শুক্রবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৫ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

দুই অধিদপ্তরের টানাপড়েন

১০ হাজার শিক্ষার্থী বৃত্তি থেকে বঞ্চিত

আপডেট : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৭:২৮

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পৃথক দুটি দপ্তর ‘মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর’ ও ‘মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর’-এর মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং কর্মকর্তাদের উদাসীনতার কারণে অন্তত ১০ হাজার শিক্ষার্থী বৃত্তিবঞ্চিত রয়েছে। এসব শিক্ষার্থীরা এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করছে।  সরকারপ্রদত্ত বোর্ড বৃত্তি উত্তোলনের জন্য অন্য সবার মতো অনলাইনে আবেদন করেন আফরাজ আল মাহমুদ। অনলাইনে আবেদনের দীর্ঘ জটিলতা পেরিয়ে আবেদনের কয়েক মাস পর জানতে পারেন এ শিক্ষার্থীর অ্যাকাউন্টে বৃত্তির টাকা আসেনি। তার জন্য বারবার ধরনা দিতে থাকেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনে। কিন্তু তাতে কোনো কাজ হচ্ছে না দেখে যান মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরে, পরে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরে। তাতেও কাজ হচ্ছে না দেখে যান শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবের সঙ্গে দেখা করতে। সচিবের সঙ্গে দেখা করতে না পেরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের এ শিক্ষার্থী বৃত্তির টাকা চেয়ে চিঠি দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান বরাবর। তারপরও গত তিন বছরে কোন অর্থ পাননি এ শিক্ষার্থী।

আফরাজের মতো সারা দেশে মাদ্রাসা বোর্ডের এমন ১০ হাজার শিক্ষার্থী বৃত্তি পাচ্ছেন না। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের মধ্যে টানাপড়নে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। 

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, এতদিন পর্যন্ত কলেজ পর্যায়ের সরকার প্রদত্ত বোর্ড বৃত্তি ‘মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) প্রদান করত। তখন ম্যানুয়াল পদ্ধতি ছিল। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে যেসব তালিকা পাঠানো হতো সে তালিকা অনুসারে অর্থ ছাড় দেওয়া হতো। কিন্তু অনলাইন জি টু পি পদ্ধতিতে অর্থ ছাড় দেওয়ার সময় মাউশি শুধু সাধারণ শিক্ষার শিক্ষার্থীদের অর্থ ছাড় দেয়। মাউশি থেকে মাদ্রাসা অধিদপ্তর পৃথক হয়ে যাওয়ার কারণে সমস্যা তৈরি হয়। কর্মকর্তাদের মধ্যে তৈরি হয় উদাসীনতা। মাউশি অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা মাদ্রাসা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের উদাসীনতা ও অনাগ্রহকে দায়ী করেন। বৃত্তিপ্রাপ্ত মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের বৃত্তি কোন খাত থেকে যাবে সে বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত না হওয়ায় মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের জন্য অর্থ ছাড় দিতে অস্বীকার করে অধিদপ্তরটি। মাউশি অধিদপ্তর মাদ্রাসা বোর্ড থেকে সাধারণ শিক্ষায় যাওয়া শিক্ষার্থীদের, সাধারণ শিক্ষা থেকে মাদ্রাসা শিক্ষায় যাওয়া   শিক্ষার্থীদের বিষয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করতে অস্বীকার করছে।

মাউশির এক কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯-২০ ও ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের ৬ হাজার ৬৪৬ জন শিক্ষার্থীর বৃত্তি আটকা পড়েছে। ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষেরও একই অবস্থা। এছাড়া ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে তিন শিক্ষাবর্ষের বিভিন্ন বর্ষের শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন মেয়াদি বৃত্তি আটকে আছে। সব মিলে এ সংখ্যা ১০ হাজারের বেশি হবে।

আফরাজ আল মাহমুদ বলেন, আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে রেজিস্ট্রার ভবন থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় পর্যন্ত গিয়েছি। কিন্তু কোন সমাধান পাইনি। আমরা মাদ্রাসা অধিদপ্তরে পর্যন্ত গিয়েছিলাম। সেখানে বৃত্তির দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন উপ-পরিচালক (অর্থ) মোহাম্মদ শামসুজ্জামান। তিনি আমাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেন। তিনি বলেন, তোমরা এখন মাদ্রাসায় নেই, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। এখানে তোমাদের কোন কাজ নেই। আমরা সেখান থেকে চলে আসি মাউশিতে। মাউশি থেকে পাঠানো হয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে। মন্ত্রণালয়ের সচিবও আমাদের সঙ্গে দেখা করেননি। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বরাবর আমরা চিঠি দেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সূত্র জানায়, ২০২০ সালে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যে তালিকা চাওয়া হয়েছে সেখানে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্ত করে ডাটা পাঠানো হয়। কিন্তু পরে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের ডাটা আলাদা করে পাঠানোর জন্য বলা হয়। সে হিসেবে ফের ডাটা পাঠানো হয়। সে বছর মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দেওয়া হয়নি। পরের বছর মৌখিকভাবে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের ডাটা দিতে না করা হয়েছে। চলতি বছর অর্থাত্ ২০২২ সালে লিখিতভাবে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের তালিকা পাঠাতে না করা হয়েছে।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান বলেন, আমাদের শিক্ষার্থীদের একটি অংশ বৃত্তি পাবে আরেকটি অংশ বৃত্তি পাবে না বিষয়টি বেমানান। আমি মাদ্রাসা বোর্ডের ডিজির সঙ্গে কথা বলেছি। মাদ্রাসা বোর্ড নতুন হয়েছে, তাদের ওখানে কি একটা বিষয়ে সমন্বয় হয়নি যার কারণে এ ঘটনা ঘটেছে। তারা আমাকে আশ্বাস দিয়েছে খুব শিগিগরই তারা বিষয়টির সমাধান করবে।

মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শামসুজ্জামান বলেন, এ বিষয়ে গত আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মাদ্রাসা থেকে বৃত্তি পাওয়া শিক্ষার্থী সাধারণ শিক্ষায় গেলেও তাদের বৃত্তির টাকা দেবে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর। আর সাধারণ শিক্ষার কোন শিক্ষার্থী বৃত্তি পেলে এবং ঐ শিক্ষার্থী কোন মাদ্রাসার উচ্চ শিক্ষায় ভর্তি হলে তার বৃত্তি দেবে মাউশি অধিদপ্তর।

তিনি জানান, ঐ সভায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের কোন প্রতিনিধি এবং আইবাসের প্রতিনিধি না থাকায় সভা মুলতুবি রাখা হয়। পরবর্তী সময়ে সভা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে তিনি জানান। এই সভা কবে হবে এ বিষয়ে কোন তথ্য জানেন না এই কর্মকর্তা।

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (অর্থ) অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম খান বলেন, একই মন্ত্রণালয় হলেও সচিব ভিন্ন, অধিদপ্তর ভিন্ন। এ কারণে বৃত্তি দিতে সমস্যা হচ্ছে। তবে কীভাবে দেওয়া যায়, একটা উপায় বের করা হবে। কেন এত দেরি হচ্ছে বা আর কতদিন লাগবে এমন প্রশ্নে তিনি কোন জবাব দিতে পারেননি।

ইত্তেফাক/জেডএইচডি