সোমবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২২, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

এই পরিস্থিতি হইতে জাতি কি পরিত্রাণ লাভ করিবে না?

আপডেট : ০৩ অক্টোবর ২০২২, ০৪:০৫

গণতান্ত্রিক সমাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হইল আইনের শাসনের প্রতিষ্ঠা লাভ। আইনের প্রতি আমাদের যেমন শ্রদ্ধাশীল হওয়া উচিত, তেমনি আইন তাহার নিজস্ব গতিতে চলিবে ইহাই নিয়ম। দেশে মাঝেমধ্যেই এমন সকল খুনখারাবির কথা সংবাদপত্রে ছাপা হয়, যাহা দেখিয়া আমাদের গা শিহরিত হইয়া উঠে। সেই খুনের বিপরীতে মামলা হয়, অভিযুক্ত ব্যক্তি গ্রেফতারও হয় যথাসময়ে; কিন্তু পরবর্তী সময়ে আমরা জানিতে পারি, সেই অভিযুক্ত ব্যক্তি খুব সহজেই জামিনে ছাড়া পাইয়া গিয়াছে। এমনকি জামিন পাইয়াই সে আরো বেপরোয়া হইয়া উঠিয়াছে। নূতন করিয়া জড়িত হইয়া পড়িয়াছে একের পর এক অপরাধকর্মে; কিন্তু তাহার পরও তাহার জামিন পাইতে কোনো অসুবিধা হয় না। ইহাতে সে যখন ছাড়া পাইয়া সমাজে দর্প ভরিয়া চলাফিরা করে, তখন বাদী আরো আতঙ্কগ্রস্ত হয়। সমাজের মানুষ হয় ভীতসন্ত্রস্ত। এইভাবে এমন অপরাধীর বারংবার জামিন পাইবার বিষয়টি কি গভীরভাবে ভাবিয়া দেখা যায় না?

সাধারণত জামিন হইল একজন গ্রেফতারকৃত বা কারাগারে আটক কোনো ব্যক্তিকে মামলার ধার্য তারিখে বা আদালতের আদেশ মোতাবেক হাজির থাকিবার শর্তে কোনো জামিনদারের মুচলেকায় ছাড়িয়া দেওয়া। ফৌজদারি কার্যবিধির ৪২৬, ৪৯৬, ৪৯৭, ৪৯৮, ৪৯৯, ৫০২ ও ৫১৪ ধারায় জামিন বিষয়ে বিস্তারিত বলা হইয়াছে। বিশেষ করিয়া ৪৯৭ ধারায় জামিনের অযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে কীভাবে জামিন মঞ্জুর করা যাইবে সেই সম্পর্কে সুস্পষ্ট বিধান তুলিয়া ধরা হইয়াছে। সেই অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় কোনো অপরাধে অপরাধী বলিয়া বিশ্বাস করিবার মতো যুক্তিসংগত কারণ থাকিলে তাহাকে মুক্তি দেওয়ার নিয়ম নাই। তবে এখানে আদালতের বিবেচনামূলক ক্ষমতাকে প্রাধান্য দেওয়া হইয়াছে। অভিযুক্ত ব্যক্তির পালানোর বা সাক্ষীদের ভয়ভীতি দেখাইয়া অভিযুক্তের পক্ষে সাক্ষ্য জালিয়াতি করিবার কোনো আশঙ্কা আছে কি না অথবা উভয় পক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় কি না, তাহা আদালতকে বিবেচনায় আনিতে হয়; কিন্তু জামিনের ক্ষেত্রে আইনের চর্চা তেমন নাই বলিয়া অনেকে অভিযোগ করেন। আইনের ফাঁকফোকর ও অপব্যবহারের কথা কে না জানেন। আবার জামিন লইয়া জালিয়াতির ঘটনাও ঘটিতে দেখা যায়।

এইরূপ কোনো আসামি যখন জামিন পাইয়া যায়, তখন স্বভাবতই সমাজে ন্যায়-অন্যায় সম্পর্কে নানা গুঞ্জন উঠে। অর্থের বিনিময়ে সেই জামিন দেওয়া হইয়াছে কি না—সেই প্রশ্নও উঠিতে দেখা যায়। তথাকথিত অনেক প্রভাবশালী লোকের নিকট সেই অর্থ হাতের ময়লা ছাড়া আর কিছুই নহে। বিষয়টি আমাদের অজানা—এমনটি বলা কঠিন। ইহা দেখভালের জন্য এসপি, ডিআইজি ও আইজি পর্যন্ত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ রহিয়াছেন, আইন বিভাগেও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ রহিয়াছেন। তাহারা এই সকল ঠিক করেন না কেন? অবশ্য এই সমস্যা শুধু দুই-একটি মন্ত্রণালয়ের নহে, অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এখানে আমরা কাহারও জামিন পাইবার অধিকারের বিরোধিতা করিতেছি না। আইনের প্রতি মান্যতা, অভিজ্ঞতা ও বিবেক-বিবেচনার ভিত্তিতে মাননীয় বিচারকগণ যে কাহাকেও জামিন দিতে পারেন; কিন্তু জামিন পাইয়া সে কী করিল না করিল, সেই সম্পর্কে পুলিশের কোনো রিপোর্ট থাকিলে তাহাকে আমল নেওয়াও কি উচিত নহে? যাহার বিরুদ্ধে গোটা তিনেক খুনের মামলা রহিয়াছে, তাহাকে কেন চতুর্থ বারের মতো জামিন দেওয়া হইবে? ইহাতে সমাজে যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়, তাহার দায় কাহার?

পিপি বা রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি কীভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন তাহা আমাদের অজানা নহে। তাহাদের চাপে যদি এইভাবে জামিন দেওয়া হয়, তাহা হইলে তাহা লইয়া প্রশ্ন ও গুঞ্জন উঠিবেই। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে এই সকল সমস্যার সমাধানের জন্য কেহ উদ্যোগ নেন না। এই কারণে এই সকল দেশে গণতন্ত্রও অকার্যকর। যেখানে এই সকল দেশে ইয়াবা ও বিভিন্ন প্রকারের মাদক ব্যবসায়ীরাও রাজনীতিবিদ বনিয়া যায় এবং আইনের চোখে অন্যায়কারী হইয়াও থাকে ধরাছোঁয়ার বাহিরে, সেখানে ন্যায়-অন্যায়ভাবে জামিন পাইবার ঘটনা কেন অহরহ ঘটিতেছে তাহা বুঝিতে অসুবিধা হয় না। এই পরিস্থিতি হইতে দেশ ও জাতি কি কখনো পরিত্রাণ লাভ করিবে না?

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন