সোমবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২২, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

‘খিড়কি থেকে সিংহদুয়ার এই তোমাদের পৃথিবী?’

আপডেট : ০১ অক্টোবর ২০২২, ০২:৫২

মাশা আমিনি। মাত্র ২২ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করে এই তরুণী। কারণ সে হিজাব সঠিকভাবে পরেনি, ফলে তার কেশের অংশবিশেষ দেখা যাচ্ছিল, যা ইরানে নীতিবহির্ভূত। ইরানে ছোট থেকে বৃদ্ধা পর্যন্ত সব নারীকে পর্দাপ্রদা বাধ্যকতামূলকভাবে মানতে হয়, সমস্ত শরীর ঢোলা কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখতে হয়। তবে ২০১৮ সালে আমরা নারীদের একটি দলের সঙ্গে যখন ইরানের ইস্পাহান শহরে গিয়েছিলাম, তখন কিন্তু অসংখ্য আধুনিক ইরানি নারী দেখেছি, যারা মাথায় স্কার্ফ দিয়ে চুল ঢেকেছেন এবং ট্রাউজারের ওপর থেকে নিতম্বের নিচ পর্যন্ত জামা বা শার্ট পরেছেন। বিকেল থেকে রাত ৮টা-৯টা পর্যন্ত নারী-পুরুষরা পরিবার নিয়ে পার্কে অথবা পাবলিক প্লেসে কিংবা বাগানে ফরাস বিছিয়ে ক্যাসেট প্লেয়ার নিয়ে রাতের খাবার খাচ্ছেন পিকনিক স্টাইলে, গান শুনছেন, আনন্দ করছেন। ছেলেরা পরেছে শার্ট জিনস।

ইরানে অসংখ্য নারী মোটরসাইকেল ও গাড়ি চালায়। সেখানে নারীরা যথেষ্ট শিক্ষিত, স্মার্ট এবং অনেকেই কর্মজীবী। ১৯৭৯ সালে ইরানের শাহের পতনের পর আয়াতুল্লাহ খোমেনির সময়কাল থেকে ইরানে ইসলামি বিপ্লব-পরবর্তী শাসনকাল শুরু হয়—যা আজও চলছে। বর্তমান ইরানে রাজনৈতিক দলের প্রধানের বয়স ৯৬ বছর। তার মৃত্যুর পর কী হবে কে জানে। তবে কয়েক দিন আগে মাশা আমিনির ঘটনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কার্নেগি মেলন বিশ্ববিদ্যালয়ে (Carnegie Mellon University) ইরানের এক অধ্যাপকের সঙ্গে কথা বলছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতনামা সাংবাদিক ও লেখক ফরিদ জাকারিকা। সেই আলোচনা থেকে বোঝা গেল বর্তমান ইরানে রাষ্ট্রপ্রধানের অবস্থা খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। নারীশক্তির অবদমন অনেক দিন ধরেই করে চলেছেন তারা। আজ ইরানের নারীরা গান পর্যন্ত গাইতে পারেন না। সাংস্কৃতিক চর্চায় নারীদের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ। অথচ সভ্যতা ও শিক্ষা-সংস্কৃতির চারণভূমি এই পারস্য দেশ। সে দেশেই আজ নারীকে দমন করে রাখার জন্য নৈতিকতা পুলিশ ফোর্স ব্যবহৃত হয়। সামান্য মাথায় চুল স্কার্ফের ভেতর দিয়ে দেখা যাওয়ার পরিণতিতে মাশা আমিনিকে গ্রেফতার করে। অত্যাচারের কারণে তিন দিনের মাথায় তার মৃত্যু হয়। আমিনির এই মৃত্যু সমস্ত ইরানি নারীর মধ্যে এত দিনের অবদমিত ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলেছে, চরম আন্দোলনের সূত্রপাত করেছে। এখন পর্যন্ত ৫০ জন নারী এই প্রতিবাদের ফলস্বরূপ মৃত্যুবরণ করেছে। যদিও মরাল সিকিউরিটি পুলিশের প্রধান চাকরি থেকে বরখাস্ত হয়েছেন বলে বলা হচ্ছে। তবে ইরান সরকার পুলিশের এ অপবাদের কথা অস্বীকার করেছে। কিন্তু এ আন্দোলন যেভাবে বিশ্বের সব স্থানে ইরানি নারীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে, তাতে মনে হয় এ আন্দোলন সহজে থামবে না। বিপুলসংখ্যক নারী তাদের মাথার হিজাব খুলে ফেলেছে। অনেকেই তাদের চুলও কেটে ফেলছে। পশ্চিমা দেশগুলোতে অনেক নারী তাদের পরিধেয় বস্ত্র খুলেও প্রতিবাদ করছে। যদিও এতে করে ইরানে যে নারীদের নিপীড়ন বন্ধ হবে—সেটা মনে হয় না, সহজে হচ্ছে। এসব কথা ইরানের ঐ অধ্যাপকের সঙ্গে ফরিদ জাকারিকার আলোচনায় উঠে এসেছে। 

নারীকে অবদমন করে রাখাটা পুরুষশাসিত সমাজের সবচেয়ে পুরোনো ষড়যন্ত্র। সেই আঠারো শতাব্দী থেকেই উপমহাদেশের সতীদাহ প্রথা এবং বিধবা বিবাহ ও নারীশিক্ষার জন্য রেনেসাঁর প্রয়োজন হয়েছিল। যে কারণে আমরা বাঙালি সমাজ বারে বারে রাজা রামমোহন রায় এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। যে আদর্শলিপি পড়ে বিংশ শতাব্দীতে আমরা স্বরবর্ণ, ব্যঞ্জনবর্ণ, নীতিকথা, সংখ্যা, নামতা—সবই শিখতে পারতাম, আজ সেই একটি বইয়ের স্থানে ১০টা বই পড়েও শিশুরা কি খুব বেশি কিছু শিখছে? ধর্ম কি ভয় দেখিয়ে চাপানো যায়? পাপ-পুণ্য কি এত সহজেই দাঁড়িপাল্লায় নিক্তিতে মাপা যায়।

ধর্মচর্চা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। ধর্মের নৈতিক ও সততার দিকগুলো আমাদের মানবিক ও ভালো হতে সহায়তা করে। কিন্তু কোনো কিছু নিয়েই বাড়াবাড়ি ভালো নয়। বাংলাদেশের এখন প্রায় সবাই ভীষণ ধার্মিক। এটা অবশ্যই ইতিবাচক দিক। তবে আচরণের পাশাপাশি মননেও তো ধর্মের সত্য-সুন্দর দিকগুলো ধারণ করা চাই। কারণ সত্যিকারের ধার্মিকের সংখ্যা বাড়লে তো দেশে অন্যায়-অনাচার, দুর্নীতি, অসততা, অমানবিকতা কমার কথা। সেটা কেন কমছে না? আজকাল যেনতেন উপায়ে অর্থোপার্জনের প্রতিযোগিতা দেখতে পাই। ন্যায়-অন্যায় বোধ লোপ, বিচারহীনতা, পুলিশি অত্যাচার, দুর্নীতি, গ্রামগঞ্জ থেকে বিমানবন্দর বাজারহাট পর্যন্ত সকল স্থানেই লোমহর্ষক ঘটনা প্রতিদিন কাগজে প্রকাশিত হচ্ছে। ধর্মান্ধতা ও কূপমণ্ডুকতা, অপ্রয়োজনীয় আচার, বিশ্বাস ও সংস্কার মানুষকে বিভ্রান্ত করে। জীবন ও জগেক সহজ ও সোজাভাবে দেখাই তো আমাদের আদর্শ হওয়া উচিত। ধর্ম যার যার, বেঁচে থাকার অধিকার সর্বজনীন। ইসলামে পোশাকের শালীনতা নারী-পুরুষনির্বিশেষে সবাইকে পালন করার কথা বলা হয়েছে। এটা খুবই ভালো বিষয়। কারণ, আমাদের তো সমাজে বাস করতে হয়। তবে কোনো আচার ও বিধি চাপিয়ে দিলে তা একপর্যায়ে শ্বাসরুদ্ধকর হয়ে ওঠে। কেবল নারীকে কেন সব বাধানিষেধের বেড়াজালে আবদ্ধ করার প্রবণতা দেশে দেশে যুগে যুগে চলে এসেছে? আজকের বিশ্বে নারীকে জনসম্পদ বা হিউম্যান রিসোর্স হিসেবে দেখা হয়। একটি পরিবারে নারীর অনুপস্থিতি পরিবারটিকে অকার্যকর করতে পারে। নারী হচ্ছে প্রতিটি পরিবারের স্তম্ভ। তাই একে সম্পদ ও সম্ভাবনাই ভাবা বুদ্ধিমানের কাজ। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এটা রন্ধ্রে রন্ধ্রে উপলব্ধি করেন। আজ বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে তার লৌহমানবী হয়ে ওঠা এবং গত দুই যুগের বেশি সময় বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতা সেই নারীশক্তির কথাই বারবার স্মরণ করিয়ে কি দেয় না? তিনি কি আপাদমস্তক কাপড়ে আবৃত করে বহির্বিশ্বে নিজেকে নিয়ে যাচ্ছেন; এ বছর জাতিসংঘে যেটা উঠে এসেছে ‘নারী নেতৃত্বের জয় জয়কার’ হিসেবে?

সম্প্রতি ইসলামিক ঐতিহ্যের দেশ উজবেকিস্তানের বিভিন্ন শহরে বেড়িয়ে এলাম। ইসলামের ইতিহাসের নানা নিদর্শনের স্থান এই দেশটি। ইমাম আল বুখারির জন্মস্থান উজবেকিস্তানের ‘বুখারা’ শহরে, ৮১০ খ্রিষ্টাব্দে। তিনি তার জীবনের শেষ দিনগুলো সমরকন্দে থেকেছেন। তিনি হজরত মোহাম্মদ (সা.)-এর সকল হাদিসের সর্বপ্রথম সংগ্রহকারী। তিনি প্রথমে ৭ হাজার ২৭৫টি হাদিস সংগ্রহ করেন। জীবনের ৪২টি বছর তিনি এই হাদিস সংগ্রহের কাজেই নিযুক্ত ছিলেন। বাগদাদ, দামেস্ক ও বসরা ভ্রমণ করেন তিনি হাদিস সংগ্রহের জন্য। ইমাম আল বুখারির লেখা সহিহ (Sahih) হাদিস হচ্ছে আল-কোরআনের পর দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় গ্রন্থ। ১৯৯৪ সালে ইমাম বুখারির ১২২৫ বছর উদযাপিত হয় উজবেকিস্তানে। আমরা বাহাউদ্দিন নকশবন্দের মসোলিয়ামেও (mausoleum) গিয়েছিলাম সমরকন্দ শহরে। বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (১৩১৮-১৩৮৭) ছিলেন সুফিজম প্রচারের ক্ষেত্রে একজন আধ্যাত্মিক পির, জ্ঞানী ব্যক্তিত্ব। তাকে ‘শাহ-ই-নকশবন্দি’ বলে জানে ইসলামি বিশ্বে। তার শিক্ষার মূলমন্ত্র ছিল ‘আল্লাহ তোমার হৃদয়ে এবং তোমার হাতে; কর্মের মাধ্যমে।’ তার একটি উদ্ধৃতি সেখানে লিখিত ছিল :Occupy your heart with Allah and your hands with work.

আমার কাছে এ কথার মানে হলো—কর্মই ধর্ম, ধর্মই কর্ম। ভালো কাজের মধ্যেই সৃষ্টিকর্তাকে খুঁজে পাওয়া যায়। আর একটি সুন্দর বচন আমার মনকে নাড়া দিয়েছে, যা সেখানে লেখা আছে, No one can be a Muslim until he governs his greed। ‘যতক্ষণ তুমি লোভ সংবরণ করতে পারবে না, ততক্ষণ তুমি একজন সঠিক মুসলিম অর্থাৎ মোমেন মুসলমান নও।’

ইদানীং ছাত্রছাত্রী আবাসগুলোতে যে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার, ভিআইপি কালচার, ধর্ম বা মানুষকে ভালোবাসা অপেক্ষা টাকার প্রতি ভালোবাসাটাই বড় হয়ে উঠেছে। আমরা যদি আমাদের লোভ সংবরণ করতে না পারি, এই যদি হয় বাস্তব অবস্থা—তাহলে আমরা সঠিক মুসলমান হতে পারব কী করে? আজ যখন পথেঘাটে ধর্মের নামে লেবাস ও নানা আয়োজন মানুষের চলনে বলনে দেখি, আর খবরের কাগজে সামান্য জমি নিয়ে খুন, বিভিন্ন দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থোপার্জনের খবর দেখি, তখন মনে হয়—সত্যি কি আমরা আল্লাহকে ভয় পাই? ভয় পেলে তো এত বাড়াবাড়ি, এত অনিয়ম-দুর্নীতি ও খারাপ কাজ আমাদের করারই কথা নয়। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিভৃতে নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে—আসলেই আমরা প্রকৃত ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত মানুষ হতে পারছি? এই নিবন্ধটি লেখার সময় হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা একটি পুরোনো গানের কলি কানে বাজছে :

‘খিড়কি থেকে সিংহদুয়ার

এই তোমাদের পৃথিবী

এর বাইরে জগৎ আছে তোমরা মানো না

... তোমরা নিজেই জানো না।’

লেখক : সম্পাদক, দৈনিক ইত্তেফাক ও পাক্ষিক অনন্যা

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন