বুধবার, ৩০ নভেম্বর ২০২২, ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

অন্ধ থাকিলে প্রলয় বন্ধ হইবে না

আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০১:৪৫

পুলিত্জার জয়ী আমেরিকান সাংবাদিক মেগ গ্রিনফিল্ড বলিয়াছিলেন যে, খুব বেশি কথা বলা, খুব তাড়াতাড়ি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা এবং খুব বেশি আত্মসন্তুষ্টি লইয়া চলিলে উহা দুর্যোগ ডাকিয়া আনে। গ্রিনফিল্ডের কথার আলোকে আমরা দেখিয়াছি, বাঙালি জাতি খুব বেশি কথা বলে, অতি দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিতে ব্যস্ত থাকে এবং অল্পতেই আত্মতৃপ্তিতে ভোগে। যদিও আত্মতৃপ্তিরও প্রয়োজন রহিয়াছে। কারণ, আত্মতৃপ্তির মাধ্যমে আমাদের শরীরে অক্সিটোসিন হরমোনের নিঃসারণ ঘটে। ফলে আমরা সুখানুভূতি লাভ করি; কিন্তু আমরা যাহা লইয়া আত্মসুখ অনুভব করি, তাহার নেপথ্যে শক্ত ভিত্তি রহিয়াছে কি না—তাহা তলাইয়া দেখি না। গর্ব-অহংকার ও আত্মসন্তুষ্টির রহিয়াছে তাৎপর্যপূর্ণ কিছু নেতিবাচক দিক। যাহার লক্ষ্য যত ছোট, তাহারই সন্তুষ্টি অধিক। এই জন্য মনোবিশ্লেষকরা বলিয়া থাকেন—অসন্তুষ্টির মধ্যেই রহিয়াছে উত্তুঙ্গ সাফল্যের বীজ। তৃপ্তিলাভ মানে যবনিকা পতন। দ্য এন্ড। বিখ্যাত অণুজীববিজ্ঞানী জ্যাক মনোডও বলিয়াছেন, বিজ্ঞানে আত্মতৃপ্তি হইল মৃত্যু। ব্যক্তিগত আত্মতৃপ্তি হইল বিজ্ঞানীর মৃত্যু। যৌথ আত্মতৃপ্তি হইতেছে গবেষণার মৃত্যু। বলা যায়, অস্থিরতা, উদ্বেগ, অসন্তুষ্টি, মনের যন্ত্রণা বিজ্ঞানকে নূতন পথ দেখায়। যত নূতন সমস্যা ততই নূতন নূতন সমাধান। সুতরাং সমস্যা লইয়া ভয় পাইবার কিছু নাই। সমস্যা হইল, আত্মতৃপ্তি লইয়া। আত্মতৃপ্তি আমাদের দুর্বল করে, ক্ষীণ-ক্ষুদ্র করে। 

আমরা দেখিতে পাই, তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশই অল্পতেই আত্মতৃপ্তিতে ভোগে। উন্নয়নশীল বিশ্বের কোথাও কোথাও যতটুকু উন্নয়নচিত্র দেখিতে পাওয়া যায়, অনেকেই ইহাকে আত্মতৃপ্তির সহিত ইতিবাচকভাবে দেখিতে চাহেন; কিন্তু অবকাঠামোই কি সকল কিছু? উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, উপজেলা-ইউনিয়ন পর্যায়েও আজকাল সুন্দর দালানের হাসপাতাল তৈরি হইয়াছে; কিন্তু সেইখানে কি ঠিক মতো চিকিৎসা মেলে? ডাক্তারকে কি নিয়মমাফিক পাওয়া যায়? ডাক্তার দেওয়া হইলেও তাহারা কি সেইখানে থাকেন? তৃতীয় বিশ্বের যেই সকল দেশ আত্মতৃপ্তির আনন্দে আতশবাজি ফোটায়, তাহারা নিশ্চয়ই জানেন, জনগণের মৌলিক জিনিস সকলের পূর্বে দিতে হইবে; কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশই জনগণের ন্যূনতম মৌলিক অধিকার মোটামুটিভাবে নিশ্চিত না করিয়াই আত্মতৃপ্তির গড্ডলিকায় গা ভাসায়। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে, মৌলিক প্রয়োজনের জিনিস না দিয়া এমন সকল খাতে উন্নয়ন বরাদ্দ দেওয়া হয়, যাহা সাধারণ জনগণের জীবনমানের মৌলিক সমস্যা দূর করিতে সহায়তা করে না। যদি কোনো এলাকার পানির লবণাক্ততা বাড়িয়া যায় এবং নিরাপদ খাবার পানির অভাব দেখা দেয়, যেই সমস্যাটি দেশের দক্ষিণাঞ্চলে ব্যাপক, সেই সকল এলাকায় উন্নয়নের প্রধান মৌলিক দিকগুলির একটি হইবে নিরাপদ পানি নিশ্চিত করা। কারণ, নিরাপদ পানি ব্যতীত মানুষ সুস্থভাবে বাঁচিতে পারে না। আমরা দেখিয়াছি কয়েক দশক পরপর বিশ্বে অপ্রত্যাশিতভাবে অর্থনৈতিক অস্থিরতার প্রবল ঝড় আসে। সেই ঝড়ে বৃহৎ রাষ্ট্রগুলি ভিতরে ভিতরে কাঁপিতে থাকে; কিন্তু উন্নয়নশীল বিশ্বের অনেক সাধারণ রাষ্ট্রই উহাকে প্রথম দিকে আমলেই লয় না। তাহারা প্রথম প্রথম এক ধরনের আত্মতৃপ্তিতে ভুগিতে থাকে; কিন্তু তাহারা কি জানে না, ভয়ের কারণকে ভয় না পাওয়াটাই অত্যন্ত ভয়ের? 

জগতে চিরকালই সমস্যা ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতেও নূতন নূতন সমস্যা আসিবে; কিন্তু সেই সমস্যাগুলিকে সঠিক ও সর্বোচ্চ সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় সমাধান না করিয়া যদি অকারণ আত্মতৃপ্তির ফানুস উড়ানো হয়, তাহা হইলে তো ঘোরতর বিপদ ঘনাইবে! আত্মতৃপ্তির ফানুস ফাটিয়া যাইতে সময় লাগিবে না। সুতরাং ইমান ও ধৈর্যের সহিত আমাদের প্রত্যেকের স্ব স্ব দায়িত্ব পালন করিতে হইবে। কথা বলিতে হইবে পরিমিত। কথা অধিক বলিলে মনের তৃপ্তি আসিতে পারে বটে, তবে ভুলও তাহাতে অধিক হইবে। ভিত্তিহীন আত্মসন্তুষ্টি আমাদের সাময়িকভাবে আনন্দ দিতে পারে; কিন্তু উহা বিদ্যমান বিপুল সমস্যার সমাধান আনিবে না কিছুতেই। অন্ধ থাকিলে তো প্রলয় বন্ধ হইবে না। সুতরাং চোখ খোলা রাখিয়াই আমাদের সকল ধরনের সমস্যাকে মোকাবিলা করিতে হইবে।

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন