সোমবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২২, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

এই অপচয়ের ব্যত্যয় ঘটিবে কবে!

আপডেট : ০১ অক্টোবর ২০২২, ০২:৫৯

বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকট চলিতেছে। আমদানি-রপ্তানি ব্যয়, পণ্যমূল্য বৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতিসহ সকল ধরনের সংকট বাংলাদেশকেও দুর্বল করিয়া তুলিয়াছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় সংযমের কথা, কৃচ্ছ্রসাধনের কথা বলা হইয়াছে বারংবার। কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতিটা কী? বিভিন্ন ক্ষেত্রে কতটা সংযম আমরা দেখিতে পাইতেছি? সরকার উন্নয়নমূলক কাজে, সংস্কারমূলক কাজে বরাদ্দ দিয়া থাকে। সেই ক্ষেত্রে সকল নিয়মকানুনই ‘মঞ্চায়িত’ হয়। প্রস্তাবিত অর্থের বিষয়ে অর্থ বিভাগের অনুমোদন গ্রহণ হইতে শুরু করিয়া দরপত্র আহ্বান পর্যন্ত সকল নিয়ম মানিয়াই করা হয়। কিন্তু প্রতিপদেই শুভংকরের ফাঁকি দেখিতে পাওয়া যায়। বহু ক্ষেত্রে কাজ অসমাপ্ত রাখা, নিম্নমানের কাজ করা, দরপত্রের সঙ্গে সংগতি রাখিয়া দ্রব্য ব্যবহার না করা, নির্দিষ্ট সময়ে কাজ সম্পন্ন করিয়া হস্তান্তর না করিয়া বিল তুলিয়া লওয়া যেন নিয়ম হইয়া দাঁড়াইয়াছে। ইহার মধ্যে সবচাইতে প্রকট হইল কাজ দরপত্র অনুসারে পুরোটা না করিয়া বিল তুলিয়া লওয়া। অথচ এই সকল কাজ যাহাতে সুষ্ঠুভাবে, নিয়মানুসারে এবং যথাযথভাবে সম্পন্ন হয় তাহা তত্ত্বাবধানের জন্য রহিয়াছে প্রান্তিক পর্যায়ের ওয়ার্ক অ্যাসিস্ট্যান্ট, উপসহকারী প্রকৌশলী, উপজেলা প্রকৌশলী; জেলা পর্যায়ে সহকারী প্রকৌশলী, নির্বাহী প্রকৌশলী হইতে শুরু করিয়া তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, প্রকল্প পরিচালকসহ চেইন অব অফিসার্স। তাহাদের মাথার উপর রহিয়াছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। তাহাদের জন্য রহিয়াছে দৃষ্টিনন্দন সকল ভবন। এই সকল ‘বজ্র আঁটুনি, ফসকা গিরো’র মধ্য দিয়াই একশ্রেণির ঠিকাদার কোনো কোনো কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশে সরকারি অর্থের অপচয় ঘটাইতেছেন। এই চিত্র কাহার নিকট অজানা? অথচ যেই সকল সরকারি কর্মকর্তা এহেন কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হইতেছেন তাহাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ দেখা যায় না কেন? দেশ স্বাধীন হইয়াছে ৫২ বৎসর হইতে চলিল, আর কত? এই যে অপচয় ইহা যদি ৫০ শতাংশও কমাইয়া আনা যাইত, তাহা হইলে সংকট অনেকাংশেই সামাল দেওয়া যাইত।

প্রকল্প-সম্পর্কিত গাইডলাইনে প্রকল্পকে সংজ্ঞায়িত করিয়া বলা হইয়াছে, ‘কোনো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য পূরণের জন্য প্রণীত ও পরিকল্পিত বিনিয়োগ কর্মপন্থাসমূহকে প্রকল্প বলা হয়। প্রকল্প এক বা একাধিক উদ্দেশ্যকে সামনে রাখিয়া নির্দিষ্ট সময় শুরু করিয়া নির্দিষ্ট সময়ে শেষ করিতে হয়।’ দুঃখের বিষয়, প্রকল্প সংক্রান্ত এই দর্শনই আমাদের প্রকল্পগুলিতে অনুপস্থিত। আমরা জানি, একটি নিবন্ধিত লাইসেন্সধারী ঠিকাদার বা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে কোনো কাজ গ্রহণ করিয়া দেখা যায় অন্য কোনো ব্যক্তি সেই কাজ করিয়াছেন, অথবা কাজ অর্ধ সমাপ্ত রাখিয়া নয়ছয় করিয়া অর্থ তুলিয়া লইয়াছেন। এই ধরনের ঘটনা সচরাচর দেখা যায়। অথচ ঠিকাদারের সেই লাইসেন্স কেন কালো তালিকাভুক্ত করা হয় না! এতে কোনোই সন্দেহ নাই যে যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করিলে, যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করিলে এই বিশৃঙ্খল অবস্থা থাকিতে পারে না। দেশব্যাপী যেই প্রতিষ্ঠানগুলির লাইসেন্সে অর্ধেক বা তাহারও কম কাজ করিয়া অর্থ তুলিয়া লওয়া হইতেছে, যাহারা কাজ লইয়া দরপত্র অনুসরণ করিতেছে না এবং যেই সকল সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এহেন কুকর্মের সঙ্গে জড়াইয়া পড়িতেছেন, তাহাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে। তাহা হইলেই ট্যাক্সপেয়ারদের মূল্যবান অর্থের অপচয় রোধ হইবে। আমরা মনে করি, এই ধরনের অপচয় রোধ করাই সংযম প্রদর্শনের প্রধান শর্ত।

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন