভিন্ন ধরনের উন্নয়ন প্রকল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করলেও  অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি আর অদক্ষতার কারণে এর লোকশান বাড়ছে বই কমছে না। জানা যায়, রেল ১ টাকা আয় করতে ব্যয় করে ৬ টাকা। ২০২০-২১ অর্থবছরে রেল আয় করেছে ১ হাজার ১৩ কোটি টাকা। কিন্তু এই সময়ে ব্যয় করেছে ৬ হাজার ২৫ কোটি টাকা। একইভাবে ২০১৯-২০ অর্থবছরেও রেল আয় করেছে ১ হাজার ৩৭ কোটি টাকা, ব্যয় করেছে ৫ হাজার ৮৮২ কোটি টাকা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, এত হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেও রেলের উন্নয়ন বা সেবার মানেও কোনো উন্নয়ন বা অগ্রগতি নেই। রেলে যে ব্যয় হয়, তার পুরো টাকাটাই আসে জনগণের কর থেকে। তাই এই টাকার যথাযথ ব্যবহার ও মানসম্মত সেবা জনগণ প্রত্যাশা করে। সরকার বিভিন্ন স্থানে মেট্রোরেল তৈরির কাজ হাতে নিয়েছে। বিশেষ করে রাজধানীতে। এটা সরকারের প্রশংসনীয় উদ্যোগ। মেট্রোরেল চালু হলে রাজধানীবাসী প্রচণ্ড যানজটের হাত থেকে কিছুটা হলেও মুক্তি পাবে এবং স্বস্তিতে চলাচল করতে পারবে এই আশা নিয়ে আছে। এটা যেন সাধারণ রেলের মতো গড্ডলিকা প্রবাহে না চলে, সেদিকে প্রখর দৃষ্টি রাখতে হবে। 

সম্প্রতি রেলওয়ের অব্যবস্থাপনা নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ভুক্তভোগী ছাত্র মহিউদ্দিন রনি স্ব-উদ্যোগে রেলের অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে ছয় দফা দাবিতে ৭ জুলাই ২০২২ তারিখে কমলাপুর স্টেশনে টিকিট কাউন্টারের সামনে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন। তার এই আন্দোলন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। এছাড়া বিভিন্ন পত্রিকা তার ছবিসহ আন্দোলনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য আদালত বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে রেলের অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে শুনানিতে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য প্রদান করে। আদালত রেলের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেছে, ‘ট্রেন জাতীয় সম্পদ, এটাকে আপনারা গ্রাস করতে চাইছেন! শুধু তাই নয়, মহামান্য আদালত রেলের অব্যবস্থাপনা নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করে ট্রেনের ছাদে যাত্রী বহন বন্ধ করতে বলেছে। একই সঙ্গে রেলের টিকিট কালোবাজারি বন্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে তা ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে জানাতে নির্দেশ দিয়েছিল রেলওয়েকে। আদালত আরো বলেছে, দেশ স্বাধীনের ৫০ বছর হয়ে গেছে। কিছু সিন্ডিকেটের কারণেই দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। রেলের দুর্নীতি নিয়ে রেলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদ্দেশে আদালত যেসব কথা বলেছে, তা অত্যন্ত লজ্জার। এর পরও কি রেলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বোধোদয় হবে না? রেল কি এভাবেই চলতে থাকবে?

লেখক : অর্থনীতিবিষয়ক বিশ্লেষক, সাবেক মহাব্যবস্থাপক, বিসিক

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন