রোববার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২২, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

কিশোরগঞ্জে আগাম আলু চাষ শুরু 

আপডেট : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১১:৩৮

'গত বছর ডিজেল ও শ্রমিকের দাম কম থাকায় উৎপাদন খরচ ছিল কম। এবার ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ার এবং বাজারে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের বাজার বেশি হওয়ায় বেড়েছে কৃষি শ্রমিকের দাম। তাই আগাম আলু  ব্যয় বেড়ে গেছে আলু চাষিদের। গত বছর যেখানে প্রতিবিঘা জমির আলু চাষ করতে খরচ হয়েছিল ২০ থেকে ২২ হাজার টাকা সেখানে এ বছর লাগছে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা।  তারপরও আলু চাষ করছি কি করব জমি ফেলে রেখে তো লাভ নেই।' কথাগুলো বলেন নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার আগাম আলুচাষি বকুল হোসেন।  

বুধবার (২৮ সেপ্টেম্বর) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে আগাম আলু চাষ শুরু হয়েছে। আলু চাষিরা জানায়, সেভেন জাতের আগাম আলুর বীজ রোপণ করা হচ্ছে। যার আলু যত আগে উঠবে, সে তত বেশি লাভবান হবেন। শীত মৌসুমের শুরুতে নতুন আলু ভোক্তাকে দিতে পারলে চড়া বাজারমূল্য পেয়ে দ্বিগুণ লাভবান হবেন এমন প্রত্যাশা করছেন আলু চাষিরা।

কৃষকরা জানায়, একটি সময় এ অঞ্চলে আশ্বিন-কার্তিক অভাবের মাস নামে পরিচিত ছিল। হাজার হাজার কৃষক ও কর্মজীবী মানুষ চরম অভাবের মধ্যে পড়তে হয়েছিল। সেই দিন আর নেই। ফসলের বহুমুখী করণ ও আগাম ফসল উৎপাদনে কৃষি বিপ্লবে কৃষকের ভাগ্য পরিবর্তন হয়েছে ঠিকই কিন্তু বর্তমানে যে পরিস্থিতি তা কৃষকের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে আবার। 

উপজেলার উত্তর দুরাকুটি, নিতাই, মাগুড়া, পুটিমারী, কালিকাপুর এলাকায় দেখা যায়, আগাম ধানের কাটাই মাড়াই শেষে জমিতে আগাম আলুর বীজ বুনছেন কৃষক। চারিদিকে যেন ফসল উৎপাদনের উৎসব। 

বাহাগিলি ইউনিয়নের উত্তর দুরাকুটি গ্রামের কৃষক শামীম হোসেন বলেন, বাজারে যার আলু যত আগে উঠবে, তার লাভ তত বেশি হবে। তিনি গত মৌসুমে ৮ একর জমিতে  আলু চাষ করে  ৫০০ বস্তা আলু পেয়েছিলেন। এর মধ্যে মৌসুমের শুরুতেই ২০০ বস্তা বিক্রি করেন। ৩০০ বস্তা হিমাগারে রাখেন। উৎপাদন খরচ ও হিমাগার ভাড়াসহ প্রতি বস্তায় (৮৪ কেজি) খরচ পড়ে ৯৫০ টাকা। সেই আলু বস্তাপ্রতি তিনি বিক্রি করেছেন গড়ে ১ হাজার ৬০০ টাকা করে। লাভ বেশি পাওয়ায় এবার তিনি ২৫ বিঘা জমিতে  আলু লাগানো শুরু করেছেন।

মাগুরা ইউনিয়নের কৃষক সাবেদ আলী জানান, বিঘা প্রতি জমিতে আগাম জাতের আলু রোপণে খরচ হচ্ছে ১০ হাজার টাকা। বিঘায় আলু উৎপাদন হবে প্রায় আড়াই হাজার কেজি। আগাম আবাদে আগাম বাজার ধরতে পারলে আলুর কেজি বিক্রি হবে প্রায় ৮০ থেকে ১০০ টাকা। এতে বিঘা প্রতি আলু বিক্রি করে খরচ বাদ দিয়ে লাভ পাওয়া যাবে প্রায় ৫০ থেকে ৭০ হাজার টাকা। 

উপজেলার গাড়াগ্রাম ইউনিয়নের পূর্ব দলিরাম গ্রামের কৃষি শ্রমিক শাহজাহান আলী জানান, আগে বেকার থাকতে হতো আর এখন আগাম উৎপাদিত ধান ও  আলু খেতে কাজ করে প্রতিদিন ৪০০ টাকা মজুরি পাওয়া যাচ্ছে। একই কথা জানালেন আরও কয়েকজন শ্রমিক। তারা আরও জানালেন মৌসুমের শুরুতে নতুন আলু ভোক্তাকে দিতে পারলে চড়া বাজারমূল্য পেয়ে দ্বিগুণ লাভবান হবেন এমন প্রত্যাশা তাদের।

রণচন্ডি ইউনিয়নের কুটিপাড়া এলাকার কৃষক মোজাম্মেল হক বলেন, এ বছর ৫ বিঘা জমিতে আগাম আলু রোপণ করেছেন।একই এলাকার রফিকুল হোসেন আগাম আলু চাষ করেছেন ৫ বিঘা জমিতে। তিনি বলেন, আমাদের এদিকের ডাঙ্গা জমিগুলো একদম উঁচু এবং বালুমিশ্রিত। ভারী বৃষ্টিপাত হলেও তেমন ভয় থাকে না। তাই আগেভাগে দ্বিগুণ লাভের আশায় আগাম আলু চাষ করছি।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান বলেন, চলতি বছর ৪ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। যা গত বছরের চেয়ে ১০০ হেক্টর বেশি। এ বছর আগাম আমন ধানে রেকর্ড পরিমাণ ফলন পেয়ে কৃষক আলু চাষে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। বর্তমানে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় উঁচু জমিতে আলুচাষে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। নিচু জমিতে আবহাওয়া দেখে রোপণের কথা বলা হচ্ছে। এ উপজেলার অন্যতম আকর্ষণ আগাম আলু ৫০-৫৫ দিনের মধ্যে বাজারে চলে আসবে। আশা করছি ভালো ফলন ও চড়া বাজার মূল্য পেয়ে কৃষক পরিবারে সমৃদ্ধি বয়ে আনবে। আগাম ধান, আগাম আলু চাষে এ জনপদে অভাব এখন অতীত।

ইত্তেফাক/এআই