বুধবার, ৩০ নভেম্বর ২০২২, ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

নদীগুলি কেন এখনো দখল-দূষণের শিকার

আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০১:০২

গতকাল ছিল বিশ্ব নদী দিবস। এই উপলক্ষ্যে দেশের পত্রপত্রিকাগুলি বিভিন্ন নদীর যে চিত্র তুলিয়া ধরিয়াছে তাহাতে বিস্মিত এবং ইহার সহিত উদ্বিগ্ন না হইয়া পারা যায় না। নদী বিশেষজ্ঞরা এমন কথাও বলিয়াছেন যে, আমাদের নদীগুলি আসলে এতিম, তাহার কোনো অভিভাবক নাই। যাহারা নদী রক্ষার মহান দায়িত্বে নিয়োজিত, তাহাদের বিরুদ্ধেও উঠিয়াছে নানা অভিযোগ; কিন্তু নদীর দখল-দূষণের জন্য কি শুধু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষই দায়ী? নদীর পাড়ে গড়িয়া তোলা বিভিন্ন অবৈধ স্থাপনা, শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের দূষণ প্রক্রিয়ার পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকেরও কি ইহাতে কোনো দায়বদ্ধতা নাই? তাহারাও কি জানিয়া বা না জানিয়া নদীগুলিতে পলিথিনসহ বিভিন্ন বর্জ্য ফেলিয়া নদীগুলির প্রাণ সংহারে ন্যক্কারজনক ভূমিকা পালন করিতেছে না? প্রথমে রাজধানীর প্রধান নদী বুড়িগঙ্গার কথাই ধরা হউক। এই নদীটিকে দখল ও দূষণমুক্ত রাখিবার জন্য কতবার না পদক্ষেপ নেওয়া হইল; কিন্তু সেই নদীর অবস্থা কি এখনো সঙ্গিন নহে? বুড়িগঙ্গার তীরকে অনেকে এখনো ময়লার ভাগাড় হিসাবেই বিবেচনা করিয়া থাকেন। জিঞ্জিরা ফেরিঘাট হইতে কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত বুড়িগঙ্গা নদীতীরের পার্শ্ব দিয়া হাঁটিয়া গেলে দেখা যাইবে, গৃহস্থালিসহ নানা ধরনের আবর্জনা ফেলা হইতেছে যত্রতত্র। দূষণের কারণে বিশেষত শুষ্ক মৌসুমে এই নদীর পানি কুচকুচে কালো হইয়া যায়। কোথাও কোথাও ইহা ধারণ করে গোলাপি রং। বর্জ্যের কারণে দুর্গন্ধও আসে। শ্বাস নিতে কষ্ট হয় স্থানীয়দের।

একশ্রেণির শিল্প ও কলকারখানার মালিক নদীপাড়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়িয়া তোলেন নদীর পানির সদ্ব্যবহারের জন্য। তাহাদের ইটিপি ব্যবহার করিবার কথা; কিন্তু খরচ কমাইতে তাহা করেন না অথবা মাঝেমধ্যে করেন; কিন্তু নদীপাড়ের চারিপার্শ্বে বসবাসকারী লোকজন নদীতে ময়লা-আবর্জনা ফেলেন কোন আক্কেলে? তাহাদের উদ্দেশ্যও অসৎ। নদীতীরে বাড়তি জায়গা তৈরি করিয়া একসময় সেইখানে অস্থায়ী দোকানপাটসহ নানা স্থাপনা নির্মাণপূর্বক জায়গাটি ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থে ব্যবহার করা। নদীতে এইভাবে অবিবেচকের মতো কেহ যাহাতে আবর্জনা না ফেলেন, এই জন্য স্থানীয় প্রশাসন মাঝেমধ্যে সচেতনতামূলক প্রচারাভিযানও চালায়; কিন্তু কে শোনে কাহার কথা। জায়গা-সম্পত্তির লোভে জনবহুল এই দেশে নদী ও পরিবেশ রক্ষার উদ্যোগ মাঠে মারা যাইতেছে। শুধু কেরানীগঞ্জে নদীদূষণের ১৬৫টি উৎস রহিয়াছে। রহিয়াছে ৬৫টি ড্রেন ও পাইপলাইন যাহার মাধ্যমে কঠিন, গৃহস্থালি ও রাসায়নিক বর্জ্য নিষ্কাশন করা হইতেছে। তাই যাহারাই যথেচ্ছভাবে নদীদূষণ ও দখল করুক না কেন, তাহাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। তবে নদী রক্ষা করিবার দায়িত্ব আসলে সকলের। যদি কেহ মনে করেন যে, এই দায়িত্ব কেবল কর্তৃপক্ষের এবং তাহারা দিব্যি আবর্জনা ফেলিতে থাকিবেন, তাহা হইলে তাহা ভুল হইবে। নাগরিকদের নৈতিক দায়িত্বের দৃষ্টিকোণেও ইহা সমর্থনযোগ্য নহে। এইরকম পরিস্থিতি সেই সমাজেই সম্ভব, যেখানে রহিয়াছে তথাকথিত গণতন্ত্র। প্রকৃত গণতান্ত্রিক সমাজে কেহ আইন ভঙ্গ করিবার কথা চিন্তাও করিতে পারেন না। নদী তো দূরে থাক, পরিচ্ছন্ন সড়কে কেহ সামান্য সিগারেটের বর্জ্য ফেলিলেও এই জন্য দোষী ব্যক্তিকে বর্জ্য অপসরণ করিতে বাধ্য করা হয় কিংবা তাহাকে জেল-জরিমানার আওতায় আনা হয়; কিন্তু আমাদের মতো সমাজে আইন না মানাটাই যদি গণতন্ত্র হইয়া থাকে, তাহা হইলে এমন দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতি চলিতেই থাকিবে বইকি!

শুধু বুড়িগঙ্গা নহে, রাজধানীর আশপাশের, যেমন—শীতলক্ষ্যা, ধলেশ্বরী, বংশী, বালু ও তুরাগ—এই সকল নদনদীর অবস্থাও সংকটাপন্ন। সংকটাপন্ন কর্ণফুলী, ভৈরব, সুরমা, কুশিয়ারাসহ জানা-অজানা অনেক নদীর অবস্থাও। খোদ নদী রক্ষা কমিশন বলিতেছে, দেশের নদনদীর মোট দখলদারদের ৬৮ শতাংশকেই উচ্ছেদ করিতে পারে নাই সরকার। নদী রক্ষার গুরুত্ব সাধারণ মানুষ হইতে শুরু করিয়া নীতিনির্ধারক ও কর্তৃপক্ষীয় মহল সঠিকভাবে অনুধাবন না করিলে এবং আইনকানুনের প্রয়োগ ও পালনে আন্তরিক না হইলে নদীগুলিকে মরণদশা হইতে উদ্ধার করা অসম্ভব। নিশ্চয়ই এইরকম অরাজক অবস্থা চিরকাল থাকিবে না। ইহার জন্য হয়তো আমাদের আরো কয়েক দশক অপেক্ষা করিতে হইতে পারে।

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন