শনিবার, ২৬ নভেম্বর ২০২২, ১১ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

আইনের চোখে ‘গ্রেফতার’ ও আইনি সচেতনতা

আপডেট : ০৩ অক্টোবর ২০২২, ০৩:৪৫

আমাদের সমাজে বহুল প্রচলিত একটি আইনি শব্দ হচ্ছে ‘গ্রেফতার’। ফরাসি শব্দ এরেটার (arreter) থেকে এরেস্ট (arrest) বা গ্রেফতার শব্দটি উদ্ভূত; যার কোনো সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা আইনে উল্লেখ নেই। সাধারণ ভাষায় বলা যায়, কোনো ব্যক্তির অবাধ স্বাধীনভাবে চলাচল রুদ্ধ করার আইনিপ্রক্রিয়ার নামই হচ্ছে ‘গ্রেফতার’ করা বা ‘আটক’ করা।

বাংলাদেশের মানুষ সাধারণত দুইভাবে গ্রেফতার হয়। ১. আদালতের ওয়ারেন্ট সহকারে গ্রেফতার, ২. আদালতের ওয়ারেন্ট ব্যতীত বা বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার। এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ সালের আইনের ৭৫ ধারায় গ্রেফতারি পরোয়ানা বা ওয়ারেন্ট সম্পর্কে বলা হয়েছে। কোনো ব্যক্তিকে আদালতে উপস্থিত করার জন্য আদালত কর্তৃক জারিকৃত লিখিত আদেশনামাকে আইনের ভাষায় ওয়ারেন্ট বলা হয় এবং এমন আদেশনামায় আদালতের প্রিসাইডিং কর্মকর্তার স্বাক্ষর ও সিল থাকে। একই সঙ্গে ওয়ারেন্ট কার্যকরের ক্ষেত্রে সেই সময় পর্যন্ত ওয়ারেন্ট বা পরোয়ানা কার্যকর থাকে, যতক্ষণ পর্যন্ত উক্ত ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা না হয় বা আদালত নিজে গ্রেফতারি পরোয়ানা বাতিল না করে।

ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ অনুসারে ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ অথবা ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গ গ্রেফতার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে থাকেন। গ্রেফতারের পদ্ধতি সম্পর্কে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৬(১) ধারায় বলা হয়েছে, কথা বা কাজের দ্বারা যদি গ্রেফতার করা সম্ভব হয় তবে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গ্রেফতারকৃত ব্যক্তির দেহ স্পর্শ করতে পারবে না। তবে যদি কোনো ব্যক্তি গ্রেফতারের সময় বাধার সৃষ্টি করে বা গ্রেফতার এড়ানোর চেষ্টা করে তাহলে উক্ত কার্যবিধির ৪৬(২) ধারা অনুসারে, গ্রেফতার নিশ্চিতের জন্য প্রয়োজনীয় সব পন্থা অবলম্বন করার ক্ষমতা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর থাকবে। ৪৬(৩) ধারায় আরো বলা হয়েছে যে, মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় অপরাধে অভিযুক্ত না হলে গ্রেফতার নিশ্চিতের জন্য অস্ত্রের প্রয়োগ বা কারো মৃত্যু ঘটানো যাবে না।

গ্রেফতারকৃত ব্যক্তি যদি গ্রেফতারের পর পালানোর চেষ্টা করে তবে কার্যবিধির ৫০ ধারা এবং পুলিশ রেগুলেশন অব বেঙ্গল (পিআরবি)-এর ৩৩১ নং প্রবিধান অনুসারে পলায়ন রোধে যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু বাধা প্রদান করা যাবে কিন্তু তার অধিক বাধা প্রদান করা যাবে না। সহজ ভাষায় যতক্ষণ পর্যন্ত অস্ত্রের প্রয়োগ বা আঘাত দানের দরকার না পড়ে ততক্ষণ পর্যন্ত অস্ত্রের প্রয়োগ বা আঘাত দান করা যাবে না। গ্রেফতারকৃত ব্যক্তি যদি গ্রেফতারের পর পলায়ন করে তবে পলায়নকারী ব্যক্তিকে অনুসরণ করে বাংলাদেশের যে কোনো স্থানে তাকে পুনরায় গ্রেফতার করা যাবে। গ্রেফতারকৃত ব্যক্তি যদি তার নিজের গ্রেফতার প্রক্রিয়ায় বাধার সৃষ্টি করে তবে তাকে দণ্ডবিধির ২২৪ ধারা অনুসারে ২ (দুই) বত্সর পর্যন্ত যে কোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারদণ্ড বা অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা যাবে। সেই সঙ্গে কোনো ব্যক্তি যদি অপর ব্যক্তির আইনসংগত গ্রেফতারে প্রতিরোধ বা বিঘ্ন সৃষ্টি করে, তবে তাও হবে একটি গুরুতর অপরাধ, যার শাস্তি দণ্ডবিধির ২২৫ ধারা অনুসারে নিশ্চিত করা হবে।

বাংলাদেশের ফৌজদারি কার্যবিধিতে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে গ্রেফতার করার অধিকার প্রদান করেনি। উক্ত কার্যবিধির ৫৯ ধারা গুরুতর অপরাধ এবং ঘোষিত অপরাধীদের গ্রেফতার বা আটক করার সাধারণ ক্ষমতা গণমানুষেরও প্রদান করেছে। অর্থাত্ সাধারণ মানুষও কোনো চিহ্নিত অপরাধীকে গ্রেফতার করে আইনের হাতে তুলে দিতে পারে। তবে সে ক্ষেত্রে শর্ত থাকবে যে, আটক ব্যক্তিকে বিলম্ব না করে পুলিশ অফিসারের নিকট অথবা নিকটতম থানায় দ্রুততম সময়ে হস্তান্তর করতে হবে।

কোনো অপরাধীকে গ্রেফতার করার জন্য পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্ষমতাকে আরো বেগবান করার লক্ষ্যে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৭ এবং ৪৮ ধারায় বলা হয়েছে যে, যুক্তিসঙ্গত কারণসাপেক্ষ গ্রেফতার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য যে কোনো স্থানে তল্লাশি কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে এবং সাধারণ মানুষ এই ধরনের কাজে সহযোগিতা করার জন্য বাধ্য থাকবে। যদি গ্রেফতারের লক্ষ্যে তল্লাশি কার্যক্রম পরিচালনার সময় বাধা প্রদান করা হয় তবে কোনো স্থানের দরজা জানালা ভেঙে তল্লাশি কার্যক্রম পরিচালনা করাও আইনসম্মত হবে।

গ্রেফতারের পর গ্রেফতারকারী অফিসার ফৌজদারি কার্যবিধির ৫১ ধারা অনুসারে গ্রেফতারকৃত ব্যক্তির দেহতল্লাশি করতে পারেন এবং প্রয়োজনীয় পরিধেয় বস্ত্র ছাড়া তার নিকট যা পাওয়া যাবে, তা নিরাপদ হেফাজতে রাখবেন। আসামি যদি মহিলা হন তবে এমন প্রকার তল্লাশি কার্যক্রম কার্যবিধির ৫২ ধারা অনুসারে অবশ্যই মেয়েদের দিয়েই করাতে হবে। মহিলাদের দেহতল্লাশির সময় সব ধরনের শালীনতা রক্ষা করতে হবে এবং সে সময় কোনো পুরুষ লোক সেখানে থাকতে পারবে না। কোনো মহিলার হাতে যদি ধর্মীয় প্রতীক হিসেবে শাঁখা বা কাঁচ বা লোহার চুড়ি থাকে, তা খুলতে বলা যাবে না।

গ্রেফতারের পর আটক ব্যক্তিকে হাতকড়া পরানো হয়। হাতকড়া বা দড়ির ব্যবহার আমাদের সামাজিক দৃষ্টিতে অমর্যাদাকর। সে জন্য পুলিশের হাতকড়া ব্যবহারের জন্য রয়েছে কিছু নিয়মকানুন। পুলিশ রেগুলেশন অব বেঙ্গল (পিআরবি)-এর ৩৩০ নং প্রবিধানে হাতকড়ার ব্যবহার সম্পর্কে বলা হয়েছে, জামিনযোগ্য মামলায় গ্রেফতারকৃত ব্যক্তির ক্ষেত্রে হাতকড়া ব্যবহার করা যাবে না। উক্ত প্রবিধানে আরো বলা হয়েছে, কোনো অবস্থাতেই মহিলাদের হাতকড়া লাগানো যাবে না, সেই সঙ্গে যাদের বয়স কম বা দুর্বলতার কারণে যাদের নিরাপত্তা রক্ষা করা সহজ, তাদের ক্ষেত্রেও হাতকড়া পরানো উচিত হবে না। কোনো সাক্ষীকে আদালতে উপস্থিত করার জন্য পরোয়ানা জারি করা হলে উক্ত সাক্ষীকেও হাতকড়া পরানো যাবে না। অ-জামিনযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার পরিমাণ  বিবেচনায় রেখে হাতকড়া পরাতে হবে। শিশু আইন, ২০১৩-এর ৪৪(৩) ধারা শিশুদের হাতকড়া পরানো সম্পর্কে স্পষ্টভাবে আরো উল্লেখ করে যে, শিশু আইন অনুসারে কোনো শিশুকে গ্রেফতারের পর কোনোভাবে বা কোনো অবস্থাতেই হাতকড়া বা কোমরে দড়ি লাগানো যাবে না।

গ্রেফতারের পর আটক ব্যক্তিকে আদালতে পাঠানোর আগে থানা বা ফাঁড়ির হাজতখানায় রাখা হয়। থানা বা ফাঁড়ির হাজতখানায় প্রত্যেক বন্দির জন্য ৩৬ বর্গফুট স্থান থাকার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সেই সঙ্গে থানার হাজতখানার বাইরে বাংলা এবং ইংরেজিতে লটকানো রাখতে হবে উক্ত হাজতখানায় কত জন বন্দি থাকার অনুমতি সরকার দিয়েছে। গ্রেফতারকৃত মহিলা এবং পুরুষ বন্দিদের হাজতে অবশ্যই আলাদা থাকার ব্যবস্থা থাকতে হবে।

আদালতে পাঠানোর আগে পুলিশ রেগুলেশন অব বেঙ্গল (পিআরবি)-এর ৩২৮ প্রবিধান অনুসারে থানা বা ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গ্রেফতারকৃত সব বন্দির নিরাপদ জিম্মার জন্য দায়ী থাকবেন। কোনো বন্দিকে থানায় আনার পর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার প্রথম দায়িত্ব থাকে বন্দির দেহে কোনো প্রকার আঘাতের চিহ্ন আছে কি না তা পরীক্ষা করা। সেই সঙ্গে গ্রেফতারকৃত বন্দির হাজতখানা থেকে পলায়ন বা আত্মহত্যার কাজে সহায়ক হতে পারে এমন বস্তু লুকানো আছে কি না, তা নিবিড়ভাবে পুনরায় তল্লাশি করে দেখা। পুলিশ প্রবিধান আরো উল্লেখ করে যে, বন্দির দেহের আঘাতের পরীক্ষা অবশ্যই উপযুক্ত ব্যক্তি বা সাক্ষীর সামনে করতে হবে। যদি আঘাতের চিহ্ন থাকে তবে চিকিত্সার ব্যবস্থা করার জন্য থানা কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে।

পরিবেশ পরিস্থিতির বিবেচনায় ভিন্ন কোনো কিছুর দরকার না হলে গ্রেফতার বা আটকের পর সাধারণত এই সব আইনি দিক লক্ষ্য করেই একটি আটক বা গ্রেফতারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়ে থাকে। অপরাধীদের গ্রেফতার করার সংবাদ যেমন আমাদের কাছে আনন্দের তেমন বিনা অপরাধে গ্রেফতার করার সংবাদ সমাজ জীবনের জন্য ভীতিকর। কিছু ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে রয়েছে গ্রেফতারের নামে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করার অভিযোগ। অপরাধ দমনের জন্য এবং সমাজজীবনে দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করার জন্য অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করা হয়, যেন পরবর্তী সময়ে অপরাধ করতে মানুষ নিরুত্সাহিত হয়। অপরাধ, অপরাধী, গ্রেফতার এবং বিচার একুই সুতায় বাধা কার্যক্রম। আমরা যদি সমাজকে অপরাধমুক্ত করতে চাই, অসহায় মানুষদের আইনি জটিলতা থেকে রক্ষা করতে চাই, তাহলে আইন সম্পর্কে সচেতন হওয়ার বিকল্প কোনো পন্থা আমাদের হাতে নেই এবং মানুষের আইনি সচেতনতাই হতে পারে সহজ সরল বিচারব্যবস্থার প্রথম ধাপ।  

লেখক : আইনজীবী; জজ কোর্ট, ঢাকা

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন