বৃহস্পতিবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০২২, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের মুখোমুখি

আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০০:২০

বিলেতের সঙ্গে আমাদের সিলেটি মানুষের এত গল্প আছে যে, তা বলে শেষ করতে পারব না। যখন দেশে ছিলাম, যখন ছোট ছিলাম, আমার তিন মামা বিলেতবাসী ছিলেন। মায়া মামা, সোনা মামা ও মনি মামা। তিন জনই অবিবাহিত বিধায় দেশের ভাইবোনদের সন্তানাদি মানে আমরাই ছিলাম তাদের প্রাণ। মনি মামাই দিয়েছিলেন প্রথম মানুষের মতো দেখতে ‘মেম পুতুল’—যাকে শুইয়ে দিলে তার নীল চোখ বন্ধ হয়ে যেত। 

রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ যখন বিলেতের রানি হয়েছিলেন তখন আমি নিতান্তই কয় মাসের শিশু। আমার মামারা রাজপরিবারের ছবিসহ ‘ভিউকার্ড’ পাঠাতেন। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতাম রাজকন্যা অ্যান ও রাজপুত্র চার্লসের ছবি। দেখতাম তাদের জুতো কেমন, জামার কুচি কেমন! মনে হতো, আচ্ছা ওরা কী খায়? ওরা কি আমাদের মতো ওদের রানিমাকে ‘আম্মা’ বলে জড়িয়ে ধরে? আর রানি যে সব সময় একটা হ্যান্ডব্যাগ ঝুলিয়ে রাখেন হাতে, তার ভেতরে কী থাকে? তখন ভাবিনি কোনোদিন আমি বিলেত যাব, সত্যি সত্যি একদিন রানির সান্নিধ্যও পাব! 

আমার কাজের মধ্যে সবচেয়ে বড় ঘটনা ছিল ২০১২ সালের কালচারাল অলিম্পিয়াডের চুক্তি লাভ। সেই অলিম্পিকের সমাপনীতে বিখ্যাত ড্যানি বয়েলের পরিচালনায় জেমস বন্ডের রিয়েল লাইফ নাটকে অভিনয় করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। কী আশ্চর্য, দেখি রানি তার রাইটিং টেবিল থেকে সোজা হেলিকপ্টারে করে স্ট্রাটফোর্ড মাঠে এসে নামলেন! মধ্যে তার ডামি ব্যবহার করা হলেও তার আগে পর্যন্ত এমন সুন্দর অভিনয় করলেন তিনি যে, তা অপ্রত্যাশিত!

পরের বছর সকালবেলা বাসার ডাকবাক্স খুলে বিস্ময়ে আমার মুখে আর কথা সরে না। রাজমুকুট জলছাপে আমার নামে রানির চিঠি এলো! উত্তেজিত হাতে খুলে দেখি লেখা আছে, ‘দ্য মাস্টার অব দি হাউশোল্ড হ্যাজ রিসিভড হার ম্যাজিস্টিস কম্যান্ড ইনভাইট মিসেস শামীম আজাদ টু আ কমনওয়েলথ রিসেপশন টু বি গিভেন অ্যাট বাকিংহাম প্যালেস বাই দ্য কুইন অ্যান্ড ডিউক অব এডিনবরা।’ নির্বাচিত মানুষের মধ্যে আমার নিমন্ত্রণ এসেছে বাংলাদেশি ব্রিটিশ লেখক হিসেবে। চিঠি হাতে নিয়ে আমার তো মাথা খারাপ হওয়ার জোগাড়। এর আগে এক গণদাওয়াতে লনে দূর থেকে এক বিন্দুর মতো রানিকে দেখেছি। সেদিন দেখলাম, কথা বললাম একদম সামনে থেকে। কালো কোটপরা এক প্যালেস কর্মচারী লাইন ধরে পাশের ঘরে দাঁড়ানো অভ্যাগতদের পরিচিতি উচ্চ স্বরে ঘোষণা করার সঙ্গে সঙ্গে আমরা এক-এক করে রানির সামনে যাচ্ছিলাম। যখন তাকে দেখলাম আর বাও করলাম, আমি তো হতবাক! নরম মায়ামায়ী অবয়বের ফিরোজা লেসের জামা পরা এই নারী যে প্রায় আমার মতোই ছোটখাটো! করমর্দনের পর চারদিকে তাকিয়ে বুঝি—‘শামীম এই সুযোগ, তোমার যা মনে লয় বলো।’ সব ছাপিয়ে আমার অলিম্পিকের কথা মনে হলো। আর কুশল বিনিময়ের পর উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে উঠি—‘ইয়োর ম্যাজিস্টি, ইউ আর দ্য বেস্ট বন্ড গার্ল উই এভার হেড!’ রানি প্রায় ফিক করে তার সেই বিখ্যাত হাসিটি দেন। মৃদু শব্দে অপেক্ষমাণ রাজাও সচকিত হয়ে তাকান। আর আমি দেখি তার দাঁতগুলো বড় সুন্দর। মৃদুস্বরে বলি, আমি ভাবতে পারছি না ব্রিটেন ও কমনওয়েলথের রানির সঙ্গে আমার করের মর্দন চলছে! তিনি হাস্যমুখে মৃদুলয়ে হাতখানা দোলাতে দোলাতেই বলেন, ‘ইট ইস হ্যাপেনিং...ইট ইজ হ্যাপেনিং...।’ 

রাজত্বের প্লাটিনাম জুবিলিতে বাকিংহাম প্যালেসের সেই বিখ্যাত ব্যালকনিতে রানি মাত্র কদিন আগে তার পরিবার নিয়ে দাঁড়িয়েছেন। নিচে সেই বহুশ্রুত বহুদেখা জনসমুদ্র। এই জনসমুদ্র বিগত ৭০ বছর ধরে এভাবে নিচে এসে দাঁড়িয়ে তার প্রতি আস্থা প্রকাশ করেছে। পরিবারের কেউ মারা না গেলে তার সঙ্গে এসে দাঁড়াতেই হয়। কিন্তু বিগত ৭০ বছর তার পাশে দাঁড়ানো মানুষটি আজ অনুপস্থিত। তার দীর্ঘদিনের জীবনসঙ্গী প্রিন্স ফিলিপ ছাড়া আরো একজন অনুপস্থিত, সে প্রিয় পৌত্র হ্যারি। এক জনের মাত্র কদিন আগে প্রয়াণ হয়েছে বলে আর অন্য জনের প্রবেশ হয়েছে নিষিদ্ধ, হয়েছে ঐ কোমলমতি দর্শন রানির কঠোর সিদ্ধান্তেই! জনশ্রুতি আছে, পুত্র চার্লসকে তিনি ঠিক যোগ্য উত্তরাধিকারী মনে করেন না। পৌত্র উইলিয়াম তার পছন্দের। 

চার্লস রাজা হলে কমিলা, কুইন কনসোর্ট হবেন তার ঘোষণাও দিয়েছেন। এতে করে আশঙ্কা হলো কুইন এলিজাবেথ কি তবে বিদায় নিচ্ছেন তার দায়িত্ব থেকে? না, তিনি বরাবরের মতোই তার বিখ্যাত হাসি দিয়ে, বিছানা থেকে নয়, দাঁড়িয়েই নতুন প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাসকে স্বাগত জানালেন। কিন্তু দুদিন পরই রানি প্রয়াত হলেন! সে কী এক আশ্চর্য নারী! 

লন্ডনে বেড়াতে এলে রানির বাড়ি, বিখ্যাত ব্যালকনি না দেখলে বিলেত ঘোরা সম্পূর্ণ হয় না। বাকিংহাম প্যালেস ছিল তার কাজের জায়গা। উইন্ডসোর প্রাসাদ ছিল তার বসতবাটি আর ভালোবাসতেন স্কটল্যান্ডের নিরিবিলি বালমোরাল প্রাসাদ। রানি স্কটল্যান্ডের পরাজিত রাজা রবার্ট ব্রুশের বংশধর ছিলেন। এখানে তিনি ঘরের মেয়ের মতো একাও হাঁটতে বেরোতেন, চার্চে যেতেন ভিড়ভাট্টাহীন আর সঙ্গে থাকত তার প্রিয় কুকুর। 

আমার ছোটবেলার সেই বিলেত এমনকি সেই সরল পৃথিবী এখন আর নেই। মেঘে-রৌদ্রে-তুষারে বেলা হয়েছে কুইন এলিজাবেথের। তিনি চলে গেলেন। রেখে গেলেন তার কিংবদন্তি। আগামী ১০০ বছরেও কেউ রানি হবেন বলে মনে হয় না। আর হলেও তার মতো কেউ হবেন না—এ কথা ইতিহাসবিদেরা হলফ করে বলেছেন।

বিদায় রানি ও রাজমাতা। উইন্ডসোর প্রাসাদের সেন্ট জর্জ চার্চে বাবা-মা, বোন—এদের সঙ্গে ও স্বামীর পাশে শুয়ে শান্তিতে নিদ্রা যান। বিদায়।  [লন্ডন]

লেখক : কবি, কলামিস্ট ও স্টোরিলেটার

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন