বৃহস্পতিবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০২২, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

রামনাথের ‘দুইন্যাই’ ফিরিয়ে দেওয়া হোক

আপডেট : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০:৩৭

আজ মঙ্গলবার বিশ্ব পর্যটন দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘পর্যটনের নতুন ভাবনা’। কিন্তু পুরাতনকে সঙ্গে নিয়েই নতুন ভাবনার ভিত রচিত হয়। বাংলাদেশের পর্যটনের ভিত শক্তিশালী করতে হলে আমাদের শ্রেষ্ঠ অর্জনগুলো তুলে ধরতে হবে। আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতি, আমাদের পৌষ-পার্বণ, আমাদের বীরত্বগাথা—এসব বিষয়কে পর্যটনের দৃষ্টিকোণ থেকে পরিপূর্ণভাবে তুলে ধরতে পারলেই কেবল পর্যটনের সুদিন আসবে।

প্রায় শতবর্ষ আগে হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার বিদ্যাভূষণ পাড়ার রামনাথ বিশ্বাস বাইসাইকেল নিয়ে বেরিয়েছিলেন ভূপর্যটনে। তার নাম উচ্চারিত হয় বিশ্ববিখ্যাত পর্যটকদের সঙ্গে। বাঙালির ঘরকুনো অপবাদ ঘোচানো এই মানুষটি ১৯৩১ থেকে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত তিন বার বাইসাইকেলে চড়ে চারটি মহাদেশ ভ্রমণ করেছিলেন। বাংলা ভাষায় তার ভ্রমণবিষয়ক ৩২টি বই প্রকাশিত হয়েছে।

এই ভূপর্যটক তার জন্মস্থান বানিয়াচং নামের গ্রামটাকেই নাকি তার পৃথিবী বলেছিলেন। প্রচলিত আছে, চীন থেকে ফিরে বানিয়াচংয়ে এসেছিলেন তিনি। তখন কমলা রাণীর সাগরদীঘির পাড়ের মাঠে তার সম্মানে একটা জমায়েত ডাকা হয়েছিল। ঐ জমায়েতে রামনাথ বিশ্বাস বলেছিলেন, ‘বাইন্নাচুং আমার দুইন্যাই।’ মানে বানিয়াচং আমার পৃথিবী।

সম্প্রতি সাংবাদিক রাজীব নূর একটি লেখায় স্থানীয় এক বয়স্ক ভদ্রলোকের বরাতে লিখেছেন, রামনাথ নাকি গণেশের বিশ্বভ্রমণের গল্পটা শুনিয়েছিলেন সমবেত জনতাকে। একবার দেবী দুর্গা তার ছেলে কার্তিক ও গণেশকে ডেকে বললেন, তোমাদের মধ্যে যে আগে পৃথিবী ভ্রমণ করে আমার কাছে ফিরে আসতে পারবে, তাকে একটি রত্নহার উপহার দেব। মায়ের কথা শুনে কার্তিক ময়ূরের পিঠে চড়ে পৃথিবী ভ্রমণে বেরিয়ে গেলেন। গণেশের বাহন ইঁদুর। কার্তিক তো নিজের জয় নিশ্চিত জেনে বেরিয়ে গেলেন। নির্বিকার গণেশ মায়ের চারপাশ ঘুরে বললেন, ‘মা-ই আমার পৃথিবী।’

অথচ বিশ্বখ্যাত ভূপর্যটক রামনাথ বিশ্বাসের ‘দুইন্যাই’ মানে পৃথিবীর বসতভিটা আজ দখলদারদের কবলে। বিশ্ব পর্যটন দিবসে রামনাথের বসতভিটা পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণের দাবিতে ‘বাইসাইকেলে রামনাথের বাড়ির পথে’ শীর্ষক কর্মসূচি ঘোষণা দিয়েছে ‘ভূপর্যটক রামনাথ বিশ্বাসের বসতভিটা পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণ কমিটি’ নামের একটি সংগঠন। এই সংগঠনের দাবি, রামনাথ বিশ্বাসের বসতভিটায় ভ্রমণবিষয়ক বইয়ের বিশেষায়িত একটি পাঠাগার ও বাইসাইকেল মিউজিয়াম গড়ার পরিকল্পনা নেওয়া হোক।

ভূপর্যটক রামনাথ বিশ্বাসের বসতভিটা পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণের দাবিতে ২৫ সেপ্টেম্বর হবিগঞ্জ প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেছেন ভূপর্যটক রামনাথ বিশ্বাসের বসতভিটা পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণ কমিটি। সংগঠনটি ২৬ সেপ্টেম্বর বিকেল ৪টায় বানিয়াচংয়ে ১ নম্বর ইউনিয়ন পরিষদ মিলনায়তনে সাংবাদিক ও সুধীজনের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।

আজ ২৭ সেপ্টেম্বর বেলা ১১টায় হবিগঞ্জ টাউন হল থেকে রামনাথের বাড়ির পথে বাইসাইকেল শোভাযাত্রা করবে। একই সঙ্গে বেলা ১১টায় বানিয়াচং শহিদ মিনারে সাংবাদিক দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু প্রতীকী অনশন করবেন। বাইসাইকেল শোভাযাত্রা রামনাথের বাড়ি বিদ্যাভূষণপাড়া ঘুরে আসার পর বানিয়াচং শহিদ মিনারে বিকেল ৪টায় সমাবেশের মধ্য দিয়ে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করবে ভূপর্যটক রামনাথ বিশ্বাসের বসতভিটা পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণ কমিটি। 

ভূপর্যটক রামনাথ বিশ্বাসকে নিয়ে বাংলাদেশের ভ্রমণকারী ও সাইক্লিস্টদের বরাবরই একটি আগ্রহের জায়গা ছিল এবং আছে। এর মধ্যে অনেকেই বানিয়াচংয়ে তার বসতভিটায় গিয়েছেন। কেউ কেউ সংবাদ সংগ্রহের জন্য, কেউ কেউ শুধুই বাড়িটা দেখার জন্য। যারাই গিয়েছেন, তাদের কারোরই খুব ভালো অভিজ্ঞতা ছিল না। কেউ কেউ আক্রান্তও হয়েছেন বাড়িটির দখলদারদের মাধ্যমে। সবারই একটা ইচ্ছা ছিল, রামনাথ বিশ্বাসের এই বসতভিটা পুনরুদ্ধারের। সম্প্রতি সাংবাদিক রাজীব নূর দখলদারদের হামলার শিকার হলে বসতভিটা পুনরুদ্ধারের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। এর প্ররিপেক্ষিতে ‘ভূপর্যটক রামনাথ বিশ্বাসের বসতভিটা পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণ কমিটি’ নামের সংগঠনটি গড়ে ওঠে বলে জানান সংগঠনের আহ্বায়ক ভূপর্যটক ও ভ্রমণলেখক আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বল।

রামনাথের বাড়ির প্রায় পাঁচ একর জমির সবটুকুই সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত। প্রকৃতপক্ষে সরকারই জমির মালিক। তাই ভূপর্যটক রামনাথের স্মৃতি রক্ষার দায়িত্বও সরকারের। বিশ্ব পর্যটন দিবসে (২৭ সেপ্টেম্বর) রামনাথের বসতভিটা পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া একটি সময়োপযোগী কাজ। রাষ্ট্রের উচিত রামনাথের বসতভিটা অবৈধ দখলমুক্ত করা। 

তবেই রামনাথ বিশ্বাসের পৃথিবী বানিয়াচং ফিরিয়ে দেওয়া হবে। এ কাজ করা গেলে আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যকে যেমন লালন করা হবে, তেমনি পর্যটনকেও বেগবান করা হবে। রানাথ বিশ্বাস আমাদের পর্যটনের শক্তিশালী ভিত রচনা করে গেছেন। এই অর্জন রক্ষা করতে না পারলে প্রকৃতপক্ষে আমাদের পর্যটন বিস্তৃতি লাভ করবে না। তাই আমাদের পর্যটনের বৃহৎ স্বার্থে রামনাথকে তার ‘দুইন্যাই’ মানে পৃথিবী ফিরিয়ে দেওয়া হোক।

লেখক : সাংবাদিক

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন