সোমবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২২, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

নিম্নবিত্ত প্রবীণ নারীর চ্যালেঞ্জ

আপডেট : ০১ অক্টোবর ২০২২, ০২:৩৩

নিম্নবিত্ত প্রবীণ নারী বলতে বোঝায়—যারা ভাত, কাপড়, চিকিত্সা, আশ্রয়ের সংকটে আছেন। প্রবীণ নারীর জীবনে চার অধ্যায় রয়েছে। স্বামীসহ জীবন, বিধবা, তালাকপ্রাপ্ত, অবিবাহিত জীবন।

যেসব প্রবীণ নারী স্বামীসহ বসবাস করেন, তারা শারীরিকভাবে অনেকটাই দুর্বল। যৌবনে হাড়ভাঙা খাটুনি, অপুষ্টি, অধিক সন্তান জন্মদানের কারণে অসংক্রামক কয়েকটি রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। ঠিক সময়ে ডাক্তার দেখাতে না পারার কারণে রোগের প্রকোপ বেড়ে যায়। টাকা-পয়সার অভাবে নিয়মিত ওষুধ কিনতে পারেন না। শারীরিক অসুস্থতার জন্য কাজে যেতে পারেন না, ফলে আয়-রোজগার কমে যায়।

প্রবীণাদের মধ্যে বিধবা নারীর সংখ্যা তুলনামূলক ভাবে বেশি। যাদের কম বয়সে স্বামী মারা গেছেন, তারা অনেক কষ্ট সংগ্রাম লড়াই করে ছেলেমেয়ে লালনপালন করেছেন। সেই ছেলেমেয়ে বড় হয়ে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করেছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই প্রবীণা সন্তানের সঙ্গে থাকেন। অল্প কিছুসংখ্যক একাকী থাকেন।

নিম্নবিত্ত প্রবীণাদের মধ্যে তালাকের হার তুলনামূলকভাবে বেশি। কারো কারো একাধিক বিয়ে হয়। তালাকপ্রাপ্ত নারীর জীবন অধিক সংকটময়। ঘর সংসার ভেঙে যাওয়ার কারণে সামাজিক ও পারিবারিক লাঞ্ছনার শিকার হতে দেখা যায়। কাজকর্মে নিয়োজিত হতে না পারার কারণে আয়-রোজগার থাকে না।

অবিবাহিত প্রবীণ নারীরা কম বয়সে আয়-রোজগার করে মা-বাবা, ভাইবোনকে দিয়েছেন। পরবর্তী সময়ে ভাইবোনের ছেলেমেয়েদের দিয়েছেন। আবার কেউ কেউ প্রতারকের খপ্পরে পড়ে সবকিছুু হারিয়েছেন। নিম্নবিত্ত প্রবীণ নারীর সংকট সবচেয়ে বেশি। কর্মজীবনে পিয়ন, আয়া, বুয়া, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, সেবাকর্মী, ক্লিনার, কৃষিশ্রমিক, নির্মাণশ্রমিক বা  পোশাক কারখানার কর্মী হিসেবে চাকরি করতেন। যা কিছু আয় রোজগার করেছেন, তার সবটুকু পরিবারের জন্য, ছেলেমেয়ের জন্য ব্যয় করেছেন। কোনো ধরনের সঞ্চয় ছিল না। এরা চরম আর্থিক সংকট মাথায় নিয়ে জীবন বয়ে বেড়ান। অল্পসংখ্যক নারী বসবাস করার জন্য বৃদ্ধাশ্রমে চলে যান। কিছুসংখ্যক নারী মানুষের দয়া অনুগ্রহ কৃপা গ্রহণ করে বেঁচে আছেন। কেউ কেউ ভিক্ষা করেন। এই ভিক্ষা করা টাকা ছেলেমেয়ে, নাতি- নাতনিদের দিতে দেখা যায়। আবার এই ভিক্ষা করা টাকা প্রতারণা করে নিয়ে যায়। বিশেষ করে যাদের কাছে টাকা জমা রাখা হয়, তারা কেউ কেউ টাকা দিতে অস্বীকার করে।

 ফুটপাতে, বড় দালানের নিচে, রেল স্টেশনে, লঞ্চঘাটে, বাস স্টেশনে প্রবীণাদের রাত কাটাতে দেখা যায়। কখনো কখনো সমাজসেবা বিভাগের লোকজন প্রবীণাদের ধরে নিয়ে ভবঘুরে কেন্দ্রে রাখার চেষ্টা করে।

অসুস্থ প্রবীণ নারী সরকারি হাসপাতালে চিকিত্সাসেবা পাওয়ার জন্য আসেন। হাসপাতালে অব্যবস্থাপনা, হয়রানির অভিযোগ করতে দেখা যায়। রোগ নির্ণয় করার পর যে ওষুধ লাগে, তা কেনার টাকা থাকে না। হাসপাতালে ভর্তি হতে পারলে অনেক সময় সুস্থ হয়ে ফিরে আসতে পারেন। অপুষ্টিজনিত কারণে ঘন ঘন অসুখ-বিসুখে আক্রান্ত হন। প্রবীণরা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন। ছেলেমেয়ে, পুত্রবধূ কিংবা পাড়া প্রতিবেশীর কাছ থেকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার খবর পাওয়া যায়। সহায়-সম্পদ কিছু থাকলে ছেলেমেয়েরা হাতিয়ে নিয়ে যায়।

প্রবীণ নারীকে সেবাকর্মী হিসেবে স্বামীর সার্বক্ষণিক সেবাযত্ন করতে হয়।

ছেলেমেয়ে থাকলে তাদের সন্তানদের দেখাশোনা করতে হয়। রান্নাবান্না, ঘরদোর পরিষ্কার করার কাজ করতে হয়। স্কুলপড়ুয়া নাতি-নাতনিদের স্কুল থেকে বাসায় আনা-নেওয়া করতে হয়। এসব কাজের ফাঁকে মাঝে মধ্যে টেলিভিশনে সিরিয়াল দেখেন। এটাই তাদের একমাত্র বিনোদন। লেখাপড়া না থাকায় নলেজ ওয়ার্কার হিসেবে কাজ করার সুযোগ নেই। কাজ পাওয়া যায় শারীরিক পরিশ্রমের। সেটা সম্ভব হচ্ছে না, কারণ শরীরের শক্তি লোপ পেয়েছে।

অনেকেই বয়স্ক ভাতা পান। সামান্য এই ভাতা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। প্রবীণ নারী সবচেয়ে বেশি অবহেলার শিকার হন।

অসুস্থ হলে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার লোক খুঁজে পাওয়া যায় না। যদিও-বা কেউ হাসপাতালে নিয়ে যান, তবে চিকিত্সা করার টাকা-পয়সা থাকে না। নির্যাতন নিপীড়নের শিকার হলে তেমন কেউ এগিয়ে আসেন না।

পরিবারের সদস্যরা অভাব-অনটনের মধ্যে থাকায় তাদের পক্ষে মায়ের সেবাযত্ন যথাযথভাবে করার সুযোগ থাকে না।

আমরা ভুলে গেছি, এই প্রবীণ নারীরা তাদের যৌবনে কলকারখানায়, সন্তান উত্পাদনে, মাছ চাষে,  পোশাক কারখানায়, বাড়িঘরে, কৃষি জমিতে, হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল পালনে বড় ধরনের ভূমিকা পালন করেছেন। অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে নিজের ঘাম ঝরিয়ে রক্ত পানি করেছেন। দেশের  সম্পদ সৃষ্টিতে, অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রবীণ নারীর এই অবদান স্বীকার করতে চাই না। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সৃষ্ট সম্পদের মালিকানায় সবারই অধিকার থাকা উচিত। উপায়হীন প্রবীণ নারীকে পেছনে ফেলে রেখে উন্নয়ন করা অসম্ভব হবে। উন্নয়ন মানে অল্প কিছুসংখ্যক মানুষের আরাম আয়েশ, ভোগ বিলাস নয়। সব মানুষের সমমর্যাদায় একই সঙ্গে এগিয়ে যাওয়া হলো উন্নয়ন। দেশের অর্থনীতিতে বিশাল অবদান রাখা এই প্রবীণ নারীর দায়িত্ব পরিবারের সদস্যদের ওপর ন্যস্ত করা অমানবিক। এদের দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে সমাজ এবং রাষ্ট্রের।

লেখক :সভাপতি, এজিং সাপোর্ট ফোরাম

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন