বৃহস্পতিবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০২২, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

ইতালির রাজনীতির নতুন সাপুড়ে জর্জিয়া মেলোনি

আপডেট : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০০:৪০

জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে ইতালির জনগণের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে নানা প্রশ্ন। ইতালির রাজনীতিতে কি পটপরিবর্তন ঘটতে চলেছে, নতুন কোনো মুখ আসছে শাসনব্যবস্থায়, কোন পথে যাচ্ছে ইতালির রাজনীতি—অনেকেই এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন। অনেকেই জানতে চেয়েছেন রাজনীতির মাঠে আলো ছড়ানো জর্জিয়া মেলোনি ও তার দল ‘ব্রাদার্স অব ইতালি’ সম্পর্কে। এমনকি কট্টর রক্ষণশীল দল কিংবা এই দলের নেতা হিসেবে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়ে ইতালির জন্য কতটুকু সাফল্য বয়ে আনতে পারবেন মেলোনি, সে সম্পর্কেও জানার তীব্র আগ্রহ ছিল মানুষের। এসব বিষয়ে আমার যুক্তি ছিল সাদামাটা—‘এক্ষেত্রে আমরা কয়েকটি দেশের দিকে তাকাতে পারি; যেমন—হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড, ব্রাজিল। এমনকি যুক্তরাজ্যসহ ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামানার আমেরিকার উদাহরণও টানা যায় এই আলোচনায়। এসব দেশসহ সাম্প্রতিককালে বহু দেশে ডানপন্থি দলগুলো জয় পাচ্ছে। এবং লক্ষণীয় বিষয় হলো, ডানপন্থিদের জয়ে অবাদান রাখছে ‘জাতীয়তাবাদী চেতনা’—রাষ্ট্রভেদে কমবেশি এর প্রভাব স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। এমতাবস্থায় মেলোনির ডানপন্থি জোট ক্ষমতায় এলে ইতালির রাজনীতির জন্য তা নতুন চমক হবে বটে, কিন্তু বিশ্বরাজনীতিতে ডানপন্থিদের বিজয় এই সময়ের সাধারণ ঘটনামাত্র।’

সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ইতালির জাতীয় নির্বাচনে জয়লাভ করেছে রক্ষণশীল জোট। এই জয়ের মধ্য দিয়ে দেশের ইতিহাসে প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হতে চলেছেন ৪৫ বছর বয়সি জর্জিয়া মেলোনি। একই সঙ্গে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথম বারের মতো দেশ পরিচালনার দায়িত্ব উঠল ডানপন্থি জোটের (ফার-রাইট) কাঁধে। ইতালির শাসকগোষ্ঠীর তালিকায় সর্বকনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নাম উঠল মেলোনির। এখন দেখার বিষয়, যেভাবে ধূমকেতুর মতো উদয় হয়ে ইতালিয় নাগরিকদের মন জিতে সিংহাসনে বসলেন মেলোনি, ঠিক তেমনিভাবে ডুবতে থাকা ইতালিকে তিনি টেনে তুলতে পারেন কি না। 

সিংহাসনে বসতে মেলোনিকে মোটা দাগে দুটি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে। তার প্রথম চ্যালেঞ্জ ছিল, নিজ দল ব্রাদার্স অব ইতালির ভাবমূর্তি ফেরানো। এক্ষেত্রে উল্লেখ করা প্রয়োজন, ফ্যাসিস্ট-পরবর্তী সময়ে কট্টর ডানপন্থি ব্রাদার্স অব ইতালিকে ‘ফ্যাসিবাদী দল’ হিসেবে আখ্যায়িত করত জনগণ, এই মনোভাব থেকে জনগণের দৃষ্টি ঘোরাতে সক্ষম হয়েছেন মেলোনি। এমনকি দলের স্বঘোষিতভাবে ফ্যাসিবাদী কিংবা বেনিটো মুসোলিনির কট্টর ভক্ত হিসেবে পরিচিত রাজনীতিকদের ওপর থেকেও জনগণের মনোভাব পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সফলতা দেখিয়েছেন তিনি। মেলোনির জন্য দ্বিতীয় কঠিন কাজ ছিল, সদ্য বিদায়ি প্রধানমন্ত্রী ও কট্টর মধ্য বামপন্থি মারিও দ্রাঘির সরকারের অর্থনৈতিক ব্যর্থতা কাটিয়ে ইতালির অর্থনৈতিকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে তিনি কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন, জনগণের সামনে তার রূপরেখা তুলে ধরা। এক্ষেত্রে তিনি জনগণকে খুব ভালোভাবেই বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন যে, তিনি ফ্যাসিবাদী ধারণার ধার ধারেন না, ইতালির জনগণের কল্যাণ সাধনই তার একমাত্র লক্ষ্য। বাস্তবিক অর্থেই মেলোনি ও তার জোটকে চ্যালেঞ্জের এক জটিল সমীকরণের মুখোমুখি হতে হয় ভোটের আগে। জ্বালানি মূল্যের উল্লম্ফন, ইউক্রেনে যুদ্ধ এবং ইউরো জোনের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে ইতালির মন্দাবস্থা থেকে জনগণকে তিনি কীভাবে উদ্ধার করবেন তার গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দিতে হয়েছে মেলোনিকে। এসব চ্যালেঞ্জের বিপরীতে নির্বাচনকালীন জনগণের উদ্দেশে মেলোনি বলেছিলেন, ‘আমাদের যদি এই দেশ শাসনের দায়িত্ব দেওয়া হয়, তাহলে আমরা সফলতার সঙ্গে এসব মোকাবিলা করব এবং আমাদের উদ্দেশ্য হবে সব মানুষকে একতাবদ্ধ করা এবং এক্ষেত্রে যেসব বিষয় আমাদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করে, সেগুলোর পরিবর্তে যেগুলো আমাদের একতাবদ্ধ করে, সেগুলোর দিকে আমাদের নজর বেশি থাকবে।’ ঠিক একইভাবে জয়লাভের পর দলের উচ্ছ্বসিত সমর্থকদের উদ্দেশে তাকে বলতে শোনা গেছে, ‘আমাদের মনে রাখতে হবে যে, আমরা শেষ বিন্দুতে নেই, আমরা সূচনা বিন্দুতে পা রেখেছি মাত্র। আগামীকাল থেকেই আমাদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে হবে।’

অল্প বয়সে প্রধানমন্ত্রীর মতো দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিলেও রাজনীতিতে কাঁচা নন মেলোনি। লম্বা সময় ধরেই রাজনীতিতে যুক্ত রয়েছেন তিনি। ২০০৮ সালে তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী সিলভিও বার্লুসকোনির অধীনে যুবমন্ত্রী হিসেবে সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। তখনকার মন্ত্রিসভার আকার কিংবা তার কাজের পরিধি ছোট ছিল বটে; কিন্তু দিন যত গড়িয়েছে, পরিপক্বতা লাভ করেছেন মেলোনি। বস্তুত, দীর্ঘকাল ধরে ক্ষমতায় আরোহণের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করছিলেন মেলোনি। এখন তিনি ইতালির সত্যিকার রাজা। একনায়ক বেনিতো মুসোলিনির পর মেলোনিই হলেন ইতালির কট্টরপন্থি নেতা। 

উল্লেখ করা প্রয়োজন, আমি যখন ইতালির অর্থ মন্ত্রণালয়ে কাজ করতাম, তখন মেলোনিকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে আমার। তাকে দেখে আমার বরাবরই মনে হয়েছে, আক্ষরিক অর্থেই নিজের জীবনকে রাজনীতিতে উৎসর্গ করেছেন মেলোনি। রাজনীতিকে তিনি শুধু পেশা নয়, বরং তার চেয়ে বেশি কিছু মনে করেন বলেই আমার মনে হয়েছে। 

২০২১ সালে মেলোনির আত্মজীবনী প্রকাশিত হয়েছিল। তার আত্মজীবনী পড়েছি আমি। আত্মজীবনী থেকে জানা যায়, কতটা বেদনাদায়ক মেলোনির জীবন, চলার পথ। চরম বেদনাদায়ক জীবনযাপনের মধ্যেও তিনি কীভাবে দলে ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিলেন। অকালে বাবাকে হারিয়ে মেলোনিকে একাই জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যেতে হয়েছে। তবে সেই কঠিন মুহূর্তে তিনি পাশে পান দলকে; এই শূন্যতা পূরণে এগিয়ে এসেছিল ডানপন্থি ইতালীয় সামাজিক আন্দোলন। এভাবেই পরবর্তী সময়ে তিনি খুঁজে পান ব্রাদার্স অব ইতালিকে। মেলোনি সম্পর্কে বলা যায়, ব্যাটম্যানকে যেভাবে গোথাম শহরের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে দেখা গেছে, ঠিক একইভাবে ইতালিকে ‘ভিলেনদের’ থেকে মুক্ত করার মিশনে নেমেছেন মেলোনি। 

কোনো সন্দেহ নেই, ইতালির রাজনীতিতে মেলোনির উত্থান ঘটল এমন এক সময়ে, যখন অসন্তোষের আগুনে জ্বলছে ইতালি। বিশেষ করে ২০১৩ সালের পর থেকে যে ‘নাজুক ইতালি’কে দেখছে দেশটির জনগণ, তা থেকে তারা বের হয়ে আসতে চাইছে—এ বিষয়টি গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছে এবারের নির্বাচনে। সত্যিকার অর্থে মেলোনির হাত ধরে এক নতুন ইতালি দেখতে চায় ইতালীয়রা। এক্ষেত্রে হিসাব-নিকাশ হলো, ৮৬ বছর বয়সি বার্লুসকোনি স্বভাবতই রাজনীতির বাইরে ছিটকে পড়েছেন। সালভিনির শেষ সীমানাও স্পষ্ট হয়ে গেছে—‘রাশিয়াপ্রীতি’ অবস্থান তাকে রাজনৈতিকভাবে দূরে ছুড়ে ফেলেছে; রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ইউক্রেন আক্রমণের পরে সালভিনির অবস্থান করুণতর হয়েছে স্বাভাবিকভাবেই। অর্থাৎ, হিসাব পরিষ্কার—সামনে লম্বা সময় পাচ্ছেন মেলোনি, এই সময়কালে ইতালির রক্ষণশীল ব্লককে একত্রিত করার মাধ্যমে শক্তিশালী করে গড়ে তুলতে পারেন তিনি। 

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মেলোনির সামনে এখন অনেক কাজ। সাম্প্রতিক সময়ে যেহেতু বিশ্বব্যাপী ডানপন্থিদের নৌকার পালে হাওয়া লেগেছে, সেক্ষেত্রে মেলোনির কাজ ততটা কঠিন হবে বলে মনে হয় না। তবে যেহেতু তিনি ইতালির জনগণকে ‘স্থিতিশীল ইতালি’ উপহার দেওয়ার অঙ্গীকার করে ক্ষমতার চেয়ারে বসেছেন, কাজেই তাকে পা বাড়াতে হবে বেশ বুঝেশুনে। এক্ষেত্রে কাকে কাকে মন্ত্রিসভায় আনবেন তিনি, এসবসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিতে তাকে মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে। 

স্মরণে রাখা জরুরি, ইতালির রাজনৈতিক নেতাদের দুর্নীতি ও কেলেঙ্কারির কথা ঘনঘনই শোনা যায়। দেশটিতে যেমন কোনো একটি রাজনৈতিক দলের উত্থান ঘটে খুব দ্রুত, তেমনি খুব অল্প সময়ের মধ্যেই হারিয়ে যায় তার জনপ্রিয়তা। অর্থাৎ, ইউরোপের বড় অর্থনীতির এই দেশে সরকারের পতন ঘটে অতি অল্প সময়ের ব্যবধানে। এবং এ কারণে প্রায়শই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় দেশটিতে। পরিসংখ্যানমতে, গত ৩০ বছরের ইতিহাসে ইতালিতে ১৯টি সরকারে ১৪ জন প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করেছেন। গড় হিসাবে, প্রতি দুই বছরে একজন প্রধানমন্ত্রী এবং প্রতি দেড় বছরে দেশটিতে নতুন সরকার গঠিত হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে বিশ্লেষকেরা বলছেন, গত কয়েক দশক ধরে মধ্য বামপন্থি জোট সরকারগুলোর ব্যর্থতার কারণে ভোটাররা সরকার পরিচালনায় বড় ধরনের গুণগত পরিবর্তন আনলেন। বিশেষ করে বিশ্বের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কোভিড-পরবর্তী পরিস্থিতি এবং ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ভোটাররা এই নির্বাচনকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, ইতালিতে আগের বেশ 
কয়েকটি সরকারই ছিল ‘জোট সরকার’। জোটের ভেতরে বিভিন্ন দলের মধ্যে মতবিরোধের কারণে তারা বড় কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। তবে এবারের হিসাব বলছে, পার্লামেন্টের দুই কক্ষেই মেলোনির জোট প্রাধান্য বিস্তার করতে পারবে। যদিও জোটের সদস্যদের মধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে মতভেদ রয়েছে। মেলোনি মূলত তার দলকে যুক্তরাজ্যের কনজারভেটিভ পার্টির মতো মূলধারার রাজনৈতিক দল হিসেবে উপস্থাপন করতে চান। ইউক্রেনে পশ্চিমা নীতিমালার সমর্থক তিনি। এবং ইতালির ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ তার প্রধান লক্ষ্য। এই অবস্থায় দেখার বিষয়, মেলোনি কতটা নিজেকে মেলে ধরতে পারেন—ইতালিকে স্বরূপে ফেরাতে জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি কতটা পূরণ করতে পারেন। 
লেখক : ইতালীয় কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স ম্যাগাজিন ‘প্যানোরমা’র কলামিস্ট
সিএনএন থেকে ভাষান্তর :সুমৃৎ খান সুজন

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন