রোববার, ০২ অক্টোবর ২০২২, ১৭ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

তাহাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনিতে হইবে

আপডেট : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০২:৫০

এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার উন্নয়নশীল দেশসমূহে এখন একজন আরেক জনের সঙ্গে রসিকতা করিয়া চলিয়াছেন। এই সকল দেশের অনিয়মের বিষয়টি কে না বুঝেন; কিন্তু ইহা লইয়াও রসিকতার শেষ নাই। অনিয়ম দূর করিতে ইংরেজি শব্দের প্রভাবে ব্যবহার করা হইতেছে ‘দমন’ শব্দটি। যেন অনিয়মের গলায় পাড়া দিয়া ইহা দমন করা হইবে। শব্দ ব্যবহার ও চয়নের মাধ্যমে অনেক সময় বোঝা যায় ইহা দ্বারা কতটা কাজ হইবে। ‘দমনের’ বদলে ‘পর্যবেক্ষণ বা প্রতিরোধ’ শব্দটি ব্যবহার করা কি যুক্তিযুক্ত নহে? তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে অনেক সময় ঢাকঢোল পিটাইয়া অনিয়ম দমন করিবার কথা বলা হইলেও ইহাতে তাহা দমন তো হয়ই না, বরং দিনদিন তাহা বাড়িয়াই চলে। এমনকি তৃণমূল পর্যন্ত অনিয়মের শেকড়-বাকড় ও ডালপালা বিস্তার লাভ করে। মসজিদ-মন্দির-গির্জায়ও যাহারা ইহা লইয়া আলোচনা করেন, অনেক সময় দেখা যায়, তাহারা নিজেরাই অনিয়মের প্রডাক্ট। এইভাবে কি দেশের মানুষের সহিত রসিকতা করা হইতেছে না? 

তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে দেখা যায়, টেন্ডারের মাধ্যমে রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট ইত্যাদির কাজ দেওয়া হইলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেও সেই কাজের মান ঠিক থাকে না। অনেক সময় রডের বদলে দেওয়া হয় বাঁশ বা পুরাতন রড। নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের কারণে বর্ষাকাল তো দূরের কথা, সামান্য পানি গেলেই সেই রাস্তা টিকে না। অথচ কাজের মান ও অগ্রগতি দেখিবার জন্য প্রতিটি জেলা-উপজেলায় বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাগণ রহিয়াছেন। তাহার পরও সেই কাজ যথাসময়ে সম্পন্ন হয় না কেন? কেন কাজ না করিয়াই বিল উঠাইয়া লওয়ার ঘটনা ঘটে? কত বড় কাজের জন্য কত বড় লাইসেন্সধারী কাজ পাইবেন, তাহার একটি নিয়ম রহিয়াছে; কিন্তু দেখা যায়, যাহারা কাজটা পান, তাহারা নিজেরা শেষ পর্যন্ত কাজটা না করিয়া অনেক সময় সাব-কনট্রাকটরের নিকট বিক্রয় করিয়া দেন। ইহাতে আমাদের কোনো আপত্তি নাই; কিন্তু স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী কাজ না হইলে শর্ত ও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা লইতে হইবে। প্রয়োজনে মূল ঠিকাদারকে ব্ল্যাকলিস্ট বা কালো তালিকাভুক্ত করিতে হইবে। যাহারা এমন অনিয়মের সহিত জড়িত, তাহাদের অধিকাংশই রাজনৈতিক শক্তিতে বলীয়ান। এইভাবে উন্নয়নশীল দেশে একশ্রেণির প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও রাজনীতিবিদ সেই দেশের মানুষের সহিত প্রতিনিয়ত মশকরা করিয়া চলিয়াছেন। প্রধান নির্বাহীর পক্ষ হইতে বলা হইতেছে, নূতন করিয়া আর কোনো রাস্তা নির্মাণ করা হইবে না। অথচ ঠিকই শত শত রাস্তা বরাদ্দ দেওয়া হইতেছে। অথচ অনেক ক্ষেত্রে এই সকল রাস্তার কোনো নম্বরই নাই। 

গোটা পৃথিবীটাই আসলে রসিকতায় ভরিয়া গিয়াছে। ইহার মানে এই নহে যে, কোনো সিস্টেম বা নিয়মকানুন নাই। তাহার পরও পদে পদে চলিতেছে নিয়ম ভাঙিবার প্রতিযোগিতা। ফলে দুর্নীতির খবর পত্রপত্রিকায় অহরহ ছাপা হইতেছে। উন্নয়নশীল দেশগুলির প্রধান নির্বাহী এই সকল খবর রাখেন না, তাহা বলিবার অবকাশ নাই; কিন্তু অ্যাকশন লওয়া হয় কদাচিৎ। দুর্নীতি দেখিবার জন্য যেই সকল প্রতিষ্ঠান বা এজেন্সি রহিয়াছে, তাহাদেরও রহিয়াছে গা-ছাড়া ভাব। সবচাইতে বড় কথা হইল, এই সকল দুর্নীতির মাধ্যমে আসলে পকেট কাটা যাইতেছে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কর প্রদানকারী নাঙ্গা-ভুখা ও গরিব মানুষেরও; কিন্তু নিজ নিজ এলাকায় তাহাদের এই ব্যাপারে প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ করিতে দেখা যায় না। এইভাবে যাহাদের পকেট কাটা যায়, তাহাদের নির্লিপ্ততাও কি একপ্রকার রসিকতা নহে? এই সকল দেশে আজ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কাজের ভলিউম বাড়িয়াছে। অতএব, এই অর্থের অপচয় যাহাতে না হয়, সেই জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের অবশ্যই জবাবদিহিতার আওতায় আনিতে হইবে।

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন