বৃহস্পতিবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০২২, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

গাছে গাছে যেন বক ফুল

আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১১:১১

শত শত বক আর পানকৌড়ির কলকাকলিতে মুখরিত এখন ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার ভূমি অফিস চত্বরসহ আশেপাশের এলাকা। পাখিদের স্থায়ী এ অবাধ বিচরণ স্থানীয়দের মধ্যে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। সারাবছরই পাখিগুলো এখানে অবস্থান করছে। দিনে দিনে বিস্তৃত করছে তাদের বসতি। স্থানীয়রা ছাড়াও পাখিদের এ সৌন্দর্য দেখতে আসে বিভিন্ন স্থানের পাখি প্রেমিরা।

জনবহুল বোরহানউদ্দিন পৌরসভার কোলজুড়ে ৫ নম্বর ওয়ার্ডে ভূমি অফিস চত্বর। পেছনে বহমান ‘কালিগঞ্জ’ খাল। সামনে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ভবন। মধ্যে রাস্তা। সহকারী কমিশনারের কার্যালয়ে ঢোকার মুখেই বুনো গন্ধ এসে নাকে লাগে। পাখি ও বিষ্ঠার তীব্র গন্ধ। পাখির কলকাকলি বুঝিয়ে দেয় এ এলাকায় শুধু মানুষই বাস করেন না, এটি পাখিদেরও আবাসস্থল। মানুষ ও পাখির সহাবস্থানে তৈরি হওয়া প্রাকৃতিক পরিবেশের এক বাসভূমি।

সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, গাছগুলোর মগডালে শত শত পাখি ঘর বেঁধেছে। ইতোমধ্যেই পাখিরা দখল করে নিয়েছে পোস্ট অফিসের গাছসহ পাশাপাশি আরও কিছু এলাকা। নির্ভয়ে পাখিগুলো প্রায় ১০ বছর ধরে স্থায়ীভাবে বসবাস করে আসছে বলে জানালেন সিনিয়র সাংবাদিক শিমুল চৌধুরী ও সাবেক কাউন্সিলর সাইদুর রহমান লিটন। পাখীদের এ অবাধ বিচরণ মুগ্ধ করেছে এলাকার বাসিন্দাদের।

মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে বকপক্ষী

স্থানীয়রা জানান, পাখিদের কলকাকলিতে স্থানীয়দের ঘুম ভাঙে। ব্যস্ততম সড়কের ওপরের বিশাল আয়তনের গাছজুড়ে পাখিদের বসবাস। চলাচলকারীদের গায়ে পাখিদের মল পড়লেও তারা বিন্দুমাত্র অপ্রস্তুত হন না। তারা আনন্দের সঙ্গেই তা মেনে নেন। দূরদূরান্ত থেকে উৎফুল্ল মানুষ এসে পাখিদের কলকাকলি উপভোগ করছেন। ভিড় করছেন পাখি প্রেমিরাও। কেউ ছবি তুলে নিচ্ছেন আপন মনে। পাখিরাও যেন মানুষের প্রতিবেশী হয়ে বছরের পর বছর তাদের নিরাপদ আবাস গড়ে তুলেছে। এ যেন এক অন্যরকম উপলব্দি। মন যেন জুড়িয়ে যায়। এমন জনবহুল এলাকায় পাখিদের নিরাপদ আবাস স্থল অবাক করার মতো।

সহকারী কমিশনারের কার্যালয়ের পাশের চা দোকানী মাহাবুব হোসেন ও অলিউল্যাহ বলেন, ১০ থেকে ১৫ বছর যাবত পাখিগুলো এখানে বাসা বেঁধে থাকছে। পাখি খুবই নিরাপদে থাকে। নিজেরা কোনো পাখি মারেন না, কাউকে মারতেও দেন না। পাখিগুলো দিনরাত কিচিরমিচির করে। এই শব্দ তাদের ভালো লাগে।

শিক্ষার্থী মাহির আশহাব লাবিব, মাটি, আকাশ, রফিকুল ইসলাম, নিশাত, মহুয়া, তামান্না, বলেন, মুক্ত আকাশে ডানা মেলে উড়ে চলা ও পাখিদের কলকাকলিতে মুখরিত থাকে এই এলাকা। প্রতিষ্ঠান থেকে আসা-যাওয়ার সময় আমরা উপরের দিকে তাকাই। আমাদের অনেক ভালো লাগে।

খুনসুটিতে ব্যস্ত ওরা

সার্ভেয়ার ফিরোজ আলম, অফিস সহকারী সোহাগ, দীর্ঘদিন আমাদের অফিসের চারদিকের গাছগুলোতে পাখিদের আবাসস্থল গড়ে উঠছে। কিচিরমিচির শব্দ ভালো লাগে। গোধূলীর রঙমাখা সময়ে যখন পাখিগুলো ডানা মেলে আপন নীড়ে ফিরে। তখন গাছে গাছে যেন সাদা বকফুল ফুটেছে মনে হয়।

আব্দুল জব্বার কলেজের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নীল কমল পাল, গণিতের মাহমুদুল আল ফারারি বলেন, গাছের ডালে বসে সবুজ পাতার ফাঁকে বকপাখির কোনোটা ধব ধবে সাদা কাশফুলের মতো পেখম মেলে শূন্যে ডানা খুলছে। কোনো বকের মাথা থেকে ঘাড় ও গলার নিচের দিকটা কিছু হালকা খয়েরি বা ইট রঙের মতো দেখতে। মাঝে মধ্যে বিচ্ছিন্নভাবে উড়ে আসছে পানকৌড়ি। এ যেন জীববৈচিত্রের অনন্য দৃষ্টান্ত।

ছানার মুখে খাবার তুলে দিচ্ছে মা

বোরহানউদ্দিন শিল্পকলা একাডেমির সম্পাদক রাজিব রতন দে বলেন, পাখিদের কিচিরমিচির ডাকে মুখরিত হচ্ছে পুরো এলাকা। মানুষ মন ভরে উপভোগ করছেন পাখির ওড়াউড়ি, কলকাকলি আর কিচিরমিচির ডাক। অনেকে পাখিদের অবাধ বিচরণ আর ডানা মেলে উড়ে বেড়ানো কিংবা দলবেঁধে পানিতে ভেসে চলার ছবি ক্যামেরাবন্দি করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। ক্যামেরায় ক্লিক পড়তেই ঝাঁক বেঁধে কিচিরমিচির শব্দে উড়তে শুরু করে আকাশে। পাখিদের বিচরণ ক্ষেত্র সুরক্ষা করার দাবি জানান তিনি।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা কেএম আসাদুজ্জামান বলেন, পাখিরা সাধারণত যেখানে নিরাপদ মনে করে, সেখানেই দীর্ঘদিন অবস্থান করে। ওই এলাকাটি পাখিরা নিরাপদ মনে করে বলেই দীর্ঘদিন যাবত অবস্থান করছে।

নেচার কনজারভেশন কমিটির (এনসিসি) ভোলা জেলা সমন্বয়কারী জসিম জনি বলেন, দেশের পাখি সমৃদ্ধ এলাকার মধ্যে দ্বীপ জেলা ভোলা অন্যতম। তাই এখানে পাখিদের বিচরণ ক্ষেত্র সুরক্ষা করতে হবে।

নিরাপদ আশ্রয়ে পাখিরা

বোরহাউদ্দিন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাইফুর রহমান বলেন, ভোলা একটা গ্রিন প্যালেস। পরিবেশ অনেক সুন্দর। ইকো সিস্টেম অনেক ব্যালেন্স । ফলে পাখিগুলো এখানে এসে থাকছে। বোরহানউদ্দিনের মানুষও অত্যন্ত পরিবেশ সচেতন। ফলে সারাবছরই পাখিগুলো এখানে নির্বিঘ্নে বসবাস করছে। অনেক সময় দেখা গেছে পাখির ডিম পড়ে গেছে কিংবা বাচ্চা পড়ে গেছে তা আমরা আবার পাখিদের বাসায় তুলে দিয়েছি।

ইত্তেফাক/এইচএম