বুধবার, ০৫ অক্টোবর ২০২২, ২০ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

প্রতারণার ফাঁদে এমপি পুলিশসহ ৩০০ মানুষ

একই গাড়ি বারবার বিক্রি করে কোটি কোটি টাকার মালিক ইউপি চেয়ারম্যান

আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৪:৫৮

কুমিল্লা জেলার মেঘনা থানার ২ নম্বর মানিকাচর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. জাকির হোসেনের গাড়ি ব্যবসার ফাঁদে পা দিয়ে হাজার কোটি টাকা খুইয়েছেন এমপি-পুলিশসহ তিন শতাধিক মানুষ। প্রতারণার এই টাকা দিয়ে জাকির হোসেন নিজে কিনেছেন গাড়ি-বাড়ি-জমি, ছেলেকে পাঠিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রে। ২১ সেপ্টেম্বর রাতে কুমিল্লা জেলার মেঘনা থানা এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। এ সময় তার কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় দুটি প্রাইভেট কার।

ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে মনোনয়ন পাওয়ার জন্য তার খরচ হয়েছিল বিপুল অঙ্কের টাকা। নির্বাচনে মনোনয়ন পেতে উপহার দিতে হয়েছিল একটি প্রাডো গাড়ি। জেতার পরে নির্বাচনের সেই খরচ তোলার জন্য অভিনব প্রতারণার জাল বিস্তার করেন ইউপি চেয়ারম্যান। গতকাল শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে জাকির চেয়ারম্যানের প্রতারণার বিষয়ে কথা বলেন ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার গোয়েন্দা পুলিশপ্রধান হারুন-অর-রশিদ। তিনি বলেন, রেন্ট-এ-কারের ব্যবসার আড়ালে ভয়ংকর প্রতারণার ফাঁদ পেতেছিলেন জাকির চেয়ারম্যান। তিনি দুই-তিন প্রক্রিয়ায় প্রতারণা করে হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

তিনি বলেন, জাকির বন্দর থেকে কম দামে গাড়ি কিনে দেওয়ার কথা বলে বিভিন্ন লোকের সঙ্গে চুক্তি করে টাকা নেন। তারপর সেই গাড়ি রেন্ট-এ-কারের মাধ্যমে মাসিক ভাড়ায় পরিচালনার চুক্তি করেন। একই গাড়ি ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে চুক্তি করেন। আবার একই রেজিস্ট্রেশন নম্বরের গাড়ি একাধিক দলিলের মাধ্যমে বিক্রি করেন।

শুধু তা-ই নয়, কারো সঙ্গে শুধু ইঞ্জিন নম্বর দিয়ে মাসিক কিস্তি পরিশোধের শর্তে চুক্তি করেন। কিছুদিন কিস্তি পরিশোধও করেন। পরে কিস্তি দেওয়া বন্ধ করে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাত্ করেন। এ ছাড়া আগের বিক্রি করা গাড়ি কম দামে মালিকানা হস্তান্তরের লোভ দেখিয়ে একাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাত্ করেন।

অতিরিক্ত কমিশনার হারুন বলেন, গত ৭ সেপ্টেম্বর ডিএমপির মুগদা থানায় একটি প্রতারণার মামলা দায়ের করা হয়। পরে ডিবি তেজগাঁও বিভাগের তেজগাঁও জোনাল টিম মামলাটির ছায়া-তদন্ত শুরু করে। জিজ্ঞাসাবাদে জাকির পুলিশকে জানিয়েছেন, নির্বাচনে তার অনেক টাকা খরচ হয়েছে। এ টাকা তোলার তিনি এ কাজ করতেন। পাশাপাশি ঢাকা শহরের অনেক প্লট এবং বাড়িও কিনেছেন, ছেলেকে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়ে দিয়েছেন। আগামী নভেম্বরে তার যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল।

তিনি বলেন, ‘অনেক ভুক্তভোগী আমাদের কাছে অভিযোগ করেছে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে আমরা তাকে  গ্রেফতার করেছি। আমরা সব বিষয়ে পর্যালোচনা করছি। তাকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করব এবং যাদের কাছ থেকে প্রতারণা করে টাকা নিয়েছিলেন সেগুলো ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করব। প্রয়োজনে সিআইডিতে মামলা হস্তান্তর করব।’

জাকির দীর্ঘদিন ধরে শত শত মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছে জানিয়ে হারুন-অর-রশিদ বলেন, ‘আগেও তাকে  গ্রেফতার করার জন্য আমরা উদ্যোগ নিয়েছিলাম। অনেকেই তার জন্য সুপারিশ করেছিলেন। বলেছেন তাকে  গ্রেফতার করা হলে টাকা পাওয়া সম্ভব হবে না। তিন মাস তাকে সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। এ সময় এক-দুই জন ব্যক্তি ছাড়া আর কাউকে কোনো টাকা পরিশোধ করেননি তিনি। তারপর বিভিন্ন জনপ্রতিনিধি, সরকারি কর্মকর্তা, পুলিশের লোকজনসহ বিভিন্ন বড় বড় পর্যায়ের লোকদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলতেন। তাদেরও লভ্যাংশ দেওয়ার কথা বলে টাকা নিতেন। এ সুযোগে তাদের সঙ্গে ছবি ও সেলফি তুলে রাখতেন। তারা টাকা চাইলে বারবার সময় নিতেন। এর মধ্যেই এসব ছবি দেখিয়ে সাধারণ লোকজনকে বলতেন যে, আমার সঙ্গে হাইপ্রোফাইল লোকজন কাজ করেন। এভাবে সবার সঙ্গে বিশ্বাস স্থাপন করতেন।’

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, জাকির প্রতারিত ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে পুরো টাকা নিয়ে ডাউন পেমেন্টে গাড়ি কিনতেন। আবার ব্যাংক থেকে গাড়ির বিপরীতে ক্রেতাকে না জানিয়ে ঋণ নিতেন।

ইতিমধ্যে জাকিরের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় প্রতারণার মামলা হয়েছে। পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ প্রক্রিয়াধীন আছে বলে জানান অতিরিক্ত কমিশনার হারুন-অর-রশিদ।

ইত্তেফাক/এএইচপি