শুক্রবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৫ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

বিপজ্জনক হইয়া উঠিতেছে কিশোর গ্যাং কালচার!

আপডেট : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৫:৩৬

রাজধানীতে দীর্ঘদিন ধরিয়া কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্যের কথা আমরা প্রায়শই লিখিয়া আসিতেছি। কিন্তু কিশোর গ্যাং কালচার এখন শুধু রাজধানীতেই সীমাবদ্ধ নহে, ইহা ক্রমেই ছড়াইয়া পড়িয়াছে সারা দেশে। সম্প্রতি ইত্তেফাকে প্রকাশিত একটি খবরে বলা হইয়াছে, লক্ষ্মীপুরে কিশোর গ্যাংগুলি বেপরোয়া হইয়া উঠিয়াছে। তাহাদের নেপথ্যে কলকাঠি নাড়িতেছে ‘বড় ভাইয়েরা’। বড় ভাই বলিতে বুঝায় এলাকার শীর্ষসন্ত্রাসী ও গডফাদারদের। তাহারা নিজেদের স্বার্থে এই সকল কোমলমতি শিশু-কিশোরকে খুনখারাবিসহ নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করিতেছে। যেহেতু তাহাদের বয়স ১৮ বত্সরের নিচে এবং আইন অনুযায়ী তাহাদের অপরাধের শাস্তি লঘু, তাই এই সুযোগ কাজে লাগাইয়া তাহাদের নানা অপরাধকর্মে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করা হইতেছে। এইভাবে তাহারা চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, যৌন হয়রানি, মাদক ব্যবসায়সহ বিভিন্ন অপরাধে জড়াইয়া পড়িতেছে। তাহারা হইয়া উঠিতেছে এলাকার ত্রাস।

লক্ষ্মীপুরের মতো মফস্সল এলাকায় কিশোর গ্যাংগুলি আধিপত্য বিস্তার, সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্ব, মাদক ও প্রেমঘটিত বিরোধের জেরে যেভাবে অহরহ সংঘর্ষে জড়াইয়া পড়িতেছে, তাহা উদ্বেগজনক। সম্প্রতি তাহারা তিন এসএসসি পরীক্ষার্থীকে কোপাইয়া ও পিটাইয়া আহত করিয়াছে। মোটরসাইকেলকে সাইড না দেওয়ায় রাস্তায় ফেলিয়া স্বামীসহ অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে লোহার রড ও লাঠি দিয়া পিটাইয়াছে। শুধু তাহাই নহে, সামান্য ‘তুই’ সম্বোধনকে কেন্দ্র করিয়া এক জন আরেক জনের উপর ঝাঁপাইয়া পড়িয়াছে এবং নাতিকে রক্ষা করিতে গিয়া ৭০ বত্সর বয়সি দাদা নিহত হইয়াছেন। তাহাদের ভয়ে অনেক ছাত্রী স্কুল-কলেজে গমন বন্ধ করিয়া দিয়াছে। লক্ষ্মীপুর শহর একটি উদাহরণ মাত্র। আসলে এই ধরনের কিশোর গ্যাংয়ের অস্তিত্ব এখন অন্যান্য জেলা শহরেও রহিয়াছে। অধিকাংশ কিশোর গ্যাংয়ের  সদস্যদের বয়স ১২ হইতে ১৭ বত্সর। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাহাদের থাকে একটি নির্দিষ্ট নাম ও লোগো। সেই নাম ও লোগো শরীরে ট্যাটু করা বা দেওয়ালে লিখনের প্রবণতা রহিয়াছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রহিয়াছে তাহাদের বিস্তর নেটওয়ার্ক। ক্ষেত্রবিশেষে তাহারা একই রকম জামাকাপড়, জুয়েলারি ও অলংকার পরিধান করিয়া থাকে। তাহারা ছুরি, রামদা, হকিস্টিক, বন্দুকসহ বিভিন্ন অস্ত্র ব্যবহার করিয়া থাকে। সমাজে বৈষম্য, দারিদ্র্য, পারিবারিক বিশৃঙ্খলা, একাকিত্ব, শিক্ষকের বঞ্চনা, খারাপ ফলাফল, সহপাঠীর বিদ্রুপ, হিরোইজম দেখানোর প্রবণতা, মাদকাসক্তি, অশ্লীল ও সহিংসতানির্ভর ছবি, আপত্তিকর ভিডিও গেম, ভিনদেশি কালচারসহ বিভিন্ন কারণে এই গ্যাং কালচারের উদ্ভব হইয়া থাকে। আগামী প্রজন্মকে অপরাধমুক্ত রাখিতে হইলে কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে এখন সামাজিক আন্দোলন জরুরি হইয়া পড়িয়াছে।

অবশ্য কিশোর গ্যাং কালচার বিশ্বে নূতন নহে। আঠারো শতকের শেষে ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার শহরে কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণের জন্য স্যালফোর্ড ল্যাডস ক্লাব নামে ফুটবল ক্লাব প্রতিষ্ঠা করিয়াছিল গ্রোভস পরিবার, যাহা আজ বিশ্বব্যাপী ম্যানচেস্টার সিটি ফুটবল ক্লাব নামে অভিহিত। স্কাউট আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা রবার্ট ব্যাডেন পাওয়েলের হাত ধরিয়া এই ক্লাব সামনে আগাইয়া যায়। ১৯৭০ সাল হইতে বিশ্বব্যাপী গ্যাং কালচারে ব্যাপক সহিংসতা প্রবেশ করে। বাংলাদেশে ২০১৭ সালে উত্তরায় আদনান হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে কিশোর গ্যাংয়ের ভয়াবহ রূপ ধরা পড়ে। কেবল রাজধানীতেই এখন অন্তত ৭০ হইতে ৭৫টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রহিয়াছে। অতএব, সময় থাকিতেই তাহাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে। এই জন্য কিশোর গ্যাংগুলির যাহারা পৃষ্ঠপোষক, তাহাদের আগে গ্রেফতার করিতে হইবে। বিভিন্ন স্কুল-কলেজে এই ব্যাপারে সতর্কতা জারি করা প্রয়োজন। পাড়ায় পাড়ায় ও মহল্লায় মহল্লায় যেই সকল স্থানে তাহারা আড্ডা দেয় ও আসর জমায়, সেইখানে পুলিশ ও র্যাবের নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করিতে হইবে। এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি ও মুরুব্বিদের ঐক্যবদ্ধভাবে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করিতে হইবে। এই সব অপরাধী ও অভিযুক্ত কিশোরদের রাজনৈতিক মিটিং-মিছিলসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহারের প্রবণতা বন্ধ করিতে হইবে। তাহাদের জন্য বাড়াইতে হইবে কিশোর সংশোধন কেন্দ্রের সংখ্যা। ইহা ছাড়া দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন এলাকা পর্যায়ে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের আওতা বাড়াইতে হইবে। শিশু-কিশোরদের জন্য সৃজনশীল কাজের পরিবেশ যত বেশি তৈরি করা যাইবে, ততই আমাদের জন্য মঙ্গল।

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন