বুধবার, ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১৮ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

নতুন বাঁকে প্রবেশ করেছে ইউক্রেন যুদ্ধ

আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০০:৫০

এ বছরের শুরুতে ফেব্রুয়ারি মাসে ক্রেমলিন একটি ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিলে রাশিয়ার সেনারা ইউক্রেনের কিছু কিছু অঞ্চল দখল করে নেয়। কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে অপ্রত্যাশিত ও দ্রুত পালটা আক্রমণের মাধ্যমে ইউক্রেনীয় বাহিনী বেশ কয়েকটি অঞ্চল পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। তারা রাশিয়ানদের রেখে যাওয়া বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, কৌশলগত গিয়ার, হার্ডওয়্যার, বর্ম ও সরঞ্জাম দখল করেছে। যদিও চূড়ান্ত বিজয় আসেনি, তবু যুদ্ধক্ষেত্রের এই বাস্তব তথ্যগুলো খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।

প্রথমত, ইউক্রেনীয় পালটা আক্রমণ যুদ্ধের কৌশলগত বুদ্ধিমত্তা, প্রচলিত সামরিক প্রস্তুতি ও লজিস্টিক কর্মক্ষমতার ব্যাপারে রাশিয়ার কার্যকর সক্ষমতা সম্পর্কে সঙ্গত কারণে সন্দেহ তৈরি করেছে। অতএব, এ কথা বলা যায়, ২০০৮ সালের রুশ-জর্জিয়ান যুদ্ধে এবং বাশার আল-আসাদের নেতৃত্বাধীন সরকারের পক্ষে সিরিয়ায় মস্কোর হস্তক্ষেপে বিজয় অর্জনের পর বিশিষ্ট বিশ্লেষকরা পর্যন্ত যে ধারণা করেছিলেন—তা সঠিক ছিল না। তারা রাশিয়ার সামরিক শক্তিকে যেভাবে মূল্যায়ন করেছেন তা ছিল আসলে অতিরঞ্জিত। তাই রাশিয়ানদের আর স্বয়ংক্রিয়ভাবে অপরাজেয় হিসেবে দেখা যায় না।

দ্বিতীয়ত, ইউক্রেন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েনি। ইউক্রেন সরকারেরও পতন হয়নি। বিদ্যমান অসামঞ্জস্যতা সত্ত্বেও, ইউক্রেনীয় বাহিনী রাশিয়ানদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে ভয় পায় না। যদিও ন্যাটোর অস্ত্র ও হার্ডওয়্যারের প্রবাহ কিয়েভের শক্তিকে শক্তিশালী করেছে, তার পরও এটা বলা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, যুদ্ধ নিছক কোনো সাধনা নয়। যুদ্ধকে অস্তিত্বের সংগ্রাম হিসেবে নিতে পারলে তার প্রভাব যুগপত্ভাবে মানুষের মন-মানসিকতার ওপর পড়তে বাধ্য। এখানে এই বিষয়টি অনুপেক্ষণীয়। 

তৃতীয়ত, কিয়েভের বিদেশি সমর্থকরা নিশ্চিত হয়েছেন, ইউক্রেনের বিজয় সম্ভবত অর্জনযোগ্য। ইউক্রেনে এই ধরনের ফলাফল অর্জন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বড় বিজয়ের কারণ হবে। এর ফলে পরাশক্তি হিসাবে রাশিয়া তার মর্যাদা হারাবে। মস্কো মূল ইউরোপীয় রাজ্যগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। যেমন—মস্কো জার্মানির সঙ্গে যে গেমচেঞ্জিং অংশীদারত্ব তৈরি করতে পারত, তা আর সম্ভব হবে না। এতে মার্কিন সামরিক-শিল্পপ্রতিষ্ঠানের রপ্তানি বৃদ্ধি পাবে উল্লেখযোগ্য হারে এবং আমেরিকান সেনাদের প্রাণহানি ছাড়াই অর্জিত হবে এই সাফল্য। 

চতুর্থত, রাশিয়ান বাহিনী তাদের বিপত্তির প্রতিক্রিয়ায় ইউক্রেনের অবকাঠামো, বিশেষ করে স্নায়ুকেন্দ্র ও এর পাওয়ার গ্রিডের সার্কিটগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। সুতরাং, যখন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন দাবি করেন, এই ধরনের আক্রমণ কেবল সতর্কীকরণের জন্য, তখন বুঝতে হবে এর পেছনেও রয়েছে প্রচ্ছন্ন হুমকি। এর অর্থ হলো—যদি প্রয়োজন হয়, রাশিয়ানরা বড় ধরনের হামলার কথা ভাববে। এমনকি রাশিয়ানরা যদি শেষ পর্যন্ত ইউক্রেন জয় করতে অক্ষম হয়, তবুও তারা এটি করার চেষ্টা করতে পারে।

ইউক্রেন যুদ্ধের ভূমিকম্পের ধাক্কা সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর স্বাধীনতা লাভকারী রাষ্ট্রগুলোতেও কিছুটা উত্তেজনা তৈরি করেছে। যেমন—মস্কোর ভূরাজনৈতিক কক্ষপথে কৌশলগতভাবে নোঙর করা একটি স্থলবেষ্টিত রাষ্ট্র আর্মেনিয়ার বিরুদ্ধে আজারবাইজানের সামরিক শত্রুতার সূচনা হয়েছে। যুদ্ধবিরতি হলেও এখনো বিরাজ করছে উত্তেজনা। একই দিক নির্দেশ করে আরেকটি অর্থবহ ঘটনা। সেটা হলো—অমীমাংসিত আঞ্চলিক বিরোধের জন্য কিরগিজস্তানের বিরুদ্ধে তাজিকিস্তানের আক্রমণ। মধ্য এশিয়ার উভয় রাষ্ট্রই যৌথ নিরাপত্তা চুক্তি সংস্থা (CSTO) এবং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (SCO) অন্তর্গত। ভূরাজনৈতিক কারণে শেষ পর্যন্ত তারা ইউক্রেন যুদ্ধের আগুনে উত্তাপ পেতে পারে। 

এদিকে মস্কো ও কিয়েভে রাজনৈতিক সমস্যা গভীরতর হচ্ছে। রাজনীতি চালিয়ে যাওয়ার চেয়ে যুদ্ধের গুরুত্ব যেন অনেক বেশি। সান জু-এর মতে, যুদ্ধ রাষ্ট্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ এটি এমন এক পথ দেখায় যা হয় পার্থিব গৌরব অথবা সম্পূর্ণ ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। এভাবে উচ্চ স্তরের জাতীয় নিরাপত্তা খোঁজার প্রয়োজনে ও একই সঙ্গে রাশিয়ার ঐতিহ্যবাহী সাম্রাজ্যবাদের প্রতিধ্বনি তুলে ক্রেমলিন একটি বিপজ্জনক জুয়া খেলা শুরু করেছে। 

ইউক্রেনে রাশিয়ান বাহিনীর বিজয় আপাতত অধরাই মনে হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে, মস্কোর কট্টরপন্থিরা যুদ্ধের অগ্রগতির অভাবে অসন্তুষ্ট। তাদের মধ্যে কেউ কেউ দৃশ্যত এটা বিশ্বাস করেন যে, যুক্তিসঙ্গত সাফল্য অর্জনের জন্য আরও আক্রমণাত্মক পদ্ধতি অবলম্বন করা প্রয়োজন। যুদ্ধের স্ফুলিঙ্গ অপ্রত্যাশিতভাবে রাশিয়ার মাটিতেও পৌঁছাতে পারে। যেমন—গাড়ি বিস্ফোরণে ইউরেশীয়বাদের প্রধান তাত্ত্বিক আলেকজান্ডার দুগিনের কন্যা দারিয়া দুগিনের মৃত্যুর ঘটনায় তা প্রমাণিত হয়। এই দার্শনিকের হাইব্রিড ভূরাজনৈতিক মডেল বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে রাশিয়ান পররাষ্ট্রনীতির আচরণকে বদলে দিয়েছে। 

ক্রেমলিন ইউক্রেনের জাতীয়তাবাদী শক্তিকে অবমূল্যায়ন করেছিল। ইউক্রেনের শহরগুলোতে রাশিয়ান সেনাদের মুক্তিদাতা হিসাবে অভিবাদন জানানো হয়নি। এর পরিবর্তে তারা রাশিয়ানদের প্রতিরোধে এগিয়ে এসেছেন। মস্কো এমন এক প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছে যেখান থেকে উত্তরণের কোনো সহজ উপায় নেই। অবশ্য জর্জ ফ্রিডম্যান এবং সের্গেই কারাগানভের মতো ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকরা স্বীকার করেছেন, পুতিন হারতে পারেন না। এর অর্থ এই যে ইউক্রেনে বিজয় লাভের ব্যাপারে তিনি যে ধারণা করেছিলেন তা নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত বা পরিবর্তন করা দরকার। ক্রেমলিন ইউক্রেনীয় রাজ্যের মূল স্নায়ুকেন্দ্রগুলোতে আঘাত করার চেষ্টা করতে পারে, যেমন—সরকারি ভবন, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, লজিস্টিক হাব, অবকাঠামো ইত্যাদিতে এবং আসন্ন শীতকে কাজে লাগাতে পারে—যাতে ইউরোপীয় ভোক্তা বাজারের জন্য জ্বালানি সরবরাহ সর্বোচ্চ পর্যায়ে বাধাগ্রস্ত হয়। অন্যথায়, এই ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে ব্যর্থতার ফলে রাশিয়ায় অস্থিরতা বেড়ে যাবে এবং রাশিয়ার জাতীয় শক্তির দ্রুত পতন ঘটবে। এই ধরনের পরিস্থিতিতে, রাশিয়ান ফেডারেশন আরো কঠোর সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে। 

যদি মস্কো সিএসটিও-এর অধীনে নিরাপত্তা গ্যারান্টি বা ইউরেশিয়ান ইকোনমিক ইউনিয়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রণোদনা প্রদান করতে অক্ষম হয়, তাহলে সেই বহুপাক্ষিক কাঠামোর বিশ্বাসযোগ্যতা অপূরণীয়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যদি রাশিয়ানদের আর ভয় না করা হয়, তাহলে ক্রেমলিনের মিত্রদের যেমন—বেলারুশ, আর্মেনিয়া, কিছু মধ্য এশিয়ার প্রজাতন্ত্র এবং বিচ্ছিন্ন রুশপন্থি ছিটমহল তথা ডনবাস, আবখাজিয়া, দক্ষিণ ওসেটিয়া ও ট্রান্সনিস্ট্রিয়াদের নিজেদের মতো চলতে হবে। অন্যত্র রাশিয়ান অংশীদারদের যেমন—সিরিয়া, সার্বিয়া, নিকারাগুয়া, ভেনিজুয়েলা, কিউবাকে পৃষ্ঠপোষকতার নতুন উত্স খুঁজতে হবে বা পশ্চিমাদের সঙ্গে তৈরি করতে হবে এরকম সহাবস্থান।

রাশিয়ার কী সর্বনাশ ঘটছে? ঐতিহাসিক রেকর্ড দ্বারা বিচার করলে এটা বলা কঠিন। রাশিয়ানরা প্রকৃতপক্ষে ক্রিমিয়ান যুদ্ধ, রুশ-জাপানি যুদ্ধ, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও ইউএসএসআর-এর পতনের মতো পর্বগুলোতে চরম পরাজয়ের সম্মুখীন হয়েছিল। তবুও তারা দীর্ঘদিন ধরে এই দৃষ্টিভঙ্গি লালন করে যে রাশিয়া বিপর্যয়ের পরেও তার শক্তিকে পুনরুজ্জীবিত করতে সক্ষম। এমনকি মঙ্গোল, টিউটনিক নাইটস, সুইডেন রাজ্য, নেপোলিওনিক ফ্রান্স ও নাসি জার্মানির মতো শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধেও তারা আপাতদৃষ্টিতে পরাজিত হয়েছে। তা সত্ত্বেও, একটি দুর্বল, কোণঠাসা এবং পুনর্গঠনবাদী রাশিয়া এখনো বিপজ্জনক হতে পারে। যদি রাশিয়ানরা অপরিবর্তনীয় ক্ষতির সম্মুখীন হয় এবং তারা মনে করে যে, তাদের হারানোর আর কিছুই নেই, তবে ক্রেমলিন কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের মতো অকল্পনীয় বিকল্পগুলোও বিবেচনা করতে পারে। এভাবে, রাশিয়ান ফেডারেশনের পতন সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তির চেয়েও জঘন্য হতে পারে। 

আপাতদৃষ্টিতে ক্রিমিয়া এবং ডনবাসসহ রাশিয়ানদের দখলকৃত ইউক্রেনীয় মাটির প্রতিটি ইঞ্চি পুনরুদ্ধার করা একটি চ্যালেঞ্জ। এজন্য প্রচুর অর্থ, অস্ত্র ও সেনার প্রয়োজন। উপরন্তু, যুদ্ধের কারণে ইউক্রেনের অর্থনীতি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বেকারত্ব, মুদ্রাস্ফীতি, অস্থির বিনিময় হার, লাখ লাখ ইউক্রেনীয়দের দেশত্যাগ, এবং টেকসই আর্থিক ভারসাম্যহীনতা এর প্রধান অন্তরায়। তাই বিদেশি অর্থপ্রবাহ ছাড়া দেশটির সার্বিক উত্তরণ সম্ভব হবে না। 
লেখক : আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, ভূরাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক। নিউজিল্যান্ডের ম্যাসি বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিফেন্স ও সিকিউরিটি স্টাডিজ বিভাগে পিএইচডি গবেষণারত

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন