সোমবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২২, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

শিক্ষাভাবনা : দিল্লি মডেল

আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০১:২৭

দিল্লি শহরের বাইরে আনন্দবিহার রেলস্টেশনের পার্শ্বে একটা বিদ্যালয় আছে। এই রকম উপশহরের শিক্ষকেরা সাধারণত দূরের কোনো শহর থেকে বিদ্যালয়ে আসেন। এই বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা পার্শ্ববর্তী মিরাট শহর থেকে আসতেন। দিল্লি থেকে মিরাটগামী একটা ট্রেন বিকাল ৪টা ৩০ মিনিটে আনন্দবিহার রেলস্টেশনে থামত। এদিকে বিদ্যালয়ের সেকেন্ড শিফটের ক্লাস ১টা ৩০ মিনিট থেকে ৬টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত। তাতে কী হয়েছে? শিক্ষকরা চারটা বাজলেই ক্লাস ফেলে সেই ট্রেনে উঠে বাড়ি চলে যান।

শিক্ষকদের অসময়ে বাড়ি চলে যাওয়ায় ছাত্রদের পড়ালেখার অবস্থা সঙ্গীন। বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির (এসএমসি) সদস্যরা এই সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিলেন। তারা বিদ্যালয়ের মূল প্রবেশপথে একটা লোহার বড় গেট লাগালেন। আর কিনলেন বড় একটা তালা। এরপর তিনটা বাজলেই সদস্যরা বিদ্যালয়ের প্রবেশপথে তালা লাগিয়ে ভেতরে গার্ড রুমে পাহারায় বসলেন। শিক্ষকদের আর ছাত্রদের অসময়ে বিদ্যালয় ত্যাগ বন্ধ হলো। কিছুদিনের মধ্যেই বিদ্যালয়ের চেহারা বদলে গেল। তালা লাগিয়ে শিক্ষকদের আটকানো খুব মানবিক আচরণ নয়। কিন্তু এই ঘটনায় মূল লক্ষণীয় বিষয়টি হচ্ছে বিদ্যালয়ের পাঠদান বিষয়ে অভিভাবক এবং এসএমসির উদ্বেগ। ছাত্রদের পড়াশোনা যাতে বিঘ্নিত না হয়, সেজন্য তারা কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। দিল্লির শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এই রকম চমকপ্রদ কিছু পরিবর্তন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রত্যক্ষ করা গেছে। সাধারণত একটা বড় শহরের শিক্ষাব্যবস্থায় দুটি বৃহৎ ধারা লক্ষ করা যায়। এক. অসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান—যেখানে শহরের ধনিক শ্রেণির সন্তানেরা পড়াশোনা করেন। দুই. সরকারি প্রতিষ্ঠান—সাধারণ শ্রেণির মানুষদের সন্তানদের জন্য। দুই শ্রেণির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাহ্যিক এবং অন্তর্গত ব্যবধান বোদ্ধাদের দৃষ্টিতে প্রকট হয়েই ধরা পড়ে। 

একটা সরকারি বিদ্যালয়ের কথা ভাবলে খুব চলতি একটা চিত্র মানসপটে ভেসে ওঠে। কিছু বিদ্যালয়ের দৃশ্য আলাদা। কিন্তু অনেক বিদ্যালয়েই ভালো টয়লেট নেই। নোনাধরা দেওয়াল আর ক্লাসরুমগুলোর পলেস্তারা খসে পড়ছে। জানালার কাচভাঙা। ফ্যান নেই, থাকলেও ঘুরছে না। বেঞ্চগুলো ভেঙে পড়ার অপেক্ষায়। শিক্ষকেরা সময়মতো আসছেন না। ছাত্রদের অবস্থাও তথৈবচ। ২০১৫ সালে আম আদমি পার্টি দিল্লিতে নির্বাচনের সময় কয়েকটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তার মধ্যে সরকারি বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষাব্যবস্থার দুরাবস্থা পরিবর্তন ও মানোন্নয়ন অন্যতম। জয়ী হওয়ার পরপরই তারা সেলক্ষ্যে কাজ শুরু করেন। এরই মধ্যে দিল্লির শিক্ষার চিত্র তারা পালটে দিয়েছেন বলা যায়। শিক্ষা সংস্কারে দিল্লি সরকারের সাফল্যের গল্প এখন ভারত জুড়ে।

দিল্লি সরকার ‘শিক্ষা প্রথমে’ স্লোগানে নতুন শিক্ষাব্যবস্থা চালু করে ২০১৫ সালে। উপমুখ্যমন্ত্রী তথা শিক্ষামন্ত্রী মনীশ শিসোদিয়ার নেতৃত্বে শিক্ষা সংস্কারের কাজ শুরু হয়। সরকার মোট বাজেটের ২৫ শতাংশের মতো শিক্ষাখাতে খরচের সিদ্ধান্ত নেয়। বাজেটের বড় অংশ খুব পরিকল্পিতভাবে ব্যয় করে ইতিমধ্যে দৃশ্যমান পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। মোটা দাগে দিল্লি সরকারের এই শিক্ষা সংস্কারের উদ্যোগকে পাঁচটি ধাপে বর্ণনা করা যেতে পারে। প্রথমত, তারা সরকারি স্কুলগুলোর কাজকর্মে স্থানীয় অংশীজনকে ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত করেছে। বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির ধারণাটি বেশ পুরোনো। কিন্তু পূর্বে তা খুব কার্যকর ছিল না। দিল্লির বিদ্যালয়গুলোতে এসএমসির কার্যক্রম বর্তমানে খুবই দৃশ্যমান। সেখানে শিক্ষকদের সঙ্গে অভিভাবকদের নিয়মিত বৈঠক হচ্ছে। এসব বৈঠকের কথা সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ও এফএম রেডিওতে প্রচার করা হচ্ছে। স্কুল ম্যানেজিং কমিটিকে মনোযোগী করা হয়েছে পাঠদানের দিকে। এসএমসিকে থোক বরাদ্দ হিসাবে ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা দেওয়া হচ্ছে। এই টাকা তারা প্রতিষ্ঠানের জরুরি প্রয়োজনে খরচের স্বাধীনতা পাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনে এখন ম্যানেজিং কমিটি চাইলে খণ্ডকালীন শিক্ষকও নিয়োগ দিতে পারে। শিক্ষা খাতে সংস্কারের দ্বিতীয় দফায় নজর দেওয়া হয় বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়নে। উপমহাদেশ জুড়ে স্কুল ভবনগুলোর একটা সমস্যা হচ্ছে, সেগুলো শিক্ষার্থীদের মুগ্ধ করে না, আকর্ষণ করে না। শ্রেণিকক্ষে আলো-বাতাসের অভাব থাকে। টয়লেটগুলো অপরিচ্ছন্ন। ভালো লাইব্রেরি নেই। খেলাধুলাকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। দিল্লি সরকার বিদ্যমান বিদ্যালয়ভবনগুলোকে যেন নতুন রূপ দিয়েছে। এসএমসি এবং অভিভাবকগণ বিদ্যালয় সংস্কারে প্রাপ্ত বরাদ্দ যথাযথভাবে ব্যয় হচ্ছে কিনা, তার খোঁজখবর রাখছেন। ফলে বরাদ্দে কোনো নয়-ছয় হচ্ছে না। আর এতেই বিদ্যালয়ের চেহারা পালটে গেছে। বিদ্যমান বিদ্যালয়গুলোতে তারা প্রায় ৮ হাজার আধুনিক শ্রেণিকক্ষও বাড়িয়েছে। বিদ্যালয়ের টয়লেটে এমনকি গ্রানাইট পাথরও লাগানো হয়েছে কোথাও কোথাও।

তৃতীয়ত, স্কুলে বছর বছর অযৌক্তিকভাবে বেতন বাড়ানো বন্ধ করা হয়েছে। প্রাইভেট বিদ্যালয়গুলোতে ইচ্ছামাফিক বেতন বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্য ঋণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

চতুর্থত, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণকে আধুনিক করা হয়েছে। দিল্লির ষোলো হাজারের অধিক শিক্ষককে সর্বোচ্চ মানের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। শিক্ষকদের মধ্যে যারা ভালো; পুরস্কার ও প্রণোদনা হিসাবে তাদের কেমব্রিজ, ফিনল্যান্ড, সিঙ্গাপুর এবং আইআইএম-এ প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। শ্রেষ্ঠ শিক্ষকদের ছবির বিলবোর্ড তৈরি করে শহরের বড় রাস্তার মোড়ে টানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। একজন শিক্ষকের কাজের মূল্যায়নে অন্য শিক্ষকদের মধ্যেও ভালো কাজের আগ্রহ এবং প্রতিযোগিতা বাড়ছে।

পঞ্চমত, যুগ যুগ ধরে চলে আসা শিক্ষাদানের পদ্ধতি পালটানো হয়েছে। শিক্ষাকে আকর্ষণীয় ও চিত্তাকর্ষক করার জন্য সেরা গবেষকদল কারিকুলাম ও পাঠদানপদ্ধতি আধুনিকায়নে মনোনিবেশ করেছে। শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়নে অনেক ধরনের সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষার পাঠ্যসূচিতে গাণিতিক জ্ঞান এবং উদ্যোক্তাসুলভ বৈশিষ্ট্য গড়ে তোলায় বাড়তি গুরুত্ব পেয়েছে। বিদ্যালয়ে ‘হ্যাপিনেস কারিকুলাম’ চালু করা হয়েছে। শিক্ষার্থীরা মানসিক চাপ থেকে মুক্তির উপায় শিখছে। এসবের ফলে আগের চেয়ে ২১ থেকে ২৫ শতাংশ ছাত্রছাত্রী সরকারি বিদ্যালয়ে বেশি ভর্তি হচ্ছে। সরকারি স্কুলের চাহিদা বেসরকারি স্কুলের থেকে বেড়েছে। পরীক্ষার ফলাফলের ছবিও পুরোপুরি পালটে গিয়েছে। গেল পাঁচ বছরে দিল্লির সরকারি বিদ্যালয়ে পাসের হার শতভাগ, যা সারা ভারতে সেরা। লক্ষণীয়, দিল্লির শিক্ষার এই গুণগত পরিবর্তনের পেছনে খুব যুগান্তকারী কোনো উদ্ভাবন নেই। তারা বিদ্যমান ব্যবস্থাকেই ভিত্তি ধরে এগিয়ে গেছেন। যেমন : শিক্ষকদের আত্মমর্যাদাকে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটিকে কার্যকর করা হয়েছে। তাদের আর্থিক স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে এবং অভিভাবকদের সচেতন করা হয়েছে। সব বিদ্যালয়ের এসএমসির সদস্যদের নিয়ে একটা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খোলা হয়েছে। যে কোনো সিদ্ধান্ত বা ভালো উদাহরণ তারা সবাই মুহূর্তেই জেনে যাচ্ছেন। এরপর নিজের প্রতিষ্ঠানে তা বাস্তবায়ন করছেন। এভাবে খুব ছোট ছোট সংস্কারের একটা বড় ফল তৈরি করেছে দিল্লি মডেল।
উপমহাদেশের অন্যান্য দেশের ন্যায় বাংলাদেশের শিক্ষাপদ্ধতিতেও গুণগত পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে। আমাদের প্রায় ৬৫ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ শিক্ষক কর্মরত আছেন। এত বিপুল পরিমাণের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তদারকি করা কেবল স্থানীয় প্রশাসন আর উপজেলা শিক্ষা অফিসের গুটিকয় কর্মকর্তার পক্ষে প্রায় অসম্ভব। বিদ্যালয়ের তদারকি আর মানোন্নয়নে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সক্রিয় করার বিকল্প নেই। আমাদের বিদ্যালয়ের এসএমসিকে আর্থিক ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে আরো কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া যায়। বিদ্যালয়ভবনগুলো বাহ্যিকভাবে পরিবর্তনের অপেক্ষায়। শিক্ষা কারিকুলামকে কীভাবে শিক্ষার্থীদের জন্য আরো সহজবোধ্য এবং আনন্দদায়ক করা যায়, তা নিশ্চয়ই ভেবে দেখার অবকাশ আছে। শিক্ষকদের আধুনিক প্রশিক্ষণে প্রশিক্ষিত করা ব্যতীত ভালো পাঠদান আশা করা যায় না। শিক্ষা একটি সদাপ্রবহমান প্রক্রিয়া। অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের অভিযোজন শিক্ষাকে সহজতর করে। আমাদের গাইবান্ধা জেলার শিবরাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় একসময় বহুল আলোচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল। ভারতের দিল্লি মডেলের অনুকরণে না হোক, আমাদের দেশীয় অভিজ্ঞতায় শিক্ষাব্যবস্থায় উপযুক্ত পরিবর্তনের সূচনা সময়ের দাবি।
লেখক : গল্পকার, প্রাবন্ধিক

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন