রোববার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২২, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

জ্বালানি শক্তি পাওয়া যাবে?

আপডেট : ০৪ অক্টোবর ২০২২, ০৬:৪১

এ বছর জলবায়ু ক্যালেন্ডারের তোয়াক্কা না করে শীত দুই সপ্তাহ আগে এসে হাজির। এদিকে আবার ইউরোপের সদ্য রচিত রাজনৈতিক ক্যালেন্ডার অনুযায়ী শীতের শুরু হওয়ার কথা ১ নভেম্বর থেকে।

অন্যদিকে, ইউরোপের বিভিন্ন শহরে অনুষ্ঠিত প্রতিবাদ বিক্ষোভের ‘আমাদের গ্যাস ফিরিয়ে দাও। গোল্লায় যাক ন্যাটো...’ দাবির সুস্পষ্ট বার্তার প্রতি-উত্তরে ইইউ কমিশন ঠিক করেছে যে, ‘কানে দিয়েছি তুলো, পিঠে বেঁধেছি কুলো!’ কমিশন অবশ্য তা করতে পারে; আগাপাশতলা অনির্বাচিত নির্বাচনবিহীন কাম আমলা অধ্যুষিত কমিশন ২৭ সদস্য দেশের ভোটারদের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য নয়! ভোটারদের হাতেও বিক্ষোভ ছাড়া অন্য কোনো লিভারেজ নেই!

অবশ্য, অপশ্চিমা জগতের কাছেও ইইউর মূল্যবোধ নামক তালিকানামার প্রতি শ্রদ্ধাবোধের কমতি লক্ষ করা যাচ্ছে। রুশ-ইউক্রেন সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা শত চেষ্টা করেও আফ্রিকা, গ্লোবাল সাউথকে রুশবিরোধী নিষেধাজ্ঞা দেনেওয়ালার দলে আনতে পারেনি। সম্মিলিত পশ্চিম অবশ্য তাদের পুলিশি সোঁটা কেন কাজ করছে না, তা তলিয়ে দেখার প্রয়োজন বোধ করে না। তবে অপশ্চিম নিশ্চিত যে ‘...সম্মিলিত পশ্চিমের... উপরে আর আস্থা রাখা চলে না’। অপশ্চিম তাই ইউক্রেন প্রশ্নে নির্বিকার থাকার পন্থা অবলম্বন করেছে। তাদের অনেকেই ‘ব্রিকস’ ও ‘এসসিও’ বা ‘শাংহাই কো-অপারেশন অর্গনাইজেশন’ জোটে ভিড়ছে।

বা ওপেক+, পহেলা অক্টোবর থেকে দিনে প্রতি ১ মিলিয়ন ব্যারেল অশোধিত তেল উত্পাদন কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে সে তার অবস্থান সম্বন্ধে পর্যাপ্তভাবে বলে দিয়েছে এবং ভবিষ্যতে এ রকম ব্যবস্থা নিতে ইতস্তত যে করবে না, সেটিও বলে দিয়েছে। বাস্তব সত্য হলো, বিশ্বায়িত কোভিড-১৯ লকডাউনজনিত কারণে জ্বালানির চাহিদা আকস্মিকভাবে হ্রাস পেলে জ্বালানিশিল্পে বিনিয়োগ ও নতুন ড্রিলিংও থেমে থাকে। অর্থাত্, ওপেক+ টেকনিকেলগতভাবেও উত্পাদন বৃদ্ধিতে সমর্থ নয়। রুশ জ্বালানিশিল্পকে আগাপাশতলা নিষেধাজ্ঞার কম্বলে ঢেকে রাখার ফলে ইইউ ‘সাপ্লাই-ডিমান্ডের’ শেষোক্ত অংশটি অর্জন করলেও  সাপ্লাইয়ের কোনো বিকল্প উত্স তার নেই। ওপেক+ বিদ্যমান চুক্তিগুলো বরখেলাপ করে তেল সরবরাহ করে সম্মিলিত পশ্চিমকে খুশি করতে বিরত থাকে। ফলে স্বয়ং প্রেসিডেন্ট বাইডেন যখন জেদ্দায় সৌদিদের ‘অধিকতর পদক্ষেপ’ গ্রহণ করে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ বৃদ্ধির অনুরোধ বা আবেদন করেন, যা পালিত হয়নি। অন্যভাবে, বাইডেন ওপেক+কে ভেঙে দিতে ব্যর্থ হন।

তাছাড়া, বৈশ্বিক অর্থনীতির মন্থরিত হওয়ার আশঙ্কাও ‘সাপ্লাই-ডিমান্ডের’ পাল্লায়—ডিমান্ডের পাল্লাকে বিষম ভারে ভার করে দেয়, এবং ওপেক+কেও তা মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এমনকি ‘ক্রুড ফিউচার’ও বাদ পড়েনি। আসলে, রুঢ় বাস্তবতা হলো যে, ওপেক বা ইরানি তেল ইইউকে স্বারোপিত সংকট থেকে উদ্ধার করতে সক্ষম নয়।

অন্যদিকে, রাশিয়ার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক যুদ্ধের অংশ হিসেবে জি৭-এর অর্থমন্ত্রীরা রুশ তেল রপ্তানির সর্বোচ্চ মূল্য ধার্য তথা প্রাইস ক্যাপ বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, অর্থাত্, রুশদের ক্ষেত্রে ‘ফেলো কড়ি মাখো তেল’ লিবারেল নীতি প্রযোজ্য নয়, জি৭-এর তেল ক্রেতার সমিতি মূল্য নির্ধারণ করবে। এটি আরেকটি বাড়তি নিষেধাজ্ঞা।

এই প্রাইস ক্যাপের উদ্ভাবক হলেন মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি জেনেট ইয়েলেন। প্রাইস ক্যাপের ভিশন ও মিশনকে সফল করতে, অর্থাত্ রুশদের রাজস্বলব্ধ (রেভিনিউ) আয়ের পরিমাণ বিপুলভাবে কমিয়ে আনার জন্য তেলবাহী জাহাজের জন্য বিশেষ শর্তাবলি এমনভাবে বেঁধে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে যে, তেলের মূল্য প্রাইস ক্যাপের বেশি হলে সেই তেল পরিবহনযোগ্য হবে না। জি৭-এর বিশ্বাস, পৃথিবীর ৯০ শতাংশের বেশি জাহাজই লন্ডনভিত্তিক বিমা কোম্পানিতে, যেমন :লয়েডস অব লন্ডন, বিমা চুক্তিবদ্ধ, কাজেই প্রাইস ক্যাপ সফল হতে বাধ্য। রাশিয়া অবশ্য বলেছে, প্রাইস ক্যাপের সমর্থক দেশের কাছে তেল বিক্রি করবে না। যা হোক, তা ছাড়াও বাকি যে প্রায় ১০ শতাংশ জাহাজ, যেগুলো সম্মিলিত পশ্চিমে বিমা চুক্তিবদ্ধ নয় এবং বয়কটেরও শরিক নয়, যেমন—সংযুক্ত আরব আমিরাত, ভারত, চীন ও রাশিয়ার নিজস্ব জাহাজও রয়েছে! অতএব, বিমা চুক্তির ফাঁদ ব্যর্থ হতে বাধ্য।

ওপেক+সহ অপশ্চিমের তেল উত্পাদনকারী দেশগুলোর ওপরে জি৭-এর নেতাদের রুশ তেলকে প্রাইস ক্যাপ পরানোর প্রভাব পড়তে বাধ্য। কারণ, ‘বৈশ্বিক বাজারে বিদ্যমান অনেক অনিশ্চয়তার সমুদ্রে জি৭-এর প্রাইস ক্যাপ আরেকটি অনিশ্চয়তার বীজ বপন করছে।’ আরেকটি না বলা হেতু হলো যে জি৭-এর এই চাল বা পদক্ষেপ যে নজির সৃষ্টি করছে,  ওপেকভুক্ত দেশগুলো তা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছে। ইউক্রেনের দোহাই দিয়ে জি৭ আজকে রুশদের ওপরে খড়্গহস্ত হয়েছে, অথচ টেকনিক্যালি বিশ্বীয় তেলের বাজারের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। কাজেই আগামীকাল বা পরশুদিন যে গণতন্ত্রের, মানবাধিকারের অভাব ন্যূনতা দেখিয়ে তেল উত্পাদনকারী দেশগুলোর ওপরে খড়্গহস্ত হবে না, তার কোনো গ্যারান্টি আছে কি? সাদামাটা অর্থ হলো, পথভ্রষ্ট সম্মিলিত পশ্চিম তেলের মূল্য নামক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক বিষয়টিকে অসংশ্লিষ্ট ভূরাজনৈতিক নুন-মশলা মাখিয়ে রাজনীতির বিষয়বস্তু করতে চাইছে! ১৯৬০ সালে কার্টেল প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কাল থেকে ওপেক কিন্তু একে সন্তানতুল্য যত্নআত্তিসহ কড়া পাহারা দিয়ে আসছে। ১৩টি তেল উত্পাদনকারী দেশ নিয়ে গঠিত ওপেকে রাশিয়াসহ সাকল্যে ১০টি দেশের সংযুক্তির মাধ্যমে ওপেক+-এর আবির্ভাব ঘটে। বৈশ্বিক তেলের বাজারের বাস্তবসম্মত, নির্ভরশীল আকার-অবয়ব দেওয়ার দায়িত্ব ওপেক+-এর।  

এবারে শক্তিসংশ্লিষ্ট তবে সামান্য অন্য কথা! শিল্প উত্পাদনের রমরমা দিনগুলোতে যেমন—জার্মানির কথাই বলা যাক। ২ ট্রিলিয়ন ডলার (১-এর পরে ১২টি শূন্য=১ ট্রিলিয়ন) মূল্যের শিল্প উত্পাদন হতো মাত্র ২০ বিলিয়ন (১-এর পরে ৯টি শূন্য=১ বিলিয়ন) ডলারের রুশ গ্যাস ব্যবহার করে, অর্থাত্ প্রতিযোগিতামূলক বাজারে জার্মান পণ্যের ১০০ গুণ লিভারেজ ছিল। অন্যভাবে, জার্মানির অবস্থা ছিল উলটে দেওয়া পিরামিডের মতো, জার্মানির উত্পাদন তুলনামূলকভাবে গ্যাসের অতিক্ষুদ্র শীর্ষবিন্দুতে দাঁড়িয়ে ছিল। বিকশিত প্রযুক্তি ও ইনফ্রাস্ট্রাকচারের উপস্থিতহীনতার পরিপ্রেক্ষিতে উইন্ডমিল বা সৌর প্যানেল কি ২ ট্রিলিয়ন ডলারের আউটপুট বজায় রাখতে সক্ষম? না!

রুশ অর্থনীতিকে নতজানু করতে গিয়ে উলটো রুশবিরোধী নিষেধাজ্ঞার (কুড়ালের) কোপ ইউরোপের শিল্প, সমাজ ও সামাজিক জীবন এবং তার বিশ্বীয় রাজনৈতিক অবস্থানকে বিপর্যয়ের দিকে দ্রুত ঠেলে দিচ্ছে। যেমন—জ্বালানি বিপর্যয়ের কারণে জার্মানির টয়লেট পেপার তৈরির সাধ্যি নেই! সার উত্পাদন রূপকথার বিষয়বস্তু বা আরসিলার-মিত্তালের মতো ইস্পাত কারখানা দুটো প্ল্যান্ট বন্ধ করে দিয়েছে ইত্যাদি? (কেন?, দেখুন : শীতের হাওয়ায় প্রস্তুত হচ্ছে ইউরোপ; ১৬.০৯.২২, ইত্তেফাক)। অবশেষে জার্মান সরকার ও মিডিয়া সব নীরবতা ভঙ্গ করে এবং বিগত দুই-আড়াই সপ্তাহ ধরে গুরুতর শক্তি বিপর্যয়ের প্রসঙ্গ সর্বসাধারণের নিত্যদিনের জীবনে নিয়ে আসে। (বিস্তারিত জানার জন্য ডের স্পিগেলে প্রকাশিত ‘হাউ ব্যাড উইল দ্য জার্মান রিসেশন বি?’ গুগল করুন)।

শক্তি বিপর্যয়ের বিষম ডামাডোলের মধ্যে নর্ড স্ট্রিম ১ ও নর্ড স্ট্রিম ২-কে বহুধা বিস্ফোরণের মাধ্যমে অকেজো করে দেওয়া হয়েছে (২৬.০৯.২২)। ডেনমার্কের ‘বর্নহোলম’ নামক দ্বীপের খুব কাছে বাল্টিকের আন্তর্জাতিক জলখণ্ডে বিস্ফোরণগুলো ঘটে। অত্যন্ত উচ্চমার্গের প্রযুক্তি ব্যবহূত এই স্যাবোটাজের দরুন মাত্র দিন কয়েক পূর্বে জার্মান শহরগুলোর হাজার হাজার পাবলিক চ্যান্সেলর শলত্সকে এনএস১-কে নিষেধাজ্ঞামুক্ত করার এবং এনএস২-কে চালু করার যে দাবি করেছিলম সেটি বাস্তবায়িত হবে না। তবে তারা ‘কুই বোনো? বা কার লাভ?’ জানার দাবি করতে পারে। পোল্যান্ডের একাধারে প্রাক্তন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও প্রাক্তন বৈদেশিক মন্ত্রী রাডেক সিকোরস্কি উল্লসিত টুইট করেন :‘থ্যাংক ইউ, ইউএসএ’; এবং আপাতত কাকতালীয় হলেও একই দিন পোল্যান্ড (জার্মানি মাইনাস) ‘বাল্টিক পাইপলাইনের’ আংশিক উদ্বোধন করে।

আরেকটি বিষয়: শক্তি বিপর্যয়ের এই সামিট বিন্দুতে জার্মান শিল্পের রিলোকেশনকে ত্বরান্বিত করবে। কেউ যদি প্রশ্ন করেন, এই কি তবে ‘ডাভস’কৃত (বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম) অ্যাজেন্ডার পরতে পরতে প্রকাশ পাওয়া বা হওয়া? হলফ করে ‘না’ বলা কঠিন হবে।   

লেখক: ইউরোপপ্রবাসী বিশ্লেষক, সাংবাদিক

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন