বুধবার, ০৫ অক্টোবর ২০২২, ১৯ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

এই হাসি-আনন্দ যেন ক্ষণিকের না হয়

আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০১:০০

অনেক হতাশার চিত্র দেশে-বিদেশে। জ্বালানিসংকট এবং ইহার হাত ধরিয়া দেশে দেশে খাদ্যঘাটতি, মূল্যস্ফীতিসহ কত ধরনের সংকট ও সমস্যা দিনদিন প্রকট হইয়া উঠিতেছে। এমনকি কোভিড-১৯ হইতেও এখনো বিশ্ব পুরাপুরি মুক্ত নহে, তাহারই মধ্যে বিশ্বের দুইটি শস্যভান্ডার বলিয়া খ্যাত দেশ রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধরত প্রায় আট মাস ধরিয়া। নিষেধাজ্ঞা ও পালটা নিষেধাজ্ঞার লড়াই চলিতেছে বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলির মধ্যে। যাহার ফলে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলির শুধু সরকারেরই নহে, সাধারণ মানুষেরও কপালে বড় ধরনের দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়িয়াছে। দ্রব্যমূল্য অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তাসহ সকল কিছু লইয়া সম্মুখে যেন কোনো আশার আলোই দৃশ্যমান নহে। আর সেই কারণেই দেশের সাধারণ মানুষ যেন হাসিতে ভুলিয়া যাইতেছিল। ইহার মধ্যেই দেশের নারী ফুটবল দল মানুষের মুখে এক চিলতে প্রসন্নের হাসি ফুটাইয়া তুলিবার কারণ হইয়া উঠিয়াছে। গত সোমবার নেপালের মাটিতে সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপে স্বাগতিক নেপালকে ৩-১ গোলে হারাইয়া যেন গিরিশৃঙ্গ জয় করিলেন বাংলাদেশের মেয়েরা। একে-একে ভারত, পাকিস্তান, ভুটানকে হারাইয়া ফাইনালে উঠিবার পথে কখনোই মনে হয় নাই, এই দল হোঁচট খাইতে পারে। প্রথম হইতেই তাহাদের টিম স্পিরিট ছিল চোখে পড়িবার মতো!  

খেলাধুলায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের চ্যাম্পিয়ন হইবার রেকর্ডটি খুব একটা সুখকর নহে। ক্রিকেটে কাছাকাছি গিয়াও বহুবার ব্যর্থ হইয়া ফিরিতে হইয়াছে। সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপেও ২০১৬ সালে কাছাকাছি গিয়া চ্যাম্পিয়ন মুকুটটি আর মাথায় উঠে নাই। কিন্তু এই দফায় মেয়েরা দেশবাসীকে আনন্দের বন্যায় ভাসাইয়া সেই মুকুট মাথায় তুলিয়াছেন। সারা দেশ এই জয়ের আনন্দে ভাসিতেছে। এই জয় গোটা বাংলাদেশের জয়। সোশ্যাল মিডিয়া যেন বস্ফারিত হইয়াছে! তবে এই ধরনের বিজয় আনন্দের উপলক্ষ্য কম ঘটিলেও অতীতে একেবারেই যে কিছু হয় নাই—তাহা নহে। বিভিন্ন সময়ে শিশু-কিশোর পর্যায়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ সফল হইয়াছে। কিন্তু আমরা বিগত দিনে ইহাও দেখিয়াছি, অনেক অর্জন পরবর্তী সময়ে আর ধরিয়া রাখা যায় নাই। আমরা দেখিয়াছি, বিভিন্ন সময়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের বা দলের নাম উজ্জ্বল করিয়া পরবর্তীকালে স্বল্প সময়ের মধ্যে বাতাস বাহির হইয়া যাওয়া বেলুনের মতো স্তিমিত হইয়া গিয়াছে। ইহার কারণগুলিও খুব অস্পষ্ট নহে। ধারাবাহিকভাবে প্রাতিষ্ঠানিক সাপোর্টের অভাব, পর্যাপ্ত ক্রীড়াশৈলীর সুযোগ না থাকা এবং অল্পতেই নিজের প্রতি অধিক আত্মবিশ্বাস বাংলাদেশের সব ধরনের খেলাধুলাকে ক্ষতিগ্রস্ত করিয়াছে। কোনো কোনো পারদর্শী খেলোয়াড়ের, কোনো কোনো দলের নাম পর্যন্ত হারাইয়া গিয়াছে। এই দিকগুলির দিকে বাংলাদেশের নজর দেওয়া এখন বিশেষ প্রয়োজন, যাহাতে ধারাবাহিকভাবে সাফল্য আসে। 

কথায় বলা হয়, কোনো কিছু পাওয়ার চাইতে তাহা ধরিয়া রাখা আরো কঠিন। বাংলাদেশের নারী ফুটবলাররা যে সম্মান বহিয়া আনিয়াছে, তাহা ধরিয়া রাখিতে পারিলেই বর্তমানের এই অর্জন একটি মাইলফলক হইয়া থাকিবে। কিন্তু ধরিয়া রাখা না গেলে এই অর্জন ইতিহাসের অতল গহ্বরে হারাইয়া যাইবে। এই হারাইয়া যাওয়া কাহারো কাম্য নহে। সুতরাং উচ্ছ্বসিত হইবার পাশাপাশি, নারী ফুটবল দলকে অভ্যর্থনা জানাইবার পাশাপাশি এই দলসহ অন্যান্য খেলোয়াড়দের নার্সিংয়ে মনোনিবেশ করিতে হইবে। তবে সর্বোপরি আমরা বর্তমান বাংলাদেশ নারী দলের পারফরম্যান্স এবং অর্জনে যাহার পর নাই আপ্লুত, উচ্ছ্বসিত। এই অসাধারণ বিজয় অর্জনের জন্য বাংলাদেশের নারী দলের সকল খেলোয়াড় ও নেপথ্যে থাকা সংশ্লিষ্ট সকলকে জানাই অভিবাদন। বাংলাদেশের সকল মানুষের আনন্দের সঙ্গে কণ্ঠ মিলাইয়া আমরাও আশা করিব, ভবিষ্যতে তাহারা আরো বড় মহাদেশ পর্যায়ের আসর হইতে সম্মান ছিনাইয়া আনিবে।

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন