বৃহস্পতিবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০২২, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

গণতন্ত্রের মানসকন্যার জন্মদিনে

আপডেট : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০২:১০

কোনো এক মনিষীর কথা, পৃথিবীতে তিন ধরনের মানুষ জন্ম নেয়। এদের মধ্যে কেউ কেউ মহৎ হয়েই জন্ম নেয়, কেউ কেউ জন্মের পর কর্মের মধ্য দিয়ে মহত্ত্ব অর্জন করে; কারো কারো ওপর মহত্ত্ব চাপিয়ে দেওয়া হয়। মহত্ত্ব চাপিয়ে দেওয়ার যুগে বসবাস করে মহত্ত্ব অর্জনকারী একজন নেতার জন্মদিন উপলক্ষ্যে লিখতে বসে গর্বে বুকটা ভরে যাচ্ছে। একই সঙ্গে বেদনাবিধূর নানা স্মৃতি হূদয়কোণে ভেসে উঠছে। সুজলা সুফলা এই বদ্বীপ ভূমির ওপর কত কী ঘটে গেছে। সবকিছু গুছিয়ে বলা বা লেখার মতো তেমন যোগ্যতা অর্জন করতে সক্ষম হইনি বটে; কিন্তু স্বচক্ষে দেখা বিষয়গুলো বড়ই বিস্ময়কর।

বাংলাদেশের জনশুমারি অনুসারে প্রায় ১৭ কোটি লোক রয়েছে। প্রত্যেকেই মনুষ্যপদবাচ্য হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছে বা করেছেন কোনো না কোনো মায়ের গর্ভ থেকে; কিন্তু সবার জন্মদিন নিয়ে তো আর লেখার আবশ্যকতা থাকে না। কারো কারো জন্মদিন উপলক্ষ্যে কিছু লিখতে হয়। কেন লিখতে হয়? এর একটি তাত্পর্য রয়েছে, রয়েছে আধ্যা্তিক ভাবাদর্শ। মানবজীবন ও তার ভবিতব্য সম্পর্কে এক সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে যারা কর্মকুশলী, তাদের জন্ম আলেখ্য অনুগামী জাতিকে জানিয়ে দেওয়া বড়ই প্রয়োজন। সে জন্য জননেত্রী শেখ হাসিনার জন্মদিনে তাত্পর্যমণ্ডিত কিছু বিষয় উপস্থাপনে ব্রতী হয়েছি। শেখ হাসিনা আমাদের প্রধানমন্ত্রী বলতে গেলে দীর্ঘ সময়ব্যাপী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে একটা জাতির কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানোর পথকে প্রসারিত করেছেন। হয়তো পূর্ব থেকে এটা নির্ধারিত ছিল যে, ১৯৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় একটি কন্যাশিশু জন্ম  নেবে শেখ মুজিব ও বেগম ফজিলাতুন নেছা দম্পতির ঘরে; যে এই বাংলার মানুষের ভাগ্যবদলের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে অবিচল কর্মে নিয়োজিত থাকবে।

ছোটবেলার বাবা-মা ও আ্তীীয়স্বজনের আদুরে নাম হাসু আজ আমাদের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা। বাংলাদেশের স্থপতি মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও বেগম মুজিবের পাঁচ সন্তানের মধ্যে সবার বড় শেখ হাসিনার বাল্যশিক্ষার পাঠ সমাপ্ত হয় টুঙ্গিপাড়াতেই। ১৯৫৪ সালে পরিবারের সঙ্গে ঢাকার মোগলটুলীর রজনীবোস লেনের বাড়িতে বসবাস শুরু করেন। পিতা শেখ মুজিবুর রহমান তখন বড় রাজনৈতিক নেতা। ১৯৫৬ সালে শেখ হাসিনা টিকাটুলির নারীশিক্ষা মন্দির বালিকা বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৫৪ সালে শেখ মুজিব প্রাদেশিক সরকারের কৃষি ও বনমন্ত্রীর দায়িত্ব লাভ করেন। সেই সুবাদে শেখ হাসিনাকে মিন্টো রোডের সরকারি বাসভবনেও থাকতে হয় পরিবারের সঙ্গে। ১৯৬৫ সালে আজিমপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং ১৯৬৭ সালে গভর্নমেন্ট ইন্টারমিডিয়েট গার্লস কলেজ (বর্তমানে বদরুন্নেছা সরকারি মহিলা কলেজ) থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেন। পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলায় ভর্তি হন। উল্লেখ্য, ১৯৬৭ সালেই ১৭ অক্টোবর পরমাণুবিজ্ঞানী ড. ওয়াজেদ মিয়ার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এ জন্য শিক্ষাজীবন কিছু সময়ের জন্য ব্যাহত হয়। এখানে আরো একটি কথা উল্লেখ না করে পারছি না যে, শেখ হাসিনার জন্মের সময় পিতা শেখ মুজিব রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত ছিলেন এবং বিবাহের সময় কারাগারে ছিলেন। দুঃখে ভরা জীবন অতিবাহিত করে সীমাহীন ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনা। এক ভয়ংকর নিষ্ঠুর, প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠেন তিনি। এর মধ্যেও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অংশ নিয়ে ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছেন। গভর্নমেন্ট ইন্টারমিডিয়েট গার্লস কলেজের নির্বাচিত ভিপি ছিলেন। ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানেও তার সক্রিয় আন্দোলন রাজনৈতিক জীবনকে বর্ণময় করে তোলে। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় জীবন অতিবাহিত করেন। বঙ্গবন্ধু তখন পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে। মৃত্যু ঝুঁকিতে প্রবাহমান জীবনের পরতে পরতে বেদনার ছাপ লক্ষণীয় বিষয়।

১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হলো, ১৬ ডিসেম্বর বিজয় উল্লাসে গোটা জাতি যখন আত্মহারা, তখনো মুজিবপরিবার বন্দি অবস্থায়। এক দিন পর মুক্তবাতাসে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ লাভ করেন পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে (শেখ কামাল, শেখ জামাল রণাঙ্গনে তখনো)। মুক্ত বাতাসে শ্বাসপ্রশ্বাসের সুযোগ হলেও অজানা আশঙ্কায় দিন কাটে তাদের। কেবল তাদের নয়, গোটা বাঙালি জাতির। কারণ প্রিয় নেতা তখনো ফেরেননি বাংলার ধূলিধূসর রক্ত্লাত পবিত্র ভূমিতে। কাজেই স্বাধীনতা বিজয় তখনো থাকে অপূর্ণ। জাতির পিতা ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন বীর বেশে। মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ে পূর্ণতা আসে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের শাসনকার্য পরিচালনার জন্য বঙ্গবন্ধু একটি সংবিধানও উপহার দেন স্বল্প সময়ে। পথচলা শুরু হয় স্বাধীন দেশে। মুক্ত স্বাধীন দেশ, পৃথিবীর মানচিত্রে গৌরবের আসনে জায়গা করে নেন; কিন্তু দুর্ভাগ্য—মাত্র সাড়ে তিন বছর পর জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যা করে স্বাধীনতার মর্যাদাকে আঘাত করে ক্ষতবিক্ষত করে তোলে ৭১-এর পরাজিত শত্রুরা। আজকের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা সেদিন দেশের বাইরে থাকাতে বেঁচে যান, বেঁচে যান শেখ রেহানা একই কারণে।

রাজনৈতিক নানা ঘটনা পরম্পরায় শেখ হাসিনা টানা তিন টার্ম রাষ্ট্রক্ষমতায়। বাঙালি জাতির আত্মমর্যাদাকে ভিন্ন এক উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছেন। নানা ঘাত-প্রতিঘাতের ভেতর দিয়ে দুঃখ বেদনা শোককে বহন করে একটা জাতিকে স্বপ্ন চূড়ায় নিয়ে আসার মতো কতজন রাষ্ট্রনায়ক আছেন এই পৃথিবীতে? নিন্দুকেরা যা-ই বলুক আমাদের প্রিয় নেত্রী তার কর্ম দিয়ে যে মহত্ত্ব অর্জন করেছেন, তা বর্ণনা করে শেষ করা যাবে না। বেদনাক্লিষ্ট হাহাকারে পরিপূর্ণ একটি জীবনকে কীভাবে বিশুদ্ধময়তায় ভরে দেওয়া যায়, তা শেখ হাসিনা দেখিয়ে দিয়েছেন। তিনি সামাজিক পুনর্গঠনে অবিস্মরণীয় সাফল্য দেখিয়েছেন। রাজনৈতিক বন্ধুর পথ অতিক্রম করে একটি দেশকে ও একটি জাতিকে যেভাবে আলোর পথে ধাবিত করে যাচ্ছেন, তাতে মনে হয় যেন এই বঙ্গের শক্তিবিভাসিতা এক নারী শেখ হাসিনা। তার জন্মদিনে সে কথাই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। নির্ভীক জাতি কখনো পেছনে পরে থাকতে পারে না। একজন পোড়খাওয়া সফল রাজনীতিক একই সঙ্গে মমতাময়ী মা এবং সংস্কৃতিমনা লেখক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

১৯৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ২১ বছর পর পুনরায় ক্ষমতায় আসে। স্বাধীনতা তথা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশকে ফিরিয়ে আনেন। স্বদেশবাসীর জন্য শেখ হাসিনার প্রাণ কাঁদে। যে দেশের মাটিতে তার জন্ম, সে দেশটি তারই পিতার হাত ধরে স্বাধীনতা লাভ করে সেই দেশেরই একটি চক্র কতিপয় সেনাবাহিনীর মাধ্যমে তার পিতা; আমাদের জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যা করতে পারে, সেখানে তিনি কেন আবার ফিরে এসেছেন? এর মূল কারণ হচ্ছে দেশপ্রেম ও দেশের মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা। এই ভালোবাসা যদি না থাকত তবে রাগে, অভিমানে, ঘৃণায় কোনো দিন আর বাংলাদেশে ফিরে আসতেন না। এটাই তার সবচেয়ে বড় মহত্ত্ব। তিনি যখন নির্বাসিত বিপন্ন জীবনযাপন করছিলেন, তখন বিধ্বস্ত আওয়ামী লীগের হাল ধরতে তাকেই দলের সভাপতি নির্বাচিত করা হয় সর্বসম্মতিক্রমে। তিনি ছুটে আসেন মাটির টানে, দেশের টানে, দলের টানে। আওয়ামী লীগের পুনর্জন্ম ঘটে। গণতন্ত্রের সুরঙ্গ পথ দেখতে পায় এ জাতি। এর পর নানা প্রতিকূল পরিবেশ এবং অবৈধ শাসনের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলন শানিত করে জয়ের বন্দরে পৌঁছে দেন জাতিকে।

প্রথম দফায় ক্ষমতাসীন হয়েই তিনি চমকে দেন বিশ্ববাসীকে। সবচেয়ে গৌরবের বিষয়, তিনি ভারত থেকে ‘দেশিকোত্তম’ সম্মানে ভূষিত হন। বিশ্ব ভারতী তাকে সম্মানসূচক ডিলিট ডিগ্রি প্রদান করে। এ ছাড়াও সফল রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে অসংখ্য বৈদেশিক সম্মাননা, পুরস্কার ও উপাধিতে ভূষিত হন। এ সব পুরস্কার ও সম্মাননা ও উপাধির ভিন্ন ভিন্ন তাত্পর্য রয়েছে। শেখ হাসিনা জন্ম নিয়েছেন পরের জন্য, জীবন ধারণও করেছেন পরহিতে। এ পৃথিবীতে সেই মানুষই যথার্থ জীবিত, যারা পরের জন্য জীবন ধারণ করেন। দেহত্যাগ করেন বটে, বেঁচে থাকেন যুগযুগান্তরে কর্মের সুখ্যাতিতে। এটি মানবীয় ক্রমবিকাশের লক্ষ্য বা চরম অবস্থা। সমাজে কীভাবে অনেক বেশি সংখ্যায় শুদ্ধ মানুষ, মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ তৈরি করা যায়, এমন লক্ষ্যকে সামনে রেখেই আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনা কর্মযজ্ঞে আত্মনিয়োগ করেছেন। এ জাতিকে অবশ্যই মানবীয় ক্রমবিকাশের উন্নতির পথে এগিয়ে যেতে হবে। অসহায় রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে তিনি যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তা কত জন নেতার পক্ষে সম্ভব? সীমাহীন ধৈর্যশীল, এমন মহৎ চরিত্রের জন্ম হয়েছে বলেই জাতি হিসেবে আমরা গর্বিত। তার জন্মদিনে তার প্রতি রইল অকৃত্রিম ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা, অর্পণ করছি প্রীতিপুষ্পাঞ্জলি।

লেখক : খাদ্যমন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন