বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৪ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

স্মৃতি কমে যাওয়া মানুষটির প্রয়োজন সেবা ও সহমর্মিতা  

আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০০:২৫

আমরা দৈনন্দিন কাজকর্ম করতে গিয়ে প্রায়শই অনেক কিছু ভুলে যাই। বাজার করতে গিয়ে দোকানে জিনিসপত্র রেখে আসা কিংবা টাকা কমবেশি দিয়ে আসা। বাজারে গিয়ে ঠিকমতো সদাইপাতি কিনতে না পারা। চেনাজানা লোক দেখে নাম মনে করতে না পারা। চাবি, মোবাইল ফোন, ঘড়ি, পাসপোর্ট, ভোটার আইডি কার্ড, মানিব্যাগ, পার্টস, সেপটিপিন, টাকাপয়সা, গয়না, জরুরি কাগজপত্র খুঁজে না পাওয়া নিত্যদিনের ঘটনা। টাকাপয়সার হিসাব মাঝেমধ্যে মেলানো যায় না। মোবাইল হাতে ফোন করতে গিয়ে খেই হারিয়ে যায়। কাকে যেন ফোন করলেন মনে করতে পারছেন না। সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে নিশ্চিত হতে হয়, কাকে ফোন করেছেন। দীর্ঘ চেনাজানা মানুষের কণ্ঠ ফোনে শুনে চিনতে না পারার কষ্ট মাঝেমধ্যে পাই। সহপাঠী ও সহকর্মীদের নাম ভুলে যাওয়ার বিড়ম্বনা কমবেশি আমাদের জীবনে ঘটে। বাসায় গ্যাসের চুলা, পানির কল, ফ্যান, লাইট, এসি, দরজা ও জানালা বন্ধ করেছেন কি না নিশ্চিত হতে কারো কারো পুনরায় বাসায় ফিরতে হয়। মানসিক চাপ, নিকটতম আত্মীয়স্বজনের হঠাৎ মৃত্যু, ডিপ্রেশন, মস্তিষ্কের রোগ, স্লিপ এপনিয়া, হাইপোথায়েরিডিজম, মাথায় আঘাত ইত্যাদি কারণে একজন মানুষ স্মৃতি শক্তি হারিয়ে ফেলতে পারে।

উপরিউক্ত কারণে স্মৃতিশক্তি লোপ পেলে তা উদ্ধার করা সম্ভব। অন্যদিকে আলঝাইমার্স রোগের কারণে স্মৃতি হারালে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে না। বরং দিনদিন খারাপের দিকে যাবে। আলঝাইমার্স যে কোনো বয়সেই হতে পারে। তবে ৬৫ বছরের বেশি বয়সি মানুষের মধ্যে এই রোগ বেশি দেখা যায়। আবার পুরুষদের চাইতে নারীরা বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকেন। এ রোগের লক্ষণগুলো হলো, উদাসীন হয়ে যাওয়া, সাম্প্রতিক ঘটনা ভুলে যাওয়া, চুপচাপ হয়ে যাওয়া, স্থান-কাল-পাত্র বিবেচনা করতে না পারা, সময় আন্দাজ করতে না পারা, চেনাজানা পথ অচেনা হয়ে যাওয়া, চেনা পথে হারিয়ে যাওয়া, একই কথা বারবার বলা, একই কাজ বারবার করা, স্বামী-স্ত্রী ভাই-বোন, ছেলেমেয়েকে চিনতে না পারা, টাকাপয়সা হারিয়ে ফেলা, দুর্বল সিদ্ধান্ত নেওয়া, অস্থিরতা, উদাসীনতা, যোগাযোগ দক্ষতা কমে যাওয়া, ভাষা ব্যবহারে শব্দ খুঁজে না পাওয়া, আচরণের পরিবর্তন, দুর্বল বিচার-বিবেচনা। ওপরের লক্ষণগুলো কারো মধ্যে দেখা দিলে স্নায়ু রোগবিশেষজ্ঞ, মানসিক রোগবিশেষজ্ঞ ও হরমোন রোগবিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে নিশ্চিত হতে হবে।

এ রোগের চিকিৎসা নেই বিধায় রোগীর সেবাযত্ন কেমন হবে, সে বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা থাকা খুবই জরুরি। রোগী দিনদিন খারাপের দিকে যায়, রোগের তীব্রতা বৃদ্ধি পায়। পরিবারের সদস্যদের এই রোগ সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকলে রোগী সঠিক চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হতে পারে। আমাদের দুর্ভাগ্য যে, আলঝাইমার্স রোগটি দ্রুত শনাক্ত করা হয় না। যখন রোগটি শনাক্ত করা হয় তখন রোগী মোটামুটি খারাপের দিকে যেত শুরু করেছে। প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করতে পারলে রোগী সুস্থ স্বাভাবিকভাবে অনেকদিন কাটাতে পারেন। আমাদের মধ্যে আলঝাইমার্স রোগ সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি হলে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে উঠবে। একে অপরকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবে। সামাজিকভাবে রোগী সমব্যথী লোকজনের কাছ থেকে পরামর্শ সমর্থন সহযোগিতা পাবে।

হারিয়ে যাওয়া এই ধরনের রোগীকে উদ্ধার করে পুলিশে হস্তান্তর অথবা পরিবার-পরিজনের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। রোগীর আচার-আচরণ নিয়ে সমাজের মানুষের মধ্যে ধৈর্য এবং সহনশীল মনোভাব তৈরি করতে হবে। আলঝাইমার্স আক্রান্ত রোগীকে অনেকই মানসিক রোগী কিংবা পাগল মনে করে। পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি গোপন করে। সামাজিকভাবে নিগৃহীত হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় এসব মানুষের পক্ষে প্রকাশ্যে চলাচল সীমিত হয়ে যায়।

কেউ কেউ রোগীকে একটি রুমে আটকে রাখে। একজন রোগীকে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখার সংবাদ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা একটা সময়ে পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। পরিবারের সদস্যরা বিরক্তিকর, কষ্টকর, পরিশ্রমের সেবাযত্নের কাজটি চালিয়ে যেতে চায় না। নানান অজুহাতে আপনজনরা অসুস্থ প্রবীণকে ছেড়ে চলে যান। অনিচ্ছাসত্ত্বে পরিবারের সবচেয়ে দুর্বল সদস্যটি রোগীর সেবাযত্নের দায়িত্ব পালন করেন। অনেক সময় কাজের লোকের ওপর দায়িত্ব দেওয়া হয়। আবার কেউ কেউ সঠিক সেবাযত্নের অভাবে তাড়াতাড়ি মৃত্যুবরণ করেন। সময় এসেছে বিপুলসংখ্যক মানুষকে আলঝাইমার্স রোগীর সেবাযত্ন সম্পর্কে সচেতন করা। জীবনের এরকম একটি পরিস্থিতিতে রোগীর সেবাযত্ন পাওয়ার অধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। রোগীকে সেবাযত্ন করার জন্য বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত সেবাকর্মী গড়ে তোলা জরুরি হয়ে পড়েছে। এই সেবা কিনে নিতে হবে। যাদের সামর্থ্য আছে তারা কিনে নিবেন। আর যাদের কেনার সামর্থ্য নেই তাদের জন্য বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠান, বিত্তবান ব্যক্তি, স্থানীয় সরকার ও এনজিওকে এগিয়ে আসতে হবে। 

লেখক : সভাপতি, এজিং সাপোর্ট

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন