রোববার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২২, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

যেভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছে ইউরোপ!

আপডেট : ০৪ অক্টোবর ২০২২, ০৬:২১

ইউক্রেনে বর্বর রুশ অভিযানের বিরুদ্ধে ইউরোক্র্যাটদের (ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের প্রশাসনিক আমলা) বক্তব্য অনুসারে যুদ্ধে জার্মানি, ফ্রান্স ও ইতালির অংশগ্রহণকে প্রাণবন্তহীন হিসেবে বর্ণনা করা যেতে পারে। দেশগুলোর প্রত্যয় ও দৃঢ় আত্মবিশ্বাসের অভাব স্পষ্টভাবে লক্ষণীয়। নিশ্চিভাবে বলা যায়, দেশগুলো এখনো যথেষ্ট সজাগ নয়। এমনকি কঠিন ভবিষ্যত্ ও হিমশীতল শীতের মুখোমুখি হতে চলা নাগরিকদের তারা যথেষ্ট অনুপ্রাণিত করছে বলে মনে হয় না। নিঃসন্দেহে ভ্লাদিমির পুতিনের জন্য এটি একটি বড় সুযোগ এবং তিনি এই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছেন ভালোভাবেই। গ্যাস লিকের অজুহাতে নর্ড স্ট্রিম-২ পাইপলাইনটি বন্ধ করে দিয়েছেন পুতিন। বস্তুত, ইউরোপে নিজের বিরুদ্ধাচরণকারীদের দুর্বল অবস্থানে আবদ্ধ রাখতেই এই ব্যবস্থা নিয়েছেন তিনি।

এখন যেহেতু রাশিয়ান গ্যাস পাইপলাইন সম্পূর্ণভাবে নষ্ট করে দিয়েছে এবং যা স্বভাবতই সাধারণ ইউরোপীয় জনগণকে তা যে দেশেরই হোক না কেন, চরমভাবে বেকায়দায় ফেলবে। ইউরোপের ভবিষ্যেক সত্যিকার অর্থে ম্লান করে তুলবে। কাজেই সরকারগুলোর উচিত হবে উত্সাহের সঙ্গে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগ দেওয়া। মস্কোয় ‘শাসন পরিবর্তন’ ঘটাতে রাশিয়ার ওপর যে সমস্ত কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ ও কার্যকর করা হচ্ছে এবং পুতিনের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রক্সি যুদ্ধে ইউক্রেনীয়দের যেভাবে সহায়তা করা হচ্ছে, তাতে দেশগুলোর উচিত হবে এই পদক্ষেপকে আরো প্রসারিত করতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সহায়তা করা।

আমি ‘শাসন পরিবর্তন’ শব্দটি মোটেই হালকাভাবে ব্যবহার করছি না। রাশিয়ান ফেডারেশনকে ভেঙে ফেলার জন্য রাশিয়ার নেতৃত্বে অন্য কাউকে প্রয়োজন এবং পুতিনকে ক্ষমতা থেকে অপসারণ করা তখনই সম্ভব হবে, যখন রাশিয়াকে নতুন ব্যবস্থাপনা ও আইন-নীতির অধীনে আনা যাবে। রুশ কর্মকর্তারা কীভাবে নির্বাচিত হন, তা নিয়ে সম্ভবত সাধারণ রাশিয়ান জনগণের খুব বেশি মাথাব্যাথা নেই। কারণ দেখা গেছে, রাশিয়ার সাধারণ জনগণ বছর দুয়েক আগে সাংবিধানিক পরিবর্তনের একটি গণভোটকে অপ্রতিরোধ্যভাবে (৭৮ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোট) সমর্থন করেছিল, যা পুতিনের ২০৩৬ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকাকে পাকাপোক্ত করেছে। যদিও ঐ গণভোটে বৈধ ভোটারের উপস্থিতি ছিল মাত্র ৬৫ শতাংশ, যা রাশিয়ান মান অনুসারে নিতান্তই কম। এখন পুতিনের বিরুদ্ধে কোনো সাংবিধানিক আন্দোলন করা আক্ষরিক অর্থেই অসম্ভব, যদি না তিনি ইউক্রেনে লজ্জাজনকভাবে পরাজিত হন কিংবা শক্তিশালী রাশিয়ান বাহিনী ১৫ সেপ্টেম্বরের পর দখল করা এলাকাগুলোসহ দনবাস এলাকা, যা কিনা ইউক্রেন থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চায়, সেখান থেকে বিতাড়িত হয়।

কেন রাশিয়ান ফেডারেশন পঙ্গু ও চূর্ণবিচূর্ণ করা প্রয়োজন? মনে রাখতে হবে, বিশ্বের বৃহত্তম দেশ ও শক্তির দ্বিতীয় বৃহত্তম উত্স রাশিয়ার একমাত্র প্রকৃত মিত্র হলো চীন। কাজেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যদি রাশিয়া কোনোভাবে বিবাদে জড়িয়ে পড়ে, যা শিগিগর বা দেরিতে হলেও ঘটবে বলেই মনে করা হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র কখনোই চাইবে না বিশালাকৃতির রাশিয়া-চীন এক কাতারে দাঁড়াক। অর্থাত্, এক্ষেত্রে যদি রাশিয়ান ফেডারেশনকে ২৬টি (ক্রিমিয়া, দনবাসসহ চারটি নতুন অঞ্চল) দেশে বিভক্ত করা যায়, তবে তা রাশিয়াকে একটি খুব ছোট ও দুর্বল দেশে পরিণত করবে। তারপর এবং শুধু তখনই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিশ্বব্যাপী ‘আমেরিকান শতাব্দী’ ঘোষণা করার সুযোগ মিলবে। মার্কিনরা স্বাধীনভাবে বিশ্বের মানচিত্র আঁকবে নতুন করে। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, রাশিয়ার মতো বিশাল দেশের ক্ষমতায় থাকার পরও জাদুকর পুতিন কেন বিষয়টি বুঝতে পারলেন না এবং কেন তিনি এই ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ শুরু করতে গেলেন? অবশ্য পুতিন সম্প্রতি বলেছেন, পশ্চিমারা যে রাশিয়াকে আক্রমণের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, এটা তিনি আগেই জানতেন। তিনি বলেছেন, ‘আমরা পশ্চিমের নিছক ছলচাতুরি প্রত্যক্ষ করেছি।’ তিনি গর্বের সঙ্গে যোগ করেছেন, ‘সমস্ত শক্তি ও যাবতীয় উপায়ে আমরা রাশিয়ার ভূমি রক্ষা করব।’

সুতরাং, এখন তাত্পর্যপূর্ণ প্রশ্ন হলো, কেন আপনি (পুতিন) পশ্চিমাদের ছলচাতুরির ফাঁদে পা দিয়েছিলেন?

২০১৪ সাল থেকেই ইউক্রেনের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণের হুমকি দিয়ে আসছেন পুতিন। এক্ষেত্রে কূটনৈতিক ব্যবস্থার সদ্ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও সত্যিকার অর্থে তিনি সেই পথে হাঁটেননি। আমি তাদের মধ্যে একজন ছিলাম, যারা ভেবেছিলেন (এবং মতামত দিয়েছিলেন!) পশ্চিমা উসকানি কাজ করবে না। আমাদের যুক্তি ছিল, পুতিন একজন সুচতুর নেতা এবং ইউক্রেনকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনার প্রশ্নে তিনি সফল হবেন। কেননা, তিনি ধূর্ত কূটনীতিকও বটে।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, আলোচনার পথে হাঁটলে ইউরোপের অনেক দেশ তার পক্ষে সায় দিত। উদাহরণস্বরূপ, ম্যাক্রোঁ-রাশিয়ার প্রতি খেয়ালি-উদ্ভট দৃষ্টিভঙ্গি থাকা সত্ত্বেও ‘পুতিন ইউক্রেন দখল শুরু করতে যাচ্ছেন’ এমন মার্কিন দাবিকে অস্বীকার করার চেষ্টা করেন। এমনকি ম্যাক্রোঁ বলেছিলেন, পুতিন ইউক্রেনের প্রতি ততটা উত্সাহী বা আচ্ছন্ন নন। সাবেক জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেলও ধরেছিলেন ম্যাক্রোঁর পথ। মার্কেল বলেছিলেন, তিনি বিশ্বাস করেন না যে পুতিন ‘সোভিয়েত যুগের গৌরবময় অধ্যায় পুনরুদ্ধারের মিশনে নেমেছেন’।

পরবর্তী সময়ে দেখা গেল, তাদের গণনা দৃশ্যত ভুল ছিল! শক্তিশালী রুশ সামরিক বাহিনী নিয়ে পুতিনের অন্ধবিশ্বাস ছিল যে সাঁড়াশি আক্রমণের মাধ্যমে ইউক্রেনকে কবজায় আনার মাধ্যমে দ্রুত স্বপ্ন বাস্তবায়নের পটভূমি তৈরি করা যাবে। ছোট ও দুর্বল প্রতিবেশীরা রাশিয়াকে থামাতে পারবে না। ইইউ ভেঙে গেছে বিধায় তার পক্ষে কিছুই করার থাকবে না এবং আরেকটি বিশ্বযুদ্ধের ঘটনা ঘটলে তাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে তার সমর্থন করার অবস্থা থাকবে না! প্রকৃতপক্ষে প্রায় দুই মাস ধরে ইউরোপীয়রা পুতিনকে এটা বোঝানোর চেষ্টা করেছিল যে, ইউক্রেনীয়দের আলোচনার টেবিলে ফিরে না আসার জন্য উসকানি দেওয়া থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে থামাতে কার্যত তাদের কিছুই করার নেই। তবে পুতিন তাদের কথায় কান দেননি এবং শেষ পর্যন্ত এক রাতে যা হওয়ার তা-ই হলো—২১ শতকের নাগরিকেরা যাকে ‘অসম্ভব’ ভেবেছিল, তা-ই ঘটে বাস্তবে! রাশিয়ান ট্যাংকগুলো ঢুকে পড়ে ইউক্রেনে। ট্যাংকগুলো শহরের অলিতে-গলিতে সাধারণ মানুষের ওপর নির্বিচার গুলি চালায়। ঘরবাড়ি, হাসপাতাল, ফার্মেসি ও নার্সারি ধ্বংস করে। শুরু হয় যুদ্ধ, যার ফলে ১২ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ, প্রতি চার জনের মধ্যে এক জন বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন।

ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তরফ থেকে যুদ্ধের ফলাফল পরিসংখ্যান, যা প্রকাশিত হয়, তা বিশ্বাস করতে আমার অনীহা আছে যদিও। যেহেতু উভয় পক্ষের চলমান সামরিক অভিযান সম্পর্কে ভুল তথ্য ছড়ানো হয় অধিকাংশ ক্ষেত্রে, তথাপি কিছু তথ্য তো মানতেই হয়। যেমন—রুশ ট্যাংক ধ্বংস কিংবা অবিশ্বাস্যভাবে বহু রুশ সৈন্যের প্রাণহানি (ইরাক ও আফগানিস্তানে ২০ বছরেরও বেশি সময় নিহত আমেরিকান সৈন্যের সংখ্যার চেয়ে ইউক্রেন যুদ্ধে মারা যাওয়া রুশ সৈন্যের সংখ্যা বেশি)। অর্থাত্, সংক্ষেপে বলতে গেলে পুতিনের সহজ জয়ের স্বপ্ন পরিণত হয়ে উঠেছে দুঃস্বপ্নে।

দীর্ঘ যুদ্ধ পরিস্থিতি সত্ত্বেও মিটমাটের অন্তত একটা ক্ষীণ আলো নিভুনিভু করছিল। ইউক্রেনীয়রা তাদের শস্য এবং রাশিয়া তার সার রপ্তানি করে আসছিল। এমতাবস্থায় তাদের যা দরকার ছিল তা হলো পরস্পরের মুখ থেকে ‘কঠোর সতর্কতা’ উচ্চারণের পর আলোচনার টেবিলে বসা এবং এই অর্থহীন যুদ্ধ বন্ধ করা। দুই পক্ষের মধ্যে শস্য চুক্তি কিংবা বন্দিবিনিময়ের মতো উদ্যোগ নিয়ে মধ্যস্থতাকারীরা সংঘাত নিরসনের দিকে এগোচ্ছিলেন একটু একটু করে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে দুটি বিষয় সব এলোমেলো করে দিল :নর্ড স্ট্রিম-২ নাশকতা এবং তথাকথিত গণভোটের মাধ্যমে ইউক্রেনের ১৫ শতাংশ ভূমি রাশিয়ার সঙ্গে সংযুক্ত করা!

বলা হচ্ছে, রাশিয়ান গ্যাস পাইপলাইন নিষ্ক্রিয় করার ফলে সবচেয়ে লাভ হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। রাশিয়ান নিরাপত্তাপ্রধান নিকোলাই পাত্রুশেভ যেমন বলেছেন, ‘পাইপলাইন ফাটলের সুস্পষ্ট সুবিধাভোগী মার্কিনরা’। লক্ষণীয় হলো, দর-কষাকষির প্রধান অস্ত্র তথা নর্ড স্ট্রিম-২ কিছুটা বেকায়দায় ফেলেছে পুতিনকে। আসন্ন শীত সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইউরোপীয়দের দাঁড় করানোর জন্য নর্ড স্ট্রিম-২কে ব্যবহার করার সুযোগ ছিল পুতিনের জন্য।

যা হোক, এমতাবস্থায় চিন্তার ভাঁজ পড়ছে ইউরোপবাসীর কপালে। ইউরোপীয় সরকারগুলো চেয়ে আছে ইইউ নির্ধারকদের প্রতি। এক্ষেত্রেও বেঁধেছে বিপত্তি। ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট চার্লস মিশেল এবং ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান উরসুলা ফন ডার লিয়েন রাশিয়ার সঙ্গে সদ্য সংযুক্ত চারটি অঞ্চল লুহানস্ক, দোনেত্স্ক, খেরসন ও জাপোরিঝিয়াকে স্বীকার করবেন না বলে জানিয়েছেন। এমনকি ইউরোপীয়দের শীতে হিম হওয়ার সঙ্গে রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞার সাধারণ ভিত্তিকে মানতে চাইছেন না তারা। অর্থাত্, শীত যত ঘনিয়ে আসছে, উত্কণ্ঠা তত বাড়ছে ইউরোপীয়দের। এই অবস্থায় একমাত্র সমাধান হতে পারে ‘আলোচনা’। শুধু কার্যকর আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই যুদ্ধ বন্ধ হতে পারে এবং কনকনে শীত থেকে রক্ষা করা যেতে পারে ইউরোপকে।

লেখক: সাংবাদিক

ডেইলি সাবাহ থেকে ভাষান্তর: সুমৃৎ খান সুজন

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন